নজরকাড়া অ্যাকোয়ারিয়াম/ জামালখানের সৌন্দর্যে নতুন পালক

0

চট্টগ্রাম মহানগরীর জামালখান ওয়ার্ডের মানুষের কাছে আতঙ্কের আরেক নাম ছিল পিডিবি অফিসার্স কোয়াটার্স সংলগ্ন নালা। ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য ছিল এ নালাটি, সন্ধ্যা হলেই ভূতুড়ে। জামালখান মোড়ে ছিনতাই ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ছিনতাই করে অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকাটির নালা দিয়ে নিরাপদে সরে পড়তো ছিনতাইকারীরা। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে এ নালা ব্যবহার করে। বর্ষায় সেখানে আরেক দুর্ভোগে পড়তো পথচারীরা। এখন এ সবকিছুরই অবসান হতে যাচ্ছে। জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের উদ্যোগে এই নালা ও সংলগ্ন জায়গা আসছে সৌন্দর্যবর্ধনের আওতায়। এর ফলে এই এলাকায় ছিনতাইসহ বন্ধ হবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড—এমনটিই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে নালা ও পরিবেশগত কোনো প্রতিবন্ধকতা যাতে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাজ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরশনের (চসিক) পরিকল্পনা বিভাগ।

chittagong-jamalkhan-aquarium
সাড়ে ৪০০ ফুটের এই জায়গায় থাকবে বাগান, বসার জায়গা ও দৃষ্টিনন্দন অ্যাকোয়ারিয়াম।

জানা গেছে, জামালখানের পিডিবি অফিসার্স কোয়াটার্স সংলগ্ন পরিত্যক্ত নালাটি ইতিমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) অনুমোদনে ও শৈবাল দাশ সুমনের উদ্যোগে বর্তমানে চলছে সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজ। সাড়ে ৪০০ ফুটের এই জায়গায় থাকবে বাগান, বসার জায়গা ও দৃষ্টিনন্দন অ্যাকোয়ারিয়াম। নালা সংস্কার করার পর ফুটপাতসহ মোট ১৫ ফুট জায়গায় চলছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। এর মধ্যে ফুটপাতের জন্য রাখা হয়েছে সাত ফুট জায়গা। পিডিবি অফিসার্স কোয়ার্টারের প্রথম ফটক থেকে শেষ ফটক পর্যন্ত আট ফুট প্রস্থ ও ৪৫০ ফুট দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট জায়গায় খোলা নালায় স্ল্যাব নির্মাণ করে সেখানে দুটি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। দুই স্থাপনাতে দুটি ৩৫ বর্গফুটের বড় অ্যাকোয়ারিয়াম এবং চার বর্গফুটের দুটি অ্যাকোয়ারিয়াম বসানো হবে। নালা সংলগ্ন দেয়ালটি পরিস্কার করে সেখানে হচ্ছে সবুজায়ন। নালা দিয়ে পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থে এবং ময়লা-আবর্জনা যাতে নালায় না পড়ে সেজন্য নালার মুখে লাগানো হয়েছে জাল। এখানে আটকে থাকা বর্জ্য নিয়মিত পরিস্কার করা হচ্ছে। বসার জায়গাগুলোতে ১৪০-১৫০ জন দর্শনার্থী বিশ্রাম, বিনোদন ও সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারবে। পুরো প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ২৫ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে বাগান ও বসার জায়গার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরই মধ্যে সেখানে শুরু হয়েছে দর্শনার্থীদের জটলা। কাজ শেষ হওয়ার আগেই লোকজন বসার জায়গায় বিশ্রাম নিচ্ছেন।

chittagong-jamalkhan-aquarium
একটু পর পর বসার জায়গা, এরপরই থাকবে বাগান।

জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন জানান, ‘নালা দিয়ে বর্জ্য যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পুরো জায়গায় ৩০ ফুট পর পর নালা থেকে মাটি-ময়লা উত্তোলনের জন্য স্ল্যাব রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের অনেকগুলো নালা অবহেলিত। জামালখানের এ নালাটিও পাহাড়ি ঢলে বালিতে ভরে যেত। এখন নালাটি দেখভালের জন্য লোকবল রাখা হবে। তারা নিয়মিত নালা পরিস্কার করবে। ফলে নালায় ময়লা-আবর্জনা জমে এ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।’

শৈবাল দাশ সুমন বলেন, ‘একসময় ছিনতাইকারীরা ছিনতাই করে এই নালা দিয়ে পালিয়ে যেত। এখন আর সেই সুযোগ থাকছে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইনডোরে অ্যাকোয়ারিয়াম থাকলেও ফুটপাত সংলগ্ন জায়গায় নেই। ফলে জামালখানে অ্যাকোয়ারিয়াম বসানোর পর বিনোদনে নতুন মাত্রা যোগ হবে। এখানে একটু পর পর বসার জায়গা, এরপরই থাকবে বাগান। মাঝখানে অ্যাকোয়ারিয়াম। প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ লোক এখানে বিনোদনের সুযোগ পাবে। এখানে থাকবে সাউন্ড সিস্টেম, যেখানে রবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীতসহ পুরানো দিনের গান মৃদু স্বরে বাজবে। সবিমিলিয়ে এই স্থানটি চট্টগ্রাম শহরের বিনোদনের স্থান হিসেবে পরিণত হবে।’

চসিকের প্রধান পরিকল্পনাবিদ স্থপতি রেজাউল করিম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এখানে অপরিচ্ছন্ন নালা ছিল। সেটি সংস্কার করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত ফুটপাত রাখা হয়েছে, যা আগে নালা ছিল। পরিকল্পিতভাবে ফুটপাত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। অ্যাকোয়ারিয়াম বসানো হলে আশা করছি একটি নান্দনিক কাজ হবে। এটাকে একটি বিনোদনের ভিন্ন মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করছে চসিক। যেখানে পরিবেশগত কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না।’

এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘অ্যাকোয়ারিয়াম হলে কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শে আসবে মানুষ। বৈচিত্রময় কিছু পেলে মানুষের একঘেঁয়েমি কাটবে। এতে লোকসমাবেশ বেশ হবে। জামাল খানে বর্তমানে সন্ধ্যায় নারী-পুরুষ, শিশুসহ সবাই ভিড় করে। অ্যাকোয়ারিয়াম হলে এই এলাকাটি আরও সমৃদ্ধ হবে। ভালো একটি পরিবেশ তৈরি হবে।’

বিনোদনের জন্য ভিন্ন কিছু প্রয়োজন বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। জামালখানে অ্যাকোয়ারিয়াম বসানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটি খুব ভালো উদ্যোগ। উন্নয়নের একটি প্রধান ও অপরিহার্য অংশ হচ্ছে সৌন্দর্যবর্ধন। জামালখানে অ্যাকোয়ারিয়াম বসানো হচ্ছে- তাই সেখানে মানুষের এক্সেস থাকতে হবে। নিরাপদে মানুষ যেন তা অবলোকন করতে পারে। তবে সবকিছু পরিকল্পিতভাবে হতে হবে। এলাকাবাসীর সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। তারা কী চান- তা দেখতে হবে।’

Loading...
আরও পড়ুন