ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণ/ চট্টগ্রামের হাসপাতালে ঠাঁই নেই শিশুরোগীর চাপে

0

বর্গাকৃতি বক্সের ভেতর শান্ত ছেলের মত ঘুমিয়ে আছে শিশু আরিফ আর শাহাদাত। পায়ে ক্যানোলা আর নাকে স্যালাইনের লাইন দেওয়া। একটু সময় পর পর আরিফের চিৎকারে প্রায় দিশেহারা হয়ে নার্সদের কাছে ছুটছেন বাবা-মা। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে অতিরিক্ত কান্নায় ক্লান্ত হয়ে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে। করুণ চোখে সন্তানের দিকে তাকিয়ে থাকে অসহায় বাবা। পাশেই গুটিসুটি মেরে বসে আছেন মা রেহেনা পারভিন। একই বেডে দুই শিশু হওয়ায় তাদের সুবিধার্থে শাহাদাত হোসেনের মা হাসপাতালের মেঝেতে বসে আছেন। একই চিত্র অন্যান্য বেডেও। আবার কোনো কোনো বেডে ক্ষেত্রবিশেষে তিন-চারজন শিশুও রয়েছে।

chittagong-medical-child-ward
ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো রোগের প্রকোপ বাড়ে এ সময়।

শয্যাসংখ্যা ১০২, রোগী ৪৮৫
ঈদের চারদিন আগে দুই বছরের শিশু সুলতানার ১০৩ ডিগ্রি জ্বর দেখে চিন্তায় পড়ে যান বাবা মনিরুল ইসলাম। অবস্থার অবনতি দেখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) আনা হলে বেড না পেয়ে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা করাতেও পিছপা হননি সুলতানার বাবা-মা। চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে। শিশু ওয়ার্ডের তিনটি সাধারণ ইউনিটে মোট ৬৫ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি থাকে। বিশেষ চারটি ইউনিটসহ সবকটি ইউনিট মিলে শিশু ওয়ার্ডে শিশুরোগীর জন্য মোট শয্যাসংখ্যা ১০২। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসাধীন শিশুরোগীর সংখ্যা প্রায় ৪৮৫। এছাড়া রোগীর সঙ্গে আসা এক বা দুজন স্বজন তো আছেই। রোগী আর স্বজন মিলিয়ে ঘিঞ্জি এক পরিবেশ শিশু ওয়ার্ডে। তবে শিশু মেডিসিন বিভাগে প্রচুর রোগীর চাপ থাকলেও খালি পড়ে আছে শিশু বিভাগের বিশেষ চারটি ইউনিট।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদ বলেই রোগীর চাপ যা দেখছেন তা অনেক কম। মেডিসিন ওয়ার্ডে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগলে তাদের রাখা হয় আর অন্যদিকে সার্জারি বিভাগে অপারেশন করার রোগীদের রাখা হয়। এক ওয়ার্ডের রোগী ভিন্ন ওয়ার্ডে রাখাটাও সমস্যার।’

chittagong-medical-child-ward
প্রায় সব হাসপাতালে আগের তুলনায় শিশু ওয়ার্ডে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে।

একই অবস্থা সবখানেই
চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে গিয়ে দেখা গেছে, শিশুরোগী আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রায় সব হাসপাতালে আগের তুলনায় শিশু ওয়ার্ডে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালেও গত এক সপ্তাহ ধরে রোগীর চাপ বেড়েছে। এ হাসপাতালে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু ওয়ার্ড রয়েছে। তার বিপরীতে রোগী আছে ৩৯৩ জন। অতিরিক্ত শিশু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যে শয্যাই খালি হচ্ছে, সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

chittagong-medical-child-ward
চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ফ্লুর প্রার্দুভাব
রমজানে কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। এতে বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রকোপ আনুপাতিক হারে বেড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের আবহাওয়া শিশুদের জন্য খুবই মারাত্মক। ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো রোগের প্রকোপ বাড়ে এ সময়। যাকে বলা হয় ‘ভাইরাল ফিভার’ বা মৌসুমী রোগ। মৌসুমী রোগের মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়া, সর্দি, কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা-বেদনা ইত্যাদি। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি থেকেও ইনফ্লুয়েঞ্জা, প্যারা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে যে কোনো শিশু। বড়দের থেকেও ভাইরাস রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি তাদের বেশি। এসব রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা অন্যান্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় শয্যা সংকুলানও হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী জানান, শিশুরোগীর বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত জ্বরে ভুগছে। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে আরএসবি (রেসপিরেটারি সিনসেটিয়াল ভাইরাস) ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণজনিত ব্যাধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের প্রকোপ। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কারণ ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া একইসঙ্গে আক্রমণ করলে মৃত্যুও হতে পারে।

রোগীদের অভিযোগ: ‘সরকারি মেডিকেল না কসাইখানা?’
ওয়ার্ডে থাকা ৯০ শতাংশ রোগীর অভিযোগ হাসপাতাল থেকে ওষুধ সরবরাহ করা হলেও সে ওষুধ পাচ্ছেন না তারা। গেইটে থাকা নিরাপত্তা প্রহরী থেকে শুরু করে আয়া পর্যন্ত টাকা ছাড়া এক পাও নড়তে চায় না। সাথে দুর্ব্যবহার তো থাকেই। নার্সদের ডাকলেও সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না।

এক শিশুরোগীর অভিভাবক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ওষুধপাতি সব বাইরে থেকে কিনতে হয়। এ জায়গা থেকে শুধু স্যালাইনের পানি ছাড়া কিছুই দেয় নাই। এটা সরকারি মেডিকেল না কসাইখানা! এতো খারাপ আচরণ করে। নেবুলাইজেশন দিতে গেলেও এদের টাকা দিতে হয়।’

এ অভিভাবককে কথা বলতে দেখে আরেক শিশুর অভিভাবক কাছে এসে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেন, ‘১৪৪ ঘন্টার ভেতরে এখনো বড় কোনো ডাক্তার আসেননি। আর মেডিসিন তো দূরে থাক, শুধু সুঁই নয়, টেপ পযন্ত কিনে আনতে হয়।

তিনি আরও জানান, চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার কারণে এ ওয়ার্ডে গত তিন দিনে মারা গেছে প্রায় ১৮ জন বাচ্চা! আয়ার কাজ ওয়ার্ড পরিষ্কার রাখা। অথচ আয়াকে ১০০ টাকা না দিলে সে কাজই করতে চায় না।

মনিরুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানান, ‘ঈদের আগের দিন জ্বরের জন্য বাচ্চা নিয়ে আসছি। একে তো সিট পাই নাই, তার ওপর নার্সগুলো যে কত জঘন্য আচরণ করে বলে শেষ করা যাবে না। কী ওষুধ লাগবে তা স্লিপ করে না দিয়ে একটা একটা করে বারবার পাঠায় ওষুধ কিনতে। খাওয়ানোর পরিমাণ ও নিয়ম জানতে চাইলে বলে “যেভাবে মনে হয় সেভাবে খাওয়ান।”

জাফর নামে আরেক অভিভাবক চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটা কসাইখানা! ২৪-২৫ সাইজের ক্যানুলা ৯৫ থেকে ১০০ টাকা নেয়। আরেকটা ইনজেকশন ৭০০ টাকা। পরে দেবে বলে হাফ দিয়ে বাকিটুকু ফেলে দিছে।

নেজাম উদ্দিন নামের আরেক অভিভাবক বলেন, ‘কী লাভ এসব বলে! তারা কস্টেপ (স্কচটেপ) আনায় একটা আর ব্যবহার করে তাদের কাছে থাকা পুরাতনটা।’

ওষুধের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল মান্নান এক অভিভাবক বলেন, ‘গতকাল সন্ধ্যায় আসছি। ওষুধ দিলে পকেটে এতো সিলিপ কেন! একটা ইঞ্জেকশন আর স্যালাইন হচ্ছে ৬১৩ টাকা!’

রোগীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা.আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘এই বিষয়টায় কিছু সিন্ডিকেটের কার্যক্রম সম্পর্কে টের পেয়ে আমরা অ্যাকশন নিয়েছি। তবে পুরোদমে নির্মূল করতে এখনও পারিনি। বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখে কাজ করবো যাতে রোগীরা প্রতারিত না হয়।’

চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল সরকারি ওষুধ
হাসপাতালে ওষুধ সংকট প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন এভারেজ ৬০০ রোগী ভর্তি হয় তাহলে এক বছরে রোগী হয় দুই লাখ ১৯ হাজার। চিকিৎসা খাতে সরকারের বাজেট থাকে ২৭ কোটি টাকার। আবার এর মাঝে ইকুইপমেন্টও থাকে। পাশাপাশি আউটডোরে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার রোগী সেবা নেয়। বছরে ৩৬ লাখের বেশি মানুষ আউটডোরে সেবা নিতে আসে।’

তিনি বলেন, ‘যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে সে হারে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হচ্ছে না বলেই চাহিদা বেড়ে চলছে। তাই সব রোগীদের এখান থেকে ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে গরিব ও অসহায় রোগীরা অবশ্যই ওষুধ পায়।’

Loading...
আরও পড়ুন