উড়ন্ত ইংল্যান্ডের গলায় ‘লঙ্কা কাঁটা’

শ্রীলঙ্কার কাছে হারলো ইংল্যান্ড, আশা বাড়লো বাংলাদেশের

0

২১২, ৩৯৭, ২১৩*, ৩৮৬, ৩৩৪, ৩১১, ৩৫১, ৩৪১, ৩৫৯ ও ৩৭৩। ইংল্যান্ডের সর্বশেষ ১০ ইনিংসের চিত্র এটি। এর মধ্যে ৮টিই ইনিংসই ছিল তিনশ এর উপরে। তিনশ’র নিচে থাকা দুটি ইনিংসের মধ্যে একটি এই বিশ্বকাপেরই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরে ব্যাট করতে নেমে টার্গেট কম হওয়ায় (২১৩ রান) তিনশ করার সুযোগ ছিল না। সেই ২১৩ রানও অতিক্রম করেছিল মাত্র ৩৩.১ ওভারে। আর অন্যটিও প্রায় একই সমান স্কোর, ২১২। ২১৩ আর ২১২ এই দুই ইনিংসের মধ্যে খালি চোখে পার্থক্য ১ রানের হলেও আসলে পার্থক্য বিশাল। সেটি এতো বড় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও নড়বড়ে হয়ে উঠার মতো। হবেই না কেন? দুর্দান্ত একটি দল নিয়ে দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনায় ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ শুরু করে ইংল্যান্ড। পাকিস্তানের বিপক্ষে যে ম্যাচে প্রথম হারের স্বাদ পায় সেটিতোও ছিল রাজকীয় হার। কিন্তু শুক্রবার (২১ জুন) হেডেংলিতে তাদের গলায় এভাবে ‘লঙ্কা কাঁটা’ বিধবে সেটি কারো কাছে কল্পনাও ছিল না।

শ্রীলঙ্কাকে ২৩২ রানে বেধে ফেলার পর সবাই অপেক্ষায় ছিল, কত দ্রুততার সঙ্গেই না জিতে যায় ইংল্যান্ড! তাদের যে ব্যাটিং শক্তি আর যেভাবে সবাই ফর্মে রয়েছে, তাতে ২৩২ রান তো ইংলিশদের সামনে একেবারে মামুলি ব্যাপার!

কিন্তু এই ২৩২ রানই করতে পারলো না ইংল্যান্ড। শুরুতে লঙ্কান পেসার লাসিথ মালিঙ্গা, এরপর স্পিনার ধনঞ্জয়া ডি সিলভার ঘূর্ণি তোপে পড়ে স্রোতের মাঝে খেই হারিয়ে ফেলা নৌকার মত ডিগবাজি খেতে খেতে নিজেদের হারিয়ে ফেলে ইংলিশরা। যার ফলে তারা অলআউট হয়ে গেলো মাত্র ২১২ রানে। ফলে টপ ফেবারিট ইংল্যান্ডকে ২০ রানে হারিয়ে দিলো দারুণ উজ্জীবিত শ্রীলঙ্কা।

উড়ন্ত ইংল্যান্ডের গলায় ‘লঙ্কা কাঁটা’ 1
পুরো ম্যাচে উইকেট শূন্য থেকেও নিজের শেষ বলে ইংল্যান্ডের উড্সকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করে শ্রীলঙ্কাকে অবিস্মরণীয় এক জয় এনে দেন নোয়ান প্রদীপ।

২৩৩ রানের লক্ষ্য। দুর্দান্ত সব ব্যাটসম্যানে ভর্তি ইংল্যান্ড দল ৩০ ওভারেই সে লক্ষ্য পেরিয়ে যায় কি না, এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু বর্তমানে রানবন্যার ক্রিকেট নয়, ছোট লক্ষ্যের ওয়ানডে ম্যাচই যে সত্যিকারের উত্তেজনার জন্ম দেয় সেটা বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ম্যাচেই দেখা গিয়েছে। শুক্রবার শ্রীলঙ্কাও জানিয়ে দিয়েছে, আড়াই শ রানের নিচের সংগ্রহ নিয়েও লড়াই করা যায়। ইংল্যান্ডকে ২০ রান হারিয়ে দিয়েছে শ্রীলঙ্কা।

শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যাওয়ায় ৬ ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের পয়েন্ট এখন ৮। দলটির শেষ তিন ম্যাচ অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। পয়েন্ট তালিকার প্রথম চারের বাকি তিন দল বলে এমনিতেই এদের বিপক্ষে সতর্ক থাকতে হতো ইংল্যান্ডকে। কিন্তু ইংল্যান্ডের দুশ্চিন্তা বাড়াবে ইতিহাস। সেই কবে ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছে। এরপর কোনো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালও খেলেনি তারা। ১৯৯২ এর বিশ্বকাপের পর তারা কখনো নিউজিল্যান্ড, ভারত কিংবা অস্ট্রেলিয়াকেও হারায়নি। এবার সেমি ফাইনালে যেতে হলে এ তিন দলের বিপক্ষে সে ইতিহাস বদলাতে হবে।

পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষ চারের পরেই ৬ পয়েন্ট নিয়ে আছে শ্রীলঙ্কা। এরপরই বাংলাদেশ আছে ৫ পয়েন্ট নিয়ে। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ এখন অনেকটাই এশিয়া কাপে রূপ নিয়েছে। আফগানিস্তান, ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনটি জয় বাংলাদেশকে ১১ পয়েন্ট এনে দেবে। কাজটা কঠিন কিন্তু সেমিফাইনাল খেলতে চাইলে কঠিন কাজ যে করতেই হয়। ওদিকে শ্রীলঙ্কার শেষ তিন ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ভারতের বিপক্ষে। শ্রীলঙ্কার সেমিফাইনাল খেলার সম্ভাবনাও কিন্তু বেশ উজ্জ্বল।

উড়ন্ত ইংল্যান্ডের গলায় ‘লঙ্কা কাঁটা’ 2
লাসিথ মালিঙ্গা। একাই ধসিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ব্যাটিং লাইনআপ।

ম্যাচটা শ্রীলঙ্কাকে জিতিয়েছেন লাসিথ মালিঙ্গা। ইংল্যান্ডের টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারকে শেষ করে দিয়েছেন এই পেসারই। কিন্তু ম্যাচটাকে এভাবে শ্রীলঙ্কার পকেটে এনে দিয়েছেন ধনঞ্জয়া ডি সিলভা। ৮ রানের মধ্যে মঈন আলী, ওকস ও আদিল রশিদকে ফিরিয়ে দিয়ে ইংল্যান্ডকে হারের মুখে ঠেলে দিয়েছেন এই স্পিনার। ৫ উইকেটে ১৭০ থেকে মুহূর্তেই ৮ উইকেটে ১৭৮ হয়ে গেছে ইংল্যান্ড। ৮ রান পরেই উদানার ফাঁদে পা দিয়ে ফিরে গেছেন আর্চারও।

১ উইকেটে ৪৭ রান করতে হতো ইংল্যান্ডকে। এমন অবস্থায় বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেটের সেরা উদাহরণ দেখালেন বেন স্টোকস ও শ্রীলঙ্কা দল। মালিঙ্গাকে ৪৫তম ওভারে এনে শেষ উইকেট ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন দিমুথ করুনারত্নে। প্রথম চার বল কাটিয়ে দেওয়ার পর রান রেট বেড়ে যাওয়ার চাপ সামলাতে স্টোকসকে পঞ্চম বলে রান নিতেই হতো। স্টোকস সে চাপে ক্যাচও তুলে দিয়েছিলেন ডিপ স্কয়ার লেগে। একটুর জন্য হাত ফসকে যাওয়ায় সে যাত্রা বেঁচে যান স্টোকস। শেষ বলে এক রান নিয়ে প্রান্ত বদল করে স্ট্রাইক ধরে রাখেন স্টোকস।

উড়ন্ত ইংল্যান্ডের গলায় ‘লঙ্কা কাঁটা’ 3
‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিলেন বেন স্টোকস।

উদানার পরের ওভারেই পর পর দুই বলে দুই ছক্কা মেরে চাপ কমালেন স্টোকস। চতুর্থ বলে আলতো হাতে ঠেলে দিয়ে দুই রান নিলেন। পঞ্চম বলে এক রান নিয়ে মার্ক উডকে এক বল খেলতে দিলেন। সেটা ঠেকাতেই পুরো মাঠ জুড়ে দর্শকের সে কি উল্লাস। পরের ওভারেও বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেট। পর পর দুই চারের পর পঞ্চম বলে সিঙ্গেল নিলেন স্টোকস। ১৯ বলে ২১ রান দরকার। উড সে বলটা পার করে দিলেই পরের ওভারে নতুন করে হিসাব কষবেন স্টোকস। কিন্তু সে বলে দুজন স্লিপ নিয়ে এলেন করুনারত্নে। আরও কিছু ফিল্ডার কাছে নিয়ে এলেন। আস পাশে এমন ফিল্ডিং সেট আপ দেওয়ার চাপেই হোক কিংবা দুর্ভাগ্যেই হোক, প্রদীপের বলটি উইকেট পেরিয়ে যাওয়ার আগে ঠিকই উডের ব্যাট ছুঁয়ে আশ্রয় নিল কুশল পেরেরার গ্লাভসে। ৩ ওভার আগেই ২০ রানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল শ্রীলঙ্কা। ৮৯ বলে ৮২ রানে অপরাজিত স্টোকস স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর
শ্রীলঙ্কা: ৫০ ওভারে ২৩২/৯ (করুনারত্নে ১, কুসল পেরেরা ২, ফার্নান্দো ৪৯, কুসল মেন্ডিস ৪৬, ম্যাথুজ ৮৫*, জিবন মেন্ডিস ০, ডি সিলভা ২৯, থিসারা ২, উদানা ৬; ওকস ১/২২, আর্চার ৩/৫২, উড ৩/৪০, রশিদ ২/৪৫)
ইংল্যান্ড: ৪৭ ওভারে ২১২/১০ (ভিন্স ১৪, বেয়ারস্টো ০, রুট ৫৭, মরগান ২১, স্টোকস ৮২*, বাটলার ১০, মঈন ১৬, ওকস ২, রশিদ ১, আর্চার ৩, উড ০; মালিঙ্গা ৪/৪৩, প্রদিপ ১/৩৮, ডি সিলভা ৩/৩২, উদানা ২/৪১)
ফল: শ্রীলঙ্কা ২০ রানে জয়ী
ম্যাচসেরা: লাসিথ মালিঙ্গা

এর আগে ব্যাট করতে নেমে বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি শ্রীলঙ্কা। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ হাল না ধরলে এই ম্যাচেও ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারতো তারা। শেষ পর্যন্ত তার ব্যাটিংয়েই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সম্মানজনক স্কোর দাঁড় করায় লঙ্কানরা। মাত্র ৩ রানের মধ্যে সাজঘরে ফেরেন দুই ওপেনার দিমুথ করুনারত্নে ও কুসল পেরেরা। আভিশকা ফার্নান্দো সেই বিপর্যয়ে হাল ধরেন। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে নেমেই কথা বলে তার ব্যাট।তবে ৪৯ রানে এসে থেমে যান তিনি। মার্ক উডের বাউন্সার ঠিকঠাক সামাল দেওয়া হয়নি।

উড়ন্ত ইংল্যান্ডের গলায় ‘লঙ্কা কাঁটা’ 4
শ্রীলঙ্কাকে লড়াইয়ের পুঁজি এনে দেয় অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের অপরাজিত ৮৫ রান।

এরপর কুসল মেন্ডিস ও ম্যাথুজের ব্যাট লড়েছে শ্রীলঙ্কা। তাদের সেই দাপটে বাধা হয়ে দাঁড়ান লেগ স্পিনার আদিল রশিদ। কুসল মেন্ডিসকে ফিরিয়ে ভাঙেন ৭১ রানের জুটি। চটজলদি বিদায় নেন জিবন মেন্ডিস। ষষ্ঠ উইকেটে চেষ্টা করেছিলেন ম্যাথুজ ও ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা। কিন্তু দ্রুত রান তোলা হয়নি। ২৯ রানে ফেলেন সিলভা। আর শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ম্যাথুজ। ৮৪ বলে করেন ৮৫ রান। খেলেন ১১৫ বল। তিনটি করে উইকেট নেন মার্ক উড ও জোফরা আর্চার। দুটি উইকেট নেন লেগ স্পিনার আদিল রশিদ।

কিন্তু শেষ হাসি শ্রীলঙ্কারই। অল্প পুঁজি নিয়েও মালিঙ্গা আর ডি সিলভার বোলিংয়ে দুর্দান্ত এক জয় তুলে নিয়েছেন দ্বীপ দেশটি।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm