খুনের তিন ঘন্টা আগে অমিত মুহুরীর ওয়ার্ডে ঢোকে খুনি রিপন?

পুলিশও জানতো না ঘটনা, তদন্ত কমিটি হয়েছে দুটি

0

খুনের ঘটনার মাত্র তিন ঘন্টা আগে চট্টগ্রাম কারাগারের ৩২ নম্বর সেলের ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী অমিত মুহুরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডে প্রবেশ করেন সন্ত্রাসী রিপন নাথ। তবে জেলার দাবি করেছেন, ১০-১৫ দিন আগে তাকে ওই ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। অমিত দীর্ঘদিন ধরে কারাগারের ৩২ নম্বর সেলের ওই ওয়ার্ডে ছিলেন। ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে সাধারণ মামলার আসামি রিপনকে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের সেলে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম কারাগারের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

৩২ নম্বর সেলে ছয় থেকে হঠাৎ সাতে
জানা গেছে, রিপনকে কারা সেলে পাঠানোর বিষয়ে কারাবিধির কোন নিয়মই অনুসরণ করেনি কারা কর্তৃপক্ষ। ভয়ংকর কোন সন্ত্রাসী কিংবা হত্যামামলা এমনকি একাধিক মামলার আসামি না হওয়ার পরও রিপনকে কেন ৩২ নম্বর সেলে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল কিংবা হঠাৎ ‘সিদ্ধান্তে’ ৭ নম্বর ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে—এর কোনো জবাব মিলছে না খোদ কারা কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও।

কারা কর্তৃপক্ষের বিধি অনুযায়ী চাঞ্চল্যকর হত্যা, চাঞ্চল্যকর মামলা, জঙ্গি, শীর্ষ সন্ত্রাসী, ফাঁসি কিংবা বিপজ্জনক সন্ত্রাসীদের কারা সেলে রাখা হয়। এক বা দুটি অস্ত্র মামলার কোন আসামিকে সেলে রাখার নজির খুবই কম। তবে অস্ত্রমামলার কোন আসামিকে ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে সেলে রাখতে পারে কারা কর্তৃপক্ষ।

ছোট ভাই ও মায়ের সঙ্গে নিহত অমিত মুহুরী
ছোট ভাই ও মায়ের সঙ্গে নিহত অমিত মুহুরী

হঠাৎ রিপনকে ৩২ নম্বর সেলে অমিত মুহুরীর ওয়ার্ডে কেন পাঠানো হল—এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার নাছির আহমেদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘রিপনকে ১০-১৫ দিন আগেই অমিতের ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।’

৩২ নম্বর সেলে অমিতের সঙ্গে আগে থেকেই বেলাল নামের একজনকে রাখা হয়। অমিত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হলেও রিপন অস্ত্র ও চুরির মামলায় কারাবন্দি ছিলেন। অতীতে পোশাক কারখানার এ শ্রমিকের নামে কোন গুরুতর মামলার রেকর্ড নেই। তবুও কেন তাকে অমিতের সঙ্গে রাখা হয়েছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে জেলার নাসির আহমেদ বলেন, ‘সেটা সত্য রিপন একেবারেই সাধারণ বন্দি ছিল। কিন্তু প্রথম থেকে তাকে ওই সেলে রাখা হয়েছিল, সে হিসেবে থেকে গেছে। এখন ঘটনা একটি ঘটার পর বিষয়টি আলোচনায় আসছে। অন্য কোন কারণ ছিল না।’

ঘটনা কি পরিকল্পিত, না রাগের মাথায়?
এদিকে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার অমিতের আদালতে হাজিরা থাকায় সন্ধ্যার পরই তিনি ঘুমিয়ে যান। একই সেলে থাকা অন্য দুই বন্দির মধ্যে বেলালও রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে বিকেল ৫টার দিকে লকাপ করার সময় অমিত ও রিপনের মধ্যে হালকা ঝগড়া হয়। হয়তো সেই তর্কের জেরেই রিপন ঘুমন্ত অবস্থায় অমিতকে ইটের আঘাতে হত্যা করেন। তবে সেলে অন্য দুই বন্দিকে দিয়ে নিজের কাজ করাতেন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত। হয়তো সে কারণেও ক্ষোভ থাকতে পারে রিপনের মধ্যে। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের রিপন নাথ শুধু বলেছেন, রাগের মাথায় ইট দিয়ে অমিতের মাথায় আঘাত করেছেন তিনি।

অমিত খুনের ঘটনায় বৃহস্পতিবার কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন জেলার নাসির আহমেদ। তবে মামলাটি তদন্ত করছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ (উত্তর) ডিবি। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেছেন। জেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ৩২ নম্বর সেলে থাকা বেলাল ও রিপনের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২ টার পর থেকে বিকেল ৬ টা পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন ডিবির তদন্ত দল। সেখানে কয়েক দফায় পৃথকভাবে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা খুনি রিপন নাথকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু খুনি রিপনের মধ্যে কোনও ধরনের অনুশোচনা বা ভীতি কাজ করছে না। সে কোনও শব্দই বলছে না। একেবারে নিশ্চুপ। কেন এ খুন করলো তারও কোনো কারণ বলছে না। পূর্ব শত্রুতা আছে কিনা তাও বলছে না। শুধু বলেছে, রাগ উঠছে তাই অমিতকে আঘাত করেছে। কিন্তু রাগের কারণ কী—সেটাও বলছে না।

কিসের আঘাত—ইট নাকি ধারালো অস্ত্র
এদিকে নিহত অমিতের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন কোতোয়ালী থানা পুলিশের এসআই সঞ্জয় পাল। পুলিশ বলছে, মাথায় ব্যান্ডেজ করা অবস্থায় অমিতকে পেয়েছে তারা। তার শরীরের কিছু জায়গায় আঘাতের চিহ্ন থাকলেও মূলত মাথায় ব্যাপক জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় অমিতের মৃত্যুু হয়েছে। তবে কিসের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে সেটা ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকই ভালো বলতে পারবেন।

তবে চমেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা এ বিষয়ে গণমাধ্যমে মন্তব্য করতে রাজি হননি। যদিও চমেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, অমিতের মাথায় অন্তত ৩০টি সেলাই করা হয়েছে। আর জেল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ইটের আঘাতেই অমিতের মৃত্যু হয়েছে। আর ঘটনাস্থলে যাওয়া জেলের গার্ডরা দেখতে পান ত্রিকোণাকৃতির সূঁচালো একটি ইটের টুকরা দিয়ে অমিতের মাথায় মুহুর্মূহ আঘাত করেন রিপন। অন্য বন্দি বেলালের বাধার পরও রিপনকে দমানো সম্ভব হয়নি। যে কারণে মাথায় মারাত্মক জখম হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অমিতের মৃত্যু হয়।

পুলিশও জানতো না ঘটনা
জানা গেছে, অমিতকে ২৯ মে বুধবার ইফতারের পরপরই মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতে আহত করার বিষয়টি পুলিশকেও অবহিত করা হয়নি। কারাগার থেকে ‘আহত’ অমিতকে বের করা হয় রাত ১১টায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ১১টা ২০ মিনিটে। কারাগারে এমন কোনো গুরুতর ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশকে অবহিত করার নিয়ম থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষ সেটা করেনি। পুলিশকে এড়িয়ে যাওয়ার এই বিষয়টি অনেকটা ইচ্ছাকৃত বলে মনে করছেন সিএমপির একাধিক কর্মকর্তা।

বেলা সাড়ে তিনটায় এ বিষয়ে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ এখনও পর্যন্ত অমিত হত্যার বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেনি।’

ঘটনা গোপনের চেষ্টা ছিল রাত ১১টা পর্যন্ত
অমিতের মৃত্যু নিশ্চিত করতে হামলার বিষয়টিও প্রাথমিকভাবে গোপন রাখার চেষ্টা করে কারা কর্তৃপক্ষ— এমনটা দাবি করছেন অমিতের পরিবার ও তার সতীর্থরা।

বৃৃহস্পতিবার (৩০ মে) দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের লাশঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অমিত মুহুরীর পিতা অরুণ মুহুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে জেলখানা থেকে একজন মোবাইলে ফোন করে বলেছে, জেলখানায় মারামারি হয়েছে। অমিতের ইনজুরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘শরীর দেখে মনে হয়েছে, অমিত দুুপুুরবেলায় মারা গেছে। ডাক্তাররা তাকে অনেক আগেই মৃত ঘোষণা করে দিয়েছেন।’

অমিত হত্যা ‘পরিকল্পিত’ বলে দাবি করছে তার পরিবার। অমিতের পিতা অরুণ মুহুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘অমিত নিজেই বলেছে, ‘‘আমাকে মেরে ফেলবে। ওখানে লাখ লাখ টাকার অফার আসছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলার জন্য পরিকল্পনা করছে। আমাকে অন্য জেলখানায় হস্তান্তর করা হোক।’’

সামনে অমিতের জামিন হতে পারে। এতে মামলার নতুন কোন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাই অমিতকে হত্যা করা হয়েছে—এমনটা মনে করেন অমিতের পিতা। অরুণ মুহুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘একটু শোনা যাচ্ছিল যে, ওর জামিন হতে পারে। এ অবস্থায় অমিতকে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে অমিত হত্যা করা হয়েছে। অমিত হয়তো বেরিয়ে যাবে—এই আশঙ্কা তাদের মধ্যে ছিল। অমিত বেরিয়ে এলে মামলার নতুন কোন তথ্য আসতে পারে—এ আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হল। যদি অমিত বেরিয়ে যেতো, হয়তো কারো ক্ষতি হতো। এ চিন্তাভাবনা ছিল হত্যাকারীদের।’

এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার নাসির আহমেদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ ঘটনায় কারা অধিদপ্তরের একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন তদন্তেই বিষয়টি ওঠে আসবে। কেউ যদি আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তাদের মুখের উপর তো তালা দিতে পারি না।’

সিনিয়র জেল সুপার হঠাৎ ছুটিতে
কারাগার সূত্র জানা যায়, সিনিয়র জেল সুপার আগে থেকেই ছুটি মঞ্জুর করে রেখেছিলেন। অমিতকে আঘাতের বিষয়টি চমেক হাসপাতালে পাঠানো পর্যন্ত তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তবে তিনি আজ বৃহস্পতিবার কারাগারে নেই বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ কামাল হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি আজ থেকে ছুটিতে থাকায় কারাগারের বাইরে আছি। তিনি অমিত হত্যার যাবতীয় বিষয়ে জেলারের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।’

দুই তদন্ত কমিটি
অতিরিক্ত আইজি প্রিজন কর্ণেল আবরার হোসেন, ডিআইজি প্রিজন (চট্টগ্রাম বিভাগ) এ কে এম ফজলুল হক ও নোয়াখালীর সিনিয়র জেল সুপারকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কারা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম মোস্তফা কামাল পাশা এ তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। তবে কারা কর্তৃপক্ষের তদন্ত টিম এখনো কাজ শুরু করেনি।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইলিয়াস হোসেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাশহুদুল কবীরকে প্রধান করে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এ তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার কারাগারের অভ্যন্তরে পরিদর্শনের পাশাপাশি খুনি ও কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে তিনি পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেছেন, ৩২ নম্বর সেলের ছয় নম্বর কক্ষে তিন বন্দি অমিত, রিপন ও বেলাল পাশাপাশি শুয়েছিলেন। রাতে বেলাল হঠাৎ জেগে উঠে দেখতে পায়, রিপন অমিতকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করছে। এর আগে তাদের মধ্যে কোনো ঝগড়ার কথা জানেন না বলে বেলাল দাবি করেছে। অমিত ও রিপনের মধ্যে মারামারির বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের যে ভাষ্য সেটাও তদন্ত করে দেখা হবে।

এদিকে খুনের রহস্য উদঘাটনে বৃহস্পতিবার আদালতে কারাবন্দি রিপন নাথকে শ্যোন অ্যারেস্ট করার আবেদন করেছে ডিবি। সোমবার এ বিষয়ে আদেশ হতে পারে। এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর তার বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করে তাকে নিজেদের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় ডিবি।

এডি/এএস/সিপি

Loading...
আরও পড়ুন