মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে এখনও ভরা চট্টগ্রামের বাজার

0

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অনেক কোম্পানি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ তুলে নিলেও এখন নতুন করে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফার্মেসিতে। এসব ফার্মেসিতে শুধু মেয়াদোত্তীর্ণ নয়—বিক্রি হচ্ছে ভেজাল, সরকারি, ফুড সাপ্লিমেন্ট ও ফিজিশিয়ান স্যাম্পলও (বিক্রি নিষিদ্ধ নমুনা ওষুধ)। এছাড়া ফার্মেসিগুলোতে মানা হচ্ছে না ওষুধ প্রশাসনের নির্দেশনা ও বিধিবিধান।

সম্প্রতি রাউজানের নোয়াহাটে নকল ওষুধের কারখানায় দুই কোটি টাকার ওষুধ আটকের খবরে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। গত ১৮ জুন হাইকোর্ট ২ জুলাইয়ের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেক কোম্পানি নগরীর ফার্মেসিগুলো থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরিয়ে নেয়। তবে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবার মেয়াদোর্ত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব হয়ে পড়েছে প্রতিটি ফার্মেসি। কোম্পানিগুলোও নতুন করে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ তুলে নিচ্ছে না। ফলে ফার্মেসিগুলোতে অবাধে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বেচাকেনা চলছে।

এছাড়া ফার্মেসিগুলোতে ফুড সাপ্লিমেন্ট, ফিজিশিয়ান’স স্যাম্পল, বিদেশি ওষুধ, সরকারি ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। ফার্মেসিগুলোতে সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। নগরের অলিগলিতে ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি রয়েছে প্রচুর। ফলে দেদারসে এসব ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে এন্টিবায়োটিক। ফার্মেসিতে ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও, প্রায় প্রতিটি ফার্মেসিতে ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শরীরের পুষ্টি মেটানো, পেশী গঠনের জন্য মানুষ ফুড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করে। অনেক চিকিৎসকও ফুড সাপ্লিমেন্ট পেসক্রাইব করেন। ফলে নগর ও নগরের বাইরে একশ্রেণির ব্যবসায়ী নামি-দামি ব্র্যান্ডের ফুড সাপ্লিমেন্ট উৎপাদন করে তা বাজারজাত করছে।

এছাড়া রয়েছে নিষিদ্ধঘোষিত বিদেশি যৌন উত্তেজক ওষুধ। গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাউজানের পথেরহাটে নকল হারবাল ওষুধ কারখানা থেকে দুই কোটি টাকার নকল ওষুধ জব্দ হয়। এছাড়া ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকের ভিজিটের জন্য প্রতিনিধিদের যে স্যাম্পল দিয়ে থাকে, প্রতিনিধিরা তা চিকিৎসকদের না দিয়ে বিভিন্ন ফার্মেসিতে দিয়ে দেয়। আবার অনেক চিকিৎসকও ফার্মেসিতে ফিজিশিয়ান’স স্যাম্পল বিক্রি করেন। হাজারি গলিতে রয়েছে একাধিক ফিজিশিয়ান’স স্যাম্পল বিক্রেতার সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট ফিজিশিয়ান নগর ও নগরের বাইরে থেকে কমদামে স্যাম্পলগুলো কিনে তা চড়া দামে বিক্রি করে। এদের বেশিরভাগই ড্রাগ লাইসেন্স ও নূন্যতম জ্ঞান ছাড়া ফার্মেসি চালাচ্ছে। তাছাড়া সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। ওষুধের মোড়কে নির্দেশিত তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ না করায় ওষুধের গুণগতমান ঠিক থাকে না। তাপ সংবেদনশীল ওষুধ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণের নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না।

সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে দেওয়া ওষুধ বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। চমেক হাসপাতালের আশপাশের ফার্মেসিগুলো দালালের মাধ্যমে ক্রেতা বাগিয়ে এনে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজারী গলি, চট্টগ্রাম মেডিকেলের আশপাশ, চকবাজার, মুরাদপুর এলাকার ফার্মেসিগুলোতে ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট, ফিজিশিয়ান’স স্যাম্পল, সরকারি ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। তবে বিদেশি ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে ফার্মেসি মালিকরা নানা কৌশল অবলম্বন করে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকা ও হাজারী গলিতে আবদুল করিম ও হাফিজ উল্লাহ নামের দুই ওষুধ ক্রেতার সাথে কথা হলে তারা জানালেন, কোটি টাকার ভেজাল ওষুধ আটকের পর আমাদের চিন্তা বেড়ে গেছে। প্রতিমাসে দশ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। এখন ওষুধগুলো ভেজাল কি না তা জানার উপায় থাকে না। সাধারণ মানুষের অভিমত, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সহ সবধরনের সাপ্লিমেন্ট বন্ধে অভিযান জোরদার করা উচিত।

ওষুধ প্রশাসন (চট্টগ্রাম) তত্ত্বাবধায়ক কামরুল হাসান বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। অভিযানে গেলে ফার্মেসি মালিকরা দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যান। এক্ষেত্রে করার কিছুই থাকে না। ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ক্ষেত্রে সচেতনতা প্রয়োজন। আমরা বিগত তিন মাসে নগর ও নগরের বাইরে ১৫টি অভিযান পরিচালনা করেছি।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা জাহান উপমা বলেন, আমরা ভেজাল ও ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। ফার্মেসিগুলোতেও অভিযান পরিচালনা করা হয়।

চমেকের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, নকল ও ভেজাল ওষুধ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ ক্ষেত্রে ফুড সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যায়। সবক্ষেত্রে ফুড সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যায় না। তবে আমাদের দেশে অধিকাংশ চিকিৎসক ব্যবসায়িক কারণে ফুড সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দেন।

সিআর

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন