রাষ্ট্রপতি হাসিয়ে জমিয়ে দিলেন চুয়েটের সমাবর্তন উৎসব

0

শুরুতেই হাসালেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বক্তব্য দেবেন, মাইকের কাছে আসতেই প্রবল করতালি চুয়েটিয়ানদের। হেসে বললেন, রাষ্ট্রপতি-বুঝলামনা কেন এই করতালি। ভালোমন্দ কিছুই বললাম না তাই বুঝতে পারছিনা এর মানে কি? আর্থ সামাজিক উন্নয়নে প্রকৌশলীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, চুয়েটের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও গৌরবের ইতিহাস। এখানকার প্রকৌশলীরাও মেধা ও সৃজনশীলতায় এগিয়ে। এখানে ৪ জন স্বর্ণপদক পেয়েছেন। ভালো লাগলো । এখন সমাবর্তনের মৌসুম। আমি এর আগে আরো কয়েকটি সমাবর্তনে যোগ দিয়েছি। সেখানে দেখেছি স্বর্ণপদকপ্রাপ্তদের অধিকাংশই মেয়ে। আর এখানে দেখছি, উল্টো ঘটনা। স্বর্ণপদকপ্রাপ্তরা সবাই পুরুষ। শুনেছি, মেয়েরা স্বর্ণপদক পেলে অলংকার বানিয়ে নেয়। সে কারণেই বোধ হয় চুয়েটে স্বর্ণপদকপ্রাপ্তিতে মেয়েরা নেই।

রাষ্ট্রপতি তাঁর স্বভাবসূলভ ভঙ্গিমায় বলেন, ‘উপযুক্ত যোগ্যতা না থাকায় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারিনি। সেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। দেশে প্রায় অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেড়শোর মত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সবগুলোর আমি চ্যান্সেলর বললেন নিজের প্রতি কিছুটা অবজ্ঞার সুরে। বলেন, আমাকে সব সমাবর্তনে যেতে হয়। কিন্তু এত নতুন কথা কোথায় পাব? ঘুরে ফিরে একই কথার পুনরাবৃত্তি তাই।

কিছুটা আক্ষেপও ছিল তাঁর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কার নিয়ে। তিনি বলেন, তোমরা এখন প্রেম করো -মোবাইলেই সব। এসএমএস-এ কথা শেষ। একটা চিঠি পর্যন্ত লেখনা। বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। আমাদের প্রেম আর এই সময়কার প্রেম তাই এক নয়।

কোনো কোনো পণ্য মূল্যের উর্দ্ধগতি নিয়েও তিনি কথা বলেন। আড়তদার, মজুতদারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়লেন। বলেন, অবাক কান্ড। পৃথিবীতে আমাদের দেশই একমাত্র দেশ যেখানে ধানকাটার এই মৌসূমে ব্যাপক উৎপাদন অথচ কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পায়না। আর চালের আড়তদার ও পেঁয়াজের মজুদকারিরা অকারণে মূল্য বাড়ায়। পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দেয়, গুদামে পঁচায়। তবু দাম কমায়না। আমি বলি এদের ধোলাই দেয়া উচিত। হ্যাঁ ধোলাই মানে বলছি মগজ ধোলাই করতে। এক্ষেত্রে তোমরা যারা মেধাবী, দেশপ্রেমীক তোমাদেরকে এদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। বলতে হবে ‘আঁরা ন ডরাই’। মূল্য সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তিনি শিক্ষার্থীদের রুখে দাঁড়াবার আবেদন জানান।

এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি সাংসদ ফজলে করিমের নাম ধরে ডেকে বলেন, ‘ফজলে করিম হন্ডে, আঁত্তে গুরা কচু লাইবু, গুরা কচুত ফরমালিন নাই। আর বেয়াগ্গিনত ফরমালিন আছে।’

চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও সাহসিকতা প্রসঙ্গে তিনি লালদীঘিতে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা, এম এ হান্নানের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা উল্লেখ করে বলেন, চট্টগ্রাম মানে দৃঢ়তা ও সাহসিকতার প্রতীক। তিনি বলেন, ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যদিয়ে যে পরিকল্পিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলো তা মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সততা ও সাহসিকতায় দেশের হাল ধরলেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশের এ অগ্রযাত্রায় প্রকৌশলীদের পাশে চান তিনি।

লিখিত ভারী ভারী কথার ফাঁকে ফাঁকে তিনি রসিকতার ছলে এভাবে বললেন, নানা প্রসঙ্গ নিয়ে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে আমাদের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়। বন্ধ হয় মানুষের বাক, মতামত ও চিন্তার স্বাধীনতা। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে একটি তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানভিত্তিক সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে ‘রূপকল্প ২০২১’ ও ‘রূপকল্প ২০৪১’ ঘোষণা করেছেন। এ রূপকল্প বাস্তবায়নে আমাদের নিরলস প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এরই মধ্যে আমরা স্বল্প মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের রূপকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছি। আজকের শিক্ষিত তরুণরাই এ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনাময় দেশ। এদেশের রয়েছে বিপুল মানব সম্পদ, উর্বর কৃষিভূমি এবং সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ। জনবহুল এ দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত উপায়ে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। প্রকৌশলীগণ উন্নয়নের কারিগর। তাদের মেধা, মনন ও সৃজনশীল চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসে টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা। তাই প্রকৌশলীদের চিন্তা ও চেতনায় থাকবে দূরদৃষ্টির সুস্পষ্ট প্রতিফলন। আগামী ২০৫০ সালে বা ২১০০ সালে বাংলাদেশের উন্নয়ন কেমন হওয়া উচিত বা বাংলাদেশের অবস্থান কোন স্তরে পৌঁছাবে তা বিবেচনায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকেও যথাযথভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা আজ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদের আত্ম-মর্যাদা সমুন্নত রাখতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। আমি আশা করি, আজকের নবীন প্রকৌশলীরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উপলব্ধি করবে এবং তাদের সৃজনশীল চিন্তা ও লব্ধ জ্ঞানকে এ লক্ষ্যে কাজে লাগাবে।

সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি মাইলফলক; একইসাথে তা স্নাতকোত্তরদের জন্যও একটি স্মরণীয় দিন। জীবন চলার পথে তোমরা আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ সোপান অতিক্রম করলে। জীবনের আসল সংগ্রাম এখন থেকে শুরু হবে। আজকের এ সনদ প্রাপ্তি সেই সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার স্বীকৃতিপত্র। এ সনদের সম্মান তোমাদের রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, তোমাদের এ অর্জনে দেশের মানুষের অনেক অবদান রয়েছে। তোমরা তোমাদের সেবা, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম দিয়ে এ সনদের মান সমুজ্জ্বল রাখবে। কর্মক্ষেত্রে তোমরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাক না কেন; মাতৃভূমি এবং এ দেশের জনগণের কথা কখনো ভুলবে না। অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত করবে না। তোমাদেরকে এ পর্যায়ে আসতে দেশবাসী যে সহায়তা করেছে তোমরা তোমাদের মেধা, মনন ও কর্মের মাধ্যমে তা পরিশোধ করবে। আমি তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি। তোমরা বড় হও এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে অবদান রাখো।

এবারের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গত চার বছরের সর্বোচ্চ সিজিপিএধারী ৪ জনকে “বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক”প্রদান করা হয়।

তাঁরা হলেন- ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ই এম কে ইকবাল আহমেদ, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রুবাইয়া আবসার, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সঞ্চয় বড়ুয়া এবং ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাশেদুর রহমান।

এছাড়া সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ২ হাজার ১৪৮ জন গ্র্যাজুয়েট এবং ৮৩ জন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েটসহ মোট প্রায় ২ হাজার ২৩১ জন ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সমাবর্তন ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম।

এছাড়া ধন্যবাদ জ্ঞাপন বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. ফারুক-উজ-জামান চৌধুরী।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম।

এছাড়া বর্ণাঢ্য এ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন, চবি ভিসি ড. শিরীণ আখতার, ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. গৌতম বুদ্ধ দাশসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

এসএ

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন