মেশিনের চাকা ঘুরলেও ঘুরছে না ভাগ্যের চাকা

0

প্রচণ্ড গরম। গর গর শব্দে ঘুরছে সেলাই মেশিনের চাকা। রাত তখন দুইটা বেজে ২০ মিনিট। এমন গরমে শরীরের পোশাক খুলে সুঁই-সুতোর কাজ করছিল পাঁচজন কিশোর। মাথার উপরে সিলিং ফ্যান ঘুরলেও ভাপসা গরমে তাদের শরীর থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছিল ঘাম। যে বয়সে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে তারা জীবিকার তাগিদে সুঁই-সুতোর কাজ করছে। চারজন সুঁই-সুতোর কাজে ব্যস্ত থাকলেও রাত জেগে মনোযোগ দিয়ে কাপড় ভাঁজ করছিল মোহাম্মদ মিরাজ উদ্দিন (১১)। কথা বলার জন্য মিরাজের কাছে গেলে দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলল, পড়া-লেখা করার খুবই ইচ্ছা ছিল। বাড়িতে টাকা-পয়সা না থাকায় আব্বু-আম্মু আমাকে কাকার সাথে নোয়াখালী থেকে এখানে পাঠিয়ে দেয়। দুই বছর ধরে এখানে এসে কাপড় গোছানো, বোতাম লাগানোর কাজ করছি। ওদের মতো (যারা মেশিনে কাজ করে) বেতন পাইনা। শুধু ঈদ আসলে মালিকের কাছ থেকে ৩-৪ হাজার টাকা বখশিস পাই। এগুলো দিয়ে মা-বাবার জন্য কাপড় কিনব। জানিনা এবার বখশিশ কতো পাবো। ৫ হাজার টাকা পেলে তো বাড়ির জন্য কিছু নিতে পারতাম। কয়েকদিন পরে ঈদ, তাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। সারাদিন ৪-৫ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারি না।
মেশিনের চাকা ঘুরলেও ঘুরছে না ভাগ্যের চাকা 1

মিরাজের ঠিক ৩গজ দূরে মেশিনে কাজ করছিল সামশুদ্দীন (১৫) নামের আরেক কিশোর। ওকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলল ‘আমিও ৩ বছর আগে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে গ্রামের এক চাচার সাথে এখানে আসছিলাম। এখানে এসে প্রথমে বোতাম লাগনোর কাজ করতাম। ১ বছর পরে মালিক আমাকে দর্জির কাজ শিখিয়ে দেন। এরপর থেকে আমি প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা বেতন পাই। এগুলো দিয়ে আমার কিছু হয় না। এ মাসে আব্বুর চিকিৎসার জন্য বেতনের টাকা পাঠিয়ে দিছি। আর দুইএক দিন পর কিছু বখশিস পেলে বাড়ি যেতে পারবো। মালিক বললো এ বছর বিক্রি কম। জানি না ঈদে অসুস্থ আব্বুকে দেখতে পারবো কিনা।’

পাশের দোকানে ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীরে শুয়ে আছে সাইফুল ইসলাম (১৪) নামের আরেক কিশোর। তাকে ছবি তুলতে চাইলে বলল- ‘ভাইয়া আমি মাত্র এক মাস আগে কাজ শিখতে কাকার সাথে এখানে এসেছি। আমাকে ছবি তুলিয়েন না। আমি এখানে থাকবো না। এখানে সারারাত কাজ করতে হয়। ঘুমাতে পারি না। জানি না কাকা কেনো আমাকে এ কাজে নিয়ে আসলো। আমি বাড়ি গিয়ে পড়ালেখা করবো।

বৃহস্পতিবার (৩০ মে) চট্টগ্রামের দর্জি পাড়া খ্যাত খলিফা পট্টিতে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র। শুধু মিরাজ, সাইফুল ও সামশুদ্দীন নয়। এ দর্জি পাড়ায় এদের মতো কাজ করছে আরও ৭০০ জনের অধিক কিশোর। তারা ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করলেও তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।

১৯৪৭ সালে দিকে আইয়ুব আলী সওদাগর নামের এক দর্জিসহ কয়েকজন কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। পরে ওই এলাকার নামই হয়ে ওঠে খলিফাপট্টি। ঈদ এলেই দিনরাত কাজ চলে এ পট্টিতে। এখানকার পোশাক ঠাই পাচ্ছে চট্টগ্রামসহ দেশের নামীদামী বিপণিবিতানে। বর্তমানে এখানে রয়েছে ৩০০ কারখানা। ঈদের আগে ক্রেতাদের হাতে তৈরি পোশাক তুলে দিতে রাত-দিন কাজ করছেন এখানকার প্রায় ৫ হাজার দর্জি।

খলিফাপট্টি বণিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সামশুল আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, খলিফাপট্টির অবস্থা এখন আগের মতো নেই। দেশে কলকাতা, ইন্ডিয়া, মোম্বাইয়ের কাপড় আসার কারণে আমাদের ব্যবসা অনেক কমে গেছে। এছাড়া অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের কাছে আগের মতো পাইকার আসে না। অনেকে বাপ-দাদার পেশা হিসেবে এ পেশা নিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যে আছেন। কেউ কেউ স্বর্ণের দোকান থেকে ঋণ নিয়ে এগুলো পরিশোধ করতে পারছেন না। একটি কাপড় তৈরি করতে ৬০০ টাকা খরচ করে সেটি বিক্রি করতে হচ্ছে ৪০০ টাকায়। ৪-৫ বছর ধরে আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিমাসে এখানে ৪০-৫০ কোটি টাকার ব্যবসা হলেও এখন সেটি ৮-১০ কোটিতে নেমে এসেছে। আর আমাদেরকে কোনো সরকারই লোন সুবিধা দিচ্ছে না। সরকার যদি আমাদের লোনের ব্যবস্থা করে দেন তাহলে আমাদের ব্যবসা আগের অবস্থাই ফিরে আসবে।

এএইচ

Loading...
আরও পড়ুন