না ফেরার দেশে চট্টগ্রামের ছেলে অভিনেতা হুমায়ূন সাধু

0

পর পর দুই দফা ব্রেইন স্ট্রোকের ধকল আর কাটাতে পারলেন না চট্টগ্রামের ছেলে হুমায়ূন সাধু। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) দিনগত রাত দেড়টার দিকে এই চলচ্চিত্র অভিনেতা, নাট্য পরিচালক ও লেখকের মৃত্যু হল।

চট্টগ্রামের বেড়ে ওঠা হুমায়ূন কবীর সাধু মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর নির্মিত মেইড ইন বাংলাদেশ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। নাট্য অভিনেতা হিসেবে তিনি একাধিক নাটক ও টেলিফিল্মে অভিনয় করেছেন। নাট্য পরিচালক হিসেবে তার অভিনীত ও পরিচালিত নাটক চিকন পিনের চার্জার বেশ আলোচিত হয়। তাকে নিয়ে বা তার মতো আকারে মানুষদের নিয়ে বানানো ঊন মানুষ টেলিফিল্মে অভিনয় করেও তিনি বেশ পরিচিতি পান।

চলতি অক্টোবরের শুরুর দিকে মাকে দেখতে চট্টগ্রামে আসেন হুমায়ূন সাধু। সেখানে যাওয়ার পর হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে খুব জ্বর ছিল। জ্বর না কমায় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গত ৫ অক্টোবর তাকে চট্টগ্রাম শহরের পার্ক ভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন চিকিৎসকেরা জানান, তার রক্তে ইনফেকশন ধরা পড়েছে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ১৩ অক্টোবর হুমায়ূন সাধুকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে রাজধানীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তাঁর মস্তিষ্কে স্ট্রোক হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করতে হবে। কিন্তু পরিবার তাকে চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাসায় নিয়ে যায়।

২০ অক্টোবর রাতে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় তাকে দ্রুত রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে ভর্তি করেন। সেখানে নেওয়ার পর জানা যায়, হুমায়ূন সাধুর মস্তিষ্কে আবারও স্ট্রোক হয়েছে। হাসপাতালটির নিউরোলজি বিভাগের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) দিনগত রাত দেড়টার দিকে হুমায়ূন সাধুর মৃত্যু হয়।

চট্টগ্রামের ছেলে হুমায়ূন সাধু
চট্টগ্রামের ছেলে হুমায়ূন সাধু

সাধুর জন্ম, শৈশব ও কৈশোর কেটেছে জন্মস্থান চট্টগ্রামেই। দৈহিক গঠনে তিনি একটু ছোট হওয়ায় তার বাবা স্কুলে পাঠাতে চাইছিলেন না। তার বড় বোনের কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে বড় বোন তার বাবাকে চট্টগ্রামের রঙ্গিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। হুমায়ূনের বড় ভাই সাইফুল কবীর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের ছাত্র। তিনিই আবার হুমায়ূনকে নিয়ে সেই স্কুলে যান এবং প্রথম সাময়িক পরীক্ষা পর্যন্ত তাকে সুযোগ দেয়ার অনুরোধ করেন। হুমায়ুন দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৩০ জন ছেলে-মেয়েকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন। সহপাঠীরা তখন হুমায়ূনকে কাঁধে নিয়ে উল্লাস করে। হুমায়ুন পরিবারও মিষ্টি কিনে খাইয়েছিল পাড়ার লোকদের।

হুমায়ূন সাধু এসএসসি পাসের পর এইচএসসিতে ভর্তি হন। এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণ চলচ্চিত্র দেখার নেশায় এইচএসসির রেজাল্ট তেমন ভালো হয়নি। এরপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হন।

৯ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। তার মা মরিয়ম বেগম সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। মরিয়ম বেগম হিন্দি, ইংরেজি এবং বাংলা চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করেন। পিয়ানোবাদক, লাইফ ইজ বিউটিফুল, চিলড্রেন অফ হ্যাভেন, সিটি অফ গড এবং ফেলুদা এমন কয়েকটি চলচ্চিত্র হুমায়ুন তার মায়ের সাথে দেখেছেন। এর ফলে চলচ্চিত্র তৈরি ও অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলার পরপর তাদের পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। হুমায়ূন তখন জীবিকার তাগিদে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় যান।

ঢাকার বিভিন্ন রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনে ঠিকানাহীনভাবে কিছুকাল কাটে। এরপর চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সাথে পরিচয়। তার সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে অভিনয় জগতে কাজ শুরু করেন। কলেজ চলাকালীন চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র (চট্টগ্রাম ফিল্ম সেন্টার) এর শৈবাল চৌধুরী এবং জাভেদ আহসান তাকে চলচ্চিত্রে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহী করে তোলেন। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে সিনেমার জগতে প্রবেশ করেন।

তার প্রথম শর্ট ফিল্ম ‘গুঞ্জন’ চলচ্চিত্র নির্মতা তারেক মাসুদের সহায়তায় নির্মিত হয়েছিল। পরে তিনি ‘বেঁচে থাকার জন্য আমি’ ‘পাখি পাকা পেপে খায়’ নামে নাটক সিরিজ তৈরি করেন। ২০১০ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলে ক্যাথরিন মাসুদের অধীনে একটা কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন সাধু। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘গড ভার্সেস গড’ নামে একটি শর্টফিল্ম তৈরি করেন। ২০১২ সালে তার পরিচালিত প্রথম নাটক ‘দরশন’ বৈশাখী টিভিতে প্রচারিত হয়। তিনি ৭টি টিভি নাটক পরিচালনা করেছেন। ‘সিজোফ্রেনিয়া’ ও ‘অ-মানুষিক’ নামে দুটি টেলিফিল্মও বানিয়েছেন। অভিনয় করেছেন সমানসংখ্যক নাটকে। হুমায়ূন সাধুর আলোচিত নাটক ‘চিকন পিনের চার্জার’। নাটকটির লেখক ও পরিচালক তিনি নিজেই। এ নাটকে অভিনয়ও করেছেন এবং তার বিপরীতে ছিলেনে অভিনেত্রী শাহতাজ।

হুমায়ূন সাধুর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে— মেড ইন বাংলাদেশ, বিউটি সার্কাস, সাত ভাই চম্পা, চোরাবালি।

হুমায়ূন সাধুর প্রযোজনায় যেদিন সেই নামে ‘আমার ঘরে বিরাজ করে লালনগীতি’ নামে একটি সঙ্গীত অ্যালবাম অ্যামাজনে প্রকাশ হয়েছে। তার লেখা অবলম্বনে বেশ কিছু শর্টফিল্ম ও নাটক তৈরি হয়েছে। তার লেখা গল্পের বই ‘ননাই’ বেশ পাঠক সমাদৃত হয়েছিল।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন