অমানুষের ব্যবসা/ শিশুদের জরুরি ওষুধের বাজারে হঠাৎ কৃত্রিম অভাব চট্টগ্রামে

0

মৌসুমী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে যখন শিশুরোগীর প্রচণ্ড ভিড়, ঠিক তখনই শিশুদের অতি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরক্ষাকারী কিছু ওষুধের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটে নেওয়ার চেষ্টা করছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। এর ফলে একদিকে জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে অসুস্থ শিশুরা, অপরদিকে অভিভাবকদের দিন কাটছে উৎকণ্ঠায়। অথচ এ ব্যাপারে কিছুই জানে না চট্টগ্রামের ওষুধ প্রশাসন।

chittagong-medical-childrens-ward
মৌসুমী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শিশুরোগীর প্রচণ্ড ভিড়

নগরীতে ওষুধের পাইকারি বাজার হাজারীগলি, বহদ্দারহাট, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এলাকা, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল এলাকা, গোলপাহাড় মোড়সহ অন্যান্য খুচরা ফার্মেসিগুলোতে ঘুরে দেখা যায় একই চিত্র—‘নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ কোথাও নেই।’

ভুক্তভোগী অভিভাবক সুলতান আহমেদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানান, ‘প্যারাসিটামলজাতীয় সিরাপের মধ্যে শিশুরা এইস-সাসপেনশন খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। রমজানের আগে থেকেই বাজারে অখ্যাত কোম্পানির সিরাপের ছড়াছড়ি থাকলেও এইস-সাসপেনশন নেই। ফার্মেসি মালিকরা বলছে সরবরাহ নেই। সাসপেনশন নেই তাই সাপোজিটরিই আপাতত ভরসা। অথচ বহদ্দারহাট, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এলাকা ও গোলপাহাড় এলাকায় নাপা সাপোজিটরি-২৫০ মিলি না পেয়ে হাজারীগলি গেলাম। হাজারীগলিতে কমপক্ষে ২০টি দোকান খুঁজে একটা দোকানে পেলাম। তাও পাঁচ টাকার একটি সাপোজিটরি কিনলাম ১০ টাকার বিনিময়ে।’

বেশি দামে কেন কিনলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টাকার চেয়ে বাচ্চার সুস্থতা জরুরি। শুধু ১০ টাকা নয়, তার দ্বিগুণ দাম চাইলেও সাপোজিটরি কিনতে হতো। উপায় নেই।’

মির্জারপুল এলাকার একটি ফার্মেসির সামনে ফাতেমা নাসরিন নামের এক মহিলা হাতে দেখা মিলল এইস সাসপেনশন সিরাপের। তিনি জানালেন, দোকানে দুটো সিরাপ ছিল। একটি তিনি কিনেছেন। গায়ে দাম বিশ টাকা হলেও তাকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৩০ টাকা।

নগরীর মেহেদীবাগে অবস্থিত সরকারঘোষিত মডেল ফার্মেসির মালিক জহিরুল ইসলাম জানান, সাপোজিটরিসহ কিছু ওষুধের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে প্যারাসিটামল গ্রুপের সিরাপ, সাপোজিটরি, ডাইক্লোফেনাক, সেফ-থ্রি গ্রুপের ওষুধের সংকট তীব্র।

নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. আব্দুর রাজ্জাক খান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঈদের আগ থেকে সাপোজিটরি, প্যারসিটামল গ্রুপের সিরাপ সংকট আছে। সবকিছু বিবেচনায় আমরা আমাদের নিজস্ব ফার্মেসিতে এসব ওষুধ স্টক করেছিলাম। ঈদের দুই দিন পর থেকে কিছু কিছু ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ ঈদের আগে আবহাওয়া অতিরিক্ত উত্তাপ ছড়ানোয় এর প্রভাব শিশুদের ওপর বেশি পড়েছে। এতে তারা জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যাটা ধারণাতীত। আশা করছি দুই-এক দিনের মধ্যে কোম্পানগুলো বাজারের চাহিদামতো ওষুধ সাপ্লাই দিয়ে পরিস্থিসাতি স্বাভাবিক করবে।’

চট্টগ্রামের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক হোসাইন মোহাম্মদ ইমরান জানান, ‘সংকটের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। আমরা খতিয়ে দেখছি। যদি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কারসাজি হয় তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আর যদি কোম্পানির বিষয় হয় আমি ওষুধ প্রশাসনের মহাব্যবস্থাপক বরাবর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাবো।’

তিনি জানান, অতিপ্রয়োজনীয় ১১৭টি ওষুধের দাম সরকার নির্ধারণ করে দেয়। এসব ওষুধ বেশি দামে বিক্রির কোন সুযোগ নেই এবং এগুলো বাজারে পর্যাপ্ত রাখতে হবে। অন্যথায় ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতে সরকার যেকোন সময় যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে।

হাজারীগলির ওষুধ ব্যবসায়ী মনসুর আহমেদ জানান, কোম্পানির লোকজন বলছে সাপোজিটরি উৎপাদনের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই কোম্পানি পোষাতে পারছে না। সামনে বাজেট অধিবেশন। এই সংকট তৈরি হয়তো বাজেটে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধিতে সরকারকে চাপে রাখার কৌশলও হতে পারে।

Loading...
আরও পড়ুন