ভিডিও/ শোকের দিনে শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিদায় নিলেন মেহেদী

0

ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মেহেদী হাসান প্রান্ত। চট্টগ্রাম শহরের এনআইটিতে (ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট টেকনোলজি) সিভিল ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হন। ষষ্ঠ সেমিস্টারে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার সেই স্বপ্নের সলিল সমাধি ঘটেছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কমলদহ রূপসী ঝরনায় বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় তার। বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) জাতীয় শোক দিবসের দিনে পরিবার ও স্বজনদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আগেই বিদায় নিলেন মেহেদী।

দুই বোন ১ ভাইয়ের মধ্যে মোস্তফা হাকিম উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মেহেদী ছিলেন সবার ছোট। তার পিতা চট্টগ্রাম কর্ণফুলী গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির সিনিয়র টেকনেশিয়ানের দায়িত্বে রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সকালে ছয় বন্ধুসহ চট্টগ্রাম শহর থেকে রূপসী ঝরনায় যান মেহেদী। ঝরনার দ্বিতীয় স্তরে উঠে মেহেদীসহ আরো দুজন ওপর থেকে পানিতে লাফ দেয়। এ সময় দুজন উঠে গেলেও মেহেদী আর উঠতে পারেনি। সে মুহূর্তের মধ্যে পানিতে ডুবে যায়। বন্ধুরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে পানি থেকে তুলতে পারেনি।

বেড়াতে যাওয়া মেহেদীর বন্ধু শাহরিয়ার ইসলাম জানায়, ‘ঝরনায় গিয়ে মেহেদীসহ সব বন্ধুরা মিলে ছবি তুলি। আমাদের আনন্দ ভ্রমণ শেষ হওয়ার আগে মেহেদী এভাবে ছবি হয়ে যাবে তা কল্পনাও করতে পরিনি। সে সাঁতার জানতো না বলে পানির নিচে তলিয়ে যায়।’

মেহেদী হাসানের পিতা মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘মেহেদী গতকাল রাতে আমাকে বলে তারা বন্ধুরা সবাই মিলে মিরসরাইয়ের রূপসী ঝরনা দেখতে যাবে। আমি নিষেধ করার পরও সে ঝরনায় যাওয়ার জন্য বায়না করতে থাকে। পরবর্তীতে আমি তাকে বলি যে ঝরনায় গেলেও পানিতে না নামার জন্য। যেন উপরে থাকে। আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে তার বন্ধুরা আমাকে মোবাইলে জানায় সে ঝরনায় দেখতে গিয়ে পানিতে পড়ে গেছে। এখানে এসে দেখি আমার প্রান্ত পানিতে নিখোঁজ হয়ে গেছে। ডুবুরির দল অনেক খোঁজার পর প্রান্তের নিথর দেহ পানি থেকে উদ্ধার করে।’

‘আমার সোনা মানিক কথা বলছে না কেন’ একথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নুরুল আমিন।

৩ ঘন্টা পর পানি থেকে মেহেদী হাসান প্রান্তের লাশ উদ্ধার করা হয়।
৩ ঘন্টা পর পানি থেকে মেহেদী হাসান প্রান্তের লাশ উদ্ধার করা হয়।

মেহেদী হাসানের মা মাহমুদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে ছিলো শান্ত প্রকৃতির। সে কখনো উচ্ছৃঙ্খল ছিল না। আজ সকালে যখন প্রান্ত বাসা থেকে বের হচ্ছিল তখন তাকে নাস্তা করে যেতে বললে; সে বন্ধুদের সাথে একসাথে নাস্তা করবে বলে বাসা থেকে খালি পেটে বের হয়ে যায়। প্রান্ত বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিল। আর দুই বছর পর সে ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স শেষ করে বের হওয়ার কথা। আমার বুকের ধন কোন কথা বলছে না কেন?’

কথাগুলো বলতে বলতে তিনি বিলাপ করতে থাকেন।

নিজামপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘রূপসী ঝর্ণায় পর্যটক ডুবে যাওয়ার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, পুলিশ ও স্থানীয়দের সহায়তায় মেহেদী হাসানের লাশ উদ্ধার করা হয়। পানিতে ডুবে মেহেদী হাসানের মৃত্যু হয়। ৩ ঘন্টা পর পানি থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। মেহেদী হাসানের লাশ সুরতহাল করে তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

ছেলের লাশের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বাবা নুরুল আমিন ও মা মাহমুদা বেগম।
ছেলের লাশের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বাবা নুরুল আমিন ও মা মাহমুদা বেগম।

সীতাকুন্ড ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার মো. শরীফ বলেন, পর্যটক পানিতে ডুবে যাওয়ার খবর পেয়ে মিরসরাই ও সীতাকুন্ড ফায়ার ষ্টেশনের ডুবুরী দল ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় ২ ঘন্টা অভিযান পরিচালনা করে দুপুর ১টায় লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ঝরনার ওপর থেকে ৩ বন্ধু পানিতে লাফ দেয়। ২জন পানি থেকে উঠলেও মেহেদী পানিতে ডুবে যায়।

মেহেদী হাসানের ভগ্নিপতি কামরুল ইসলাম জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন আবাসিক এলাকায় মেহেদী হাসানের জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার লাশ নাটোরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌছার পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন