এবার অপহরণের আসামি ছাড়াতে মধ্যরাতে কোতোয়ালী থানায় কাউন্সিলর বিপ্লব (ভিডিও)

0

একদিন আগেই এক প্রাইভেটকার চালককে ছাড়াতে গিয়ে থানায় নারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে ক্ষমা চেয়ে পার পান কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব। কিন্তু পরের দিনই তিনি আবারও গভীর রাতে থানায় যান তদবির নিয়ে। এবার চন্দনাইশের এক যুবক অপহরণের দায়ে আটক হওয়া দুই আসামিকে ছাড়িয়ে আনতে কোতোয়ালী থানায় যান রোববার গভীর রাতে। তবে অনেকক্ষণ থানার ভেতর অপেক্ষা করেও পুলিশের অনড় অবস্থানের মুখে থানা থেকে দলবল নিয়ে চলে আসতে বাধ্য হন কাউন্সিলর বিপ্লব।

হাসান মুরাদ বিপ্লব ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর যুব লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য ও নগর ছাত্রলীগের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বোর্ড সদস্য। তিনি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী এবং একইসঙ্গে সিজেকেএসের কাউন্সিলর।

জানা গেছে, চন্দনাইশের এক বিকাশ এজেন্টকে জিম্মি রেখে দুই লাখ টাকা দাবি করে একটি চক্র। মৌখিকভাবে এ অভিযোগ পেয়ে কোতোয়ালী থানা পুলিশের একটি দল রোববার রাত দেড়টার দিকে কৌশলে কোতোয়ালীর মোড় থেকে তিনজনকে আটক করে। পরে যাচাইবাছাই শেষে একজনকে ছেড়ে দিলেও সম্পৃক্ততার অভিযোগে ফিরিঙ্গি বাজার ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আব্দুল আজিজ ও ইমতিয়াজকে আটক রাখে পুলিশ। খবর পেয়ে রাত দুইটার পর কোতোয়ালী থানায় আসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব। অনেকক্ষণ তিনি থানায় অফিসারদের কক্ষে অবস্থান নিয়ে আটক দুজনকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেন। পুলিশের অনড় অবস্থানের মুখে এক পর্যায়ে তিনি দুই আসামিকে ছাড়াই দলবল নিয়ে থানা ছাড়তে বাধ্য হন।

চন্দনাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কেশব চক্রবর্তী বলেন, ‘চন্দনাইশের এক বিকাশ এজেন্টকে অপহরণ করে সাতকানিয়ার হলদিয়ার একটি পাহাড়ে জিম্মি করে রাখে অপহরণকারীচক্র। পরে কোতোয়ালী থানা পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে হলদিয়া থেকে উদ্ধার করা হয় ওই বিকাশ এজেন্টকে। ইতোমধ্যে আমাদের একজন অফিসারকে কোতোয়ালী থানায় পাঠিয়েছি। তাদের কাছ থেকে আটক দুই অপহরণকারীকে আমাদের জিম্মায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্তারিত জানতে পারব।’

এদিকে কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কামরুজ্জামান বলেন, ‘রিয়াজ উদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী পরিচয়ে এক লোক তার আত্মীয়কে অপহরণ করা হয়েছে বলে ওসি স্যারকে মৌখিকভাবে জানান। টাকা নেওয়ার জন্য অপহরণকারী চক্রের দুই সদস্যকে কোতোয়ালীর মোড়ে আনা হলে কৌশলে দুজনকে আটক করা হয়। পরে জানা যায়, এটি চন্দনাইশের ঘটনা আর ভিকটিম সাতকানিয়ায়। এখন আমরা আটক দুজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে চন্দনাইশ থানায় হস্তান্তর করব।’

গতকাল রাতে এই দুইজনকে ছাড়াতে থানায় যাওয়ার ভিডিও চট্টগ্রাম প্রতিদিনের কাছে সংরক্ষিত আছে। ওই ভিডিওতে কোতোয়ালী থানার অফিসারদের রুমে একটি চেয়ারে পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় বসে আছেন কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব। তার আশপাশে অনেক মানুষজন সেখানে তাকে ঘিরে আছে। এ বিষয়ে জানতে কাউন্সিলরের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।

পরে রোববার রাত পৌনে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম প্রতিদিন অফিসে ফোন করে কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব বলেন, ‘একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার জনগণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন সমস্যায় থানায় যেতে হয়। কিন্তু যখনই বেআইনিভাবে কেউ কোনো সহযোগিতা চায় তা আমি অগ্রাহ্য করি। এখন আপনারাই বলেন, জনগণের জন্য একজন জনপ্রতিনিধির থানায় যাওয়া কি অপরাধ?’

যা ঘটেছিল শনিবারের রাতে

শনিবার (১১ মে) বিকেল সাড়ে ৫ টার দিকে নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন জিপিওর সামনে সংকেত অমান্য করায় রকিবুল আলম নামে এক প্রাইভেট কারচালকের সঙ্গে ট্রাফিক কনস্টেবল আবুল কালামের বাকবিতণ্ডা হয়। সেই সময় ট্রাফিক সদস্যের ওপর ওই চালকের চড়াও হওয়ার খবর পেয়ে কোতোয়ালী থানার এসআই বাবলু কুমার পালের নেতৃত্বে একটি টিম গিয়ে রকিবুলকে আটক করে থানায় নিয়ে আসেন। এ খবর পেয়ে শনিবার ইফতারের আগে কাউন্সিলর বিপ্লব কয়েকজন অনুসারী নিয়ে কোতোয়ালী থানায় যান। সেখানে গিয়ে ট্রাফিক কনস্টেবল আবুল কালামকে জড়িয়ে ধরে বিষয়টি মিটমাট করার অনুরোধ করেন বিপ্লব। তখনই ডিউটি অফিসার পিএসআই নেলী দাশ বিষয়টি ওসির সঙ্গে কথা বলে মীমাংসার জন্য ইফতারের পরে আসতে বলেন বিপ্লবকে। তখন কাউন্সিলর বিপ্লব পিএসআই নেলী দাশের কাছে জানতে চান, তাকে চেনেন কিনা? এসময় পিএসআই নেলী দাশ তাকে বলেছেন, ‘আপনি যেই হোন ওসি স্যারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। ওই প্রাইভেট কারচালককে ছাড়া হবে না।’

এ কথা শুনে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যান কাউন্সিলর বিপ্লব। তখন কর্তব্যরত ডিউটি অফিসারের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করে নিজের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব জাহির করতে থাকেন বিপ্লব। এসব দেখে থানার অন্য অফিসাররা এসে বিপ্লবকে সেকেন্ড অফিসারের রুমে নিয়ে যান। এ খবর ওসি মহসীনকে জানানো হলে তিনি তাৎক্ষণিক ডিসি (সাউথ) এসএম মেহেদী হাসানকে ফোনে জানান। ডিসি এ খবরটি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে ফোনে জানান। ডিসি মেহেদী হাসান মেয়রের কাছে জানতে চান, থানায় গিয়ে পোশাকধারী পুলিশ অফিসারের সঙ্গে একজন কাউন্সিলর কিভাবে মারমুখী আচরণ করেন?

এ ঘটনায় মেয়র সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে মীমাংসা করার প্রস্তাব দিলে রাত ১১টার পর ওসি মহসীনের কক্ষে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লবের বৈঠক হয়। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এ বৈঠকে সব পুলিশ কর্মকর্তাই কাউন্সিলর বিপ্লবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে মত দেন। এ সময় মেয়র ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে ফোনালাপের পর বিপ্লব সেই পুলিশ কর্মকর্তা পিএসআই নেলী দাশের কাছে সরাসরি ক্ষমা চাইতে রাজি হন। পরে ওসির কক্ষেই নেলী দাশের কাছে ক্ষমা চান বিপ্লব। আর ওসি মহসীন এ ঘটনায় বিপ্লবের বিরুদ্ধে একটি জিডি করেন।

এডি/সিপি

Loading...
আরও পড়ুন