ভিডিও ও ছবি/ চট্টগ্রাম কারাগারের ৩২ নম্বর সেলে ‘ঠাণ্ডা মাথার খুনি’ অমিত মুহুরীকে কুপিয়ে খুন

সংঘর্ষের সূচনা ইফতারের পর, ঘটনা গোপনের চেষ্টা হয়েছিল শুরুতে

0

চট্টগ্রাম কারাগারে রাতে সংঘটিত এক সংঘর্ষে চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী খুন হয়েছেন। ২৯ মে ইফতারের পরপরই চট্টগ্রাম কারাগারের ৩২ নম্বর সেলে এই ঘটনা ঘটেছে। হত্যামামলায় গ্রেপ্তার হয়ে অমিত মুহুরী দীর্ঘদিন ধরে কারাগারের ৩২ নম্বর সেলে ছিলেন। ওই সেলে আরেক সন্ত্রাসী রিপন নাথের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। এতে একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় রিপন নাথ ধারালো অস্ত্র দিয়ে অমিত মুহুরীকে উপর্যুপরি আঘাত করলে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। এ সময় তার মাথা দিয়ে প্রচণ্ডভাবে রক্তপাত হচ্ছিল বলে চট্টগ্রাম কারাগারের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা ৩০ মে রাত ১টা ৪৫ মিনিটে অমিত মুহুরীকে মৃত ঘোষণা করেন।

সংঘর্ষের সূচনা ইফতারের পর
কারাগার সূত্রে জানা যায়, বুধবার ইফতারের পরই সন্ত্রাসী অমিতের সঙ্গে রিপন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কী নিয়ে সংঘর্ষের সূচনা তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। এ সময় সন্ত্রাসী রিপন তার মাথায় অসংখ্য আঘাত করে। কারা কর্তৃপক্ষ শুরুতে নিজেদের বাঁচাতে ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করে। এতে প্রাথমিকভাবে কারাগারে চিকিৎসা দিয়ে গোপনে অমিতকে সুস্থ করার চেষ্টা চালান কারা হাসপাতালের চিকিৎসকরা। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েই কারাগারে হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে চমেক হাসপাতালের নেওয়ার পরামর্শ দেন। কারাগার থেকে অমিতকে রাত ১১টায় বের করা হয়। আর ততক্ষণে অমিতের মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর আগে মাথায় ৩০টি সেলাই

অমিত মুহুরীর মাথায় প্রায় ৩০টি সেলাই করা হয়।
অমিত মুহুরীর মাথায় প্রায় ৩০টি সেলাই করা হয়।

চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার নাছির উদ্দিন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘অমিত মুহুরী দীর্ঘদিন ধরে কারাগারের ৩২ নম্বর সেলে ছিলেন। ওই সেলে থাকা অপর আসামি রিপন নাথের সাথে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে অমিতকে আঘাত করলে সে গুরুতর আহত হয়। রিপন নাথ অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারের ৩২ নম্বর সেলে রয়েছে।’

চমেক হাসপাতাল ফাঁড়ির এএসআই শীলাব্রত বড়ুয়া চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানান, রাত ১১টা ২০ মিনিটে অমিত মুহুরীকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হলে তাকে নিউরোসার্জারি বিভাগের ২৮ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসকরা ৩০ মে রাত ১ টা ৪৫ মিনিটে অমিত মুহুরীকে মৃত ঘোষণা করেন।

রাত ২টায় চমেক হাসপাতাল নিউরোসার্জারি বিভাগের ২৮ নং ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. খুরশিদ আনোয়ার চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘অমিত মুহুরীর মাথায় লৌহজাত ধাতুর বড়ো রকমের আঘাত ছিল। তার মাথায় প্রায় ৩০টি সেলাই করা হয়।’

অমিত মুহুরীর উত্থান যেভাবে

ধারালো অস্ত্র দিয়ে অমিত মুহুরীকে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়
ধারালো অস্ত্র দিয়ে অমিত মুহুরীকে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়
অমিত মুহুরী হত্যার আরও খবর

খুন দিয়েই অমিত মুহুরীর অপরাধজগতে অমিত মুহুরীর হাতেখড়ি। এ কারণে অপরাধজগতে নামার শুরু থেকেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেন তিনি। নিজেকে যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দেয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই পরিচিতি পান তিনি। অপরাধ কর্মকান্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও সক্রিয় হয়ে পড়েন অমিত মুহুরী। ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে নগরীর নন্দনকানন, সিআরবি থেকে শুরু করে লালদীঘি, আন্দরকিল্লা পর্যন্ত তার একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল-বেদখলের ঘটনায় নেতৃত্ব দেয়ার পাশাপাশি এ এলাকার অপরাধের সকল ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন তিনি। নন্দনকাননকেন্দ্রিক যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী হিসেবে যুবলীগের রাজনীতিতেও তিনি হয়ে উঠেন প্রভাবশালী। দুঃসাহসিকতার জন্য দলে ছিল অমিত মুহুরীর আলাদা সমাদর। নেতৃত্বের গুণাবলী এবং খুব সহজে অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা মাত্র আড়াই বছরে তাকে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। পরিচিতির ব্যাপকতা আসে সিআরবির ডবল মার্ডারের মাধ্যমে। বারে বারে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়া অথবা গ্রেপ্তার হলেও অল্প সময়ের মধ্যে বের হয়ে আসা তাকে আরো বেপরোয়া করে তোলে।

নগরীর নন্দনকানন এলাকার বাসিন্দা অজিত মুহুরীর বড় ছেলে অমিত। তাদের গ্রামের বাড়ি রাউজান পৌরসভা এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। এসএসসি পাস করেন রাউজান পৌরসভার সুরেশ বিদ্যায়তন থেকে। এর পর চট্টগ্রাম শহরে এসে ওমর গণি এমইএস কলেজে ভর্তি হলেও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি।

বন্ধুকে ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে মুহুরীর উত্থান
বন্ধুকে ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে মুহুরীর উত্থান

একের পর এক নৃশংসতাই ছিল তার বৈশিষ্ট্য
অমিত মুহুরী গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। কয়েকজনকে নৃশংস কায়দায় খুন করেন, আরও কয়েকজনকে মারাত্মক আহত করেন। সিআরবিতে জোড়া খুনের অন্যতম আসামি তিনি। ২০১৩ সালের ২৪ জুন টেন্ডারবাজির ঘটনায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে যুবলীগ কর্মী সাজু পালিত ও হেফজখানার ছাত্র আরমান হোসেন মারা যান। ওই ঘটনায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের সাথে গ্রেপ্তার হন অমিত মুহুরী। কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে এসে যুবলীগের নেতা পরিচয় দিতে শুরু করেন অমিত। এরপর এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং একইসঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকান্ডের গতি বাড়িয়ে দেন অমিত মুহুরী। ২০১৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নগরীর আমতল এলাকায় খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী ইয়াছিন আরাফাত। এ ঘটনায় অমিত মুহুরীর জড়িত থাকার প্রমাণ পায় পুলিশ। অমিত মুহুরীর বিরুদ্ধে একাধিক খুনসহ অন্তত ১৩টি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে। আরও বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

বন্ধুকে ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে মুহুরীর উত্থান
২০১২ সালে নগরের মোমিন রোডের ঝাউতলা এলাকার যুবলীগ কর্মী মো. রাসেলের সঙ্গে পরিচয় হয় অমিত মুহুরীর। দুজনের মধ্যে গড়ে উঠে সখ্য। একপর্যায়ে নারীঘটিত বিষয় নিয়ে দুজনের বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। এর জেরে অমিত মুহুরীকে মারধর করেন রাসেল। পরে প্রতিশোধ নিতে অমিত মুহুরী তার সহযোগীদের নিয়ে রাসেলকে তুলে নিয়ে যান। আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠে নিয়ে প্রথমে তাকে বেধড়ক পেটায়। পরে তার শরীরে ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে খুুঁচিয়ে নিপীড়ন করেন। একপর্যায়ে মৃত মনে করে মাঠে ফেলে যায় তারা। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় রাসেলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক মাস নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর রাসেলের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর দেশ ছেড়ে ভারতে পালান অমিত। পরে ফিরে এলে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। কিছুদিন পর আবার জামিনেও বেরিয়ে আসেন।

সিআরবিতে জোড়া খুন, অতঃপর নিজের বাহিনী
২০১৩ সালের ২৪ জুন চট্টগ্রাম নগরের সিআরবি সাত রাস্তার মোড় এলাকায় রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে খুন হন লাভ লেন এলাকার যুবলীগ কর্মী সাজু পালিত (২৫) এবং সিআরবি এলাকার মো. ছিদ্দিকের ছেলে মো. আরমান (৮)। অমিত মুহুরী চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের মামলায় অন্যতম আসামি। নগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর এ ঘটনায় তিনি গ্রেপ্তার হন। এরপরই মূলত নিজের একটি আলাদা বাহিনী গড়ে তোলার প্রতি তিনি মনোযোগী হন।

বাথরুমে লাশ রেখে রাতভর গান, সঙ্গে ইয়াবা
অমিত মুহুরী পরে আলাদা করে আলোচনায় আসেন ছোটবেলার বন্ধুকে খুন করে। ইমরানুল করিম ইমন ও অমিত মুহুরী বাল্যবন্ধু। রাউজান পৌরসভা এলাকায় তাদের বাড়ি। ২০১৭ সালের ৮ আগস্ট রাতে অসুস্থতার কথা বলে নন্দনকাননের বাসায় ইমনকে ডেকে নিয়ে যায় অমিত মুহুরী। ৯ আগস্ট ভোরে নৃশংসভাবে খুন করেন তাকে। শুরুতে ড্রামের ভেতরে মরদেহ রেখে এসিড ও চুন ঢেলে সেটা গলিয়ে হাড়গোড় নদীতে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। খুনের পর ইমনের লাশ বাথরুমে রেখে রাতভর গান শোনেন অমিত মুহুরী। সাথে ছিল স্ত্রী চৈতী ও বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব। গানের সাথে চলে ইয়াবা সেবনের আসর। কিন্তু একদিন পরও মরদেহ অবিকৃত থাকায় সেটি খণ্ড খণ্ড করে কেটে ফেলার চেষ্টা করে। মরদেহ শক্ত হয়ে যাওয়ায় অমিতের ওই পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়। এর পর জোগাড় হয় এসিড, চুন, সিমেন্ট, বালি। ড্রামে লাশ ভরে এসিড ঢেলে গলানোর চেষ্টা হয়। এরপর তাতে চুন ঢেলে সিমেন্ট, বালি দিয়ে ঢালাই করা হয়। পরে ড্রাম ফেলে দেওয়া হয় রাণীর দীঘির পানিতে। ১৩ আগস্ট দীঘি থেকে ড্রামভর্তি গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ৩১ আগস্ট অমিতের বন্ধু ইমাম হোসেন মজুমদার ওরফে শিশির (২৭) ও হরিশদত্ত লেনের বাসার নিরাপত্তারক্ষী শফিকুর রহমান শফিকে (৪৬) আটক করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। এর দুই দিন পর কুমিল্লার একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে অমিত মুহুরীকে গ্রেফতার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় খুনের দায় স্বীকার করে পরস্পরকে দায়ী করে আদালতে জবানবন্দি দেন শিশির ও অমিত।

মোটরসাইকেল ফেরত চাওয়াই কাল হয়েছিল ইয়াছিনের
গত ১১ ফেব্রুয়ারি সিটি কলেজের ছাত্রলীগ নেতা ইয়াছিনকে দিনদুপুরে নগরের আমতলা এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অমিত মুহুরী জড়িত বলে দাবি সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতাদের। খুন হওয়ার কিছুদিন আগে ইয়াছিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এর মধ্যে ইয়াছিনের ইয়ামাহা কোম্পানির এফজেডএস মোটরসাইকেলটি নিয়ে নেন অমিত। মোটরসাইকেল চাইতে গেলে ইয়াছিনকে হুমকি-ধমকি দেন। বিষয়টি ইয়াছিন তার রাজনৈতিক বড় ভাইকে জানালে তিনি অমিত মুহুরীকে পাল্টা হুমকি-ধমকি দেন। এর জের ধরে ইয়াছিনকে খুন করা হতে পারে বলে ধারণা ছাত্রলীগ নেতাদের।

কখনো ছাত্রলীগ নেতা, কখনো পুলিশ তার লক্ষ্যবস্তু
২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বাকলিয়া এলাকায় মোটরসাইকেলে শোডাউন করে ত্রাস সৃষ্টি করেন অমিত মুহুরী। এ বিষয়ে জানতে চাওয়ায় ছাত্রলীগ নেতা তানজিরুল হকের পায়ে প্রকাশ্যে গুলি চালায় সে। ওই বছরেরই ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন নগরীর ডিসি হিলে পুলিশের ওপর হামলা চালান অমিত মুহুরী ও তার অনুসারী সন্ত্রাসীরা। ২০১৭ সালের ২৮ এপ্রিল রাতে নগরের কোতোয়ালী থানার মোমিন রোডের ঝাউতলা এলাকায় স্থানীয় কিশোর-তরুণদের দুই পক্ষের মারামারি হয়। এর একপর্যায়ে পিস্তল উঁচিয়ে সেখানে প্রকাশ্যে গুলি চালায় অমিত মুহুরী, যা সিসিটিভির ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এ ঘটনায় ২৫ মে তাকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালী থানার পুলিশ। ২৬ জুন জামিনে বেরিয়ে আসেন ঠাণ্ডা মাথার এই খুনি।

এএস/সিপি

Loading...
আরও পড়ুন