জবাদিহিতা-দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে প্রস্তাবিত বাজেট অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে

0

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ হাউসবিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এবং ইসলামী ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ড. মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেটটি অনেকগুলো বিষয়কে যথা- তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর প্রথম বাজেট, বিগত নির্বাচনী ইশতেহার, সপ্তম-পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনা শেষ বছর, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে রুপান্তর, উন্নয়নশীল দেশের পথে উত্তরণ, এসডিজি বাস্তবায়ন, রোহিঙ্গা ইস্যু, বদ্বীপ পরিকল্পনা ২০১০, রূপকল্প-২০৪১, বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী পরিকল্পনা, ডিজিটাল বাংলাদেশ, ডিজিটাল অর্থনীতি, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, সকল শ্রেণির- পেশার মানুষকে মনোযোগ ও গুরুত্ব, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী নীতি কৌশলসমূহকে সামনে রেখে এই বাজেট প্রণীত হয়েছে।

শষ্যবীমা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বিনিয়োগ প্রণোদনা, প্রবাসী আয় আকর্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা প্রয়াস বৃদ্ধি, ব্যাংক ও পুঁজি বাজারের সংস্কারের অঙ্গীকার, নতুন এমপিওভূক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো এ বাজেটকে কিছুটা নতুনত্ব দিয়েছে। এই বিশাল এবং উচ্চবিলাসী বাজেটের যদি আগামী ছয় মাসে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ সঠিক অর্থে ও মান সর্ম্মতভাবে বাস্তবায়িত হলে সামগ্রিম চাহিদা বৃদ্ধি, অবকাঠামো ঘাটতি হ্রাস এবং দারিদ্রবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বিধানমূলক ব্যয় ইত্যাদির মাধ্যমে প্রস্তাবিত বাজেট সার্বিক জন কল্যাণে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।
মোদ্দাকথা, প্রস্তাবিত বাজেটের সাফল্য অনেকাংশ নির্ভর করবে সারা বৎসরের আর্থিক কর্মকান্ডগুলো মাসিক কিংবা ত্রৈমাসিকের ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে গুণগত ও পরিমাণগত বৈশিষ্ট্যের আলোকে মানসম্মত বাজেট বাস্তবায়নের উপর। কেননা বিগত বৎসরসমূহে বাজেট অবাস্তবায়নের হার প্রায় ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৯ শতাংশ পৌঁছেছে।

এই বাজেটে সবচাইতে ভালো দিক হলো- চলতি বছরের বাজেটের তুলনায় ২০১৯-২০ বাজেটের মোট ব্যয়, মোট রাজস্ব এবং এনবিআর নিয়ন্ত্রিত কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ। জবাবদিহিতায় আন্তরিক হলে বাস্তবায়ণের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে এডিপি ও ঘাটতি অর্থায়নের বছর ওয়ারি প্রবৃদ্ধি ২০১৮-১৯ এর সংশোধিত বাজেটের তুলনায় যা নি¤েœর পর্যালোচনা থেকে স্পষ্ট হবে।

ড. সেলিম বলেন, বিগত দুই বছর এবং চলতি বৎসরে জিডিপি যথাক্রমে ৭.২৮, ৭.৮৬ এবং ৮.১৩ শতাংশ অর্জন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আলোকে ২০১৯-২০ অর্থ বৎসরে প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে। বাজেট ২০১৯-২০ এ মোট ব্যয় প্রাক্কলন হয়েছে ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকা। যেটি সংশোধিত ২০১৮-১৯ থেকে ৮০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা বা ১৮.২ শতাংশ বেশী।
উল্লেখ্য যে, ২০১৮-১৯ এর পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ০৭৮ কোটি টাকা যেটি ২০১৭-১৮ সংশোধিত বাজেট থেকে ২৫% বেশী। একইভাবে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩,৭৭,৮১০ কোটি টাকা যেটি সংশোধিত ২০১৮-১৯ অর্থসাল থেকে ৬১,১৯৭ কোটি টাকা বা ১৯.৩২ শতাংশ বেশী। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাক্কলন পূর্ববর্তী সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৭৯,৮২৬ কোটি টাকা বা ৩১ শতাংশ বেশী। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে কর রাজস্ব বিগত সংশোধিত বাজেট ২০১৮-১৯ এর ২,৮০,০০০ কোটি টাকা থেকে ৪৫,৬০০ কোটি টাকা বা ১৬.২৮ শতাংশ বৃদ্ধি করে ২০১৯-২০ এ প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩,২৫,৬০০ কোটি টাকা।
২০১৮-১৯ বাজেটে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব ২০১৭-১৮ সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৭১,২০১ কোটি টাকা বা ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করে প্রাক্কলিত করেছে। এডিপিও একইভাবে ৩৫,৭২১ কোটি টাকা বা ২১.৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি করে সংশোধিত বাজেট ২০১৮-১৯ এর ১,৬৭,০০০ কোটি টাকা থেকে ২০১৯-২০ এ ২,০২,৭২১ কোটি টাকায় স্থির করা হয়েছে। ২০১৭-১৮ এর সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এডিপি ২৪,৬১৯ কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করে ২০১৮-১৯ বাজেটে নির্ধারিত হয়েছিল। প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ১,৪৫,৩৮০ কোটি টাকা। যার মধ্যে ৬৮,০১৬ কোটি টাকা বা ৪৬.৭৮ শতাংশ বৈদেশিক উৎস এবং ৭৭,৩৬৩ কোটি টাকা বা ৫৩.২২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস হতে অর্থায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধিত ২০১৮-১৯ অর্থ বৎসরে বাজেট ঘাটতি ১,২৫,৯২৯ কোটি টাকায় নির্ধারিত করা হয়েছে। টাকা পরিমাণের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধির পরিমাণ ১৯,৪৫১ কোটি টাকা বা ১৫.৪৫ শতাংশ বেশী। বিগত ২০১৮-১৯ বাজেটে প্রস্তাবিত ব্যয়ের প্রবৃদ্ধির (২৫ শতাংশ) চেয়ে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধির (৩১ শতাংশ) অনেক বেশি ছিল। কিন্তু ২০১৯-২০ বাজেটে এটি প্রায় সমপর্যায় রয়েছে যেটি সংখ্যাত্মক বাজেটে সামঞ্জস্যতা নির্দেশ করে। ২০১৯-২০ বাজেট পর্যালোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, মোট ব্যয়, মোট রাজস্ব, এনবিআর নিয়ন্ত্রিত রাজস্বগুলো বিগত ২০১৮-১৯ এর সংশোধিত বাজেটের তুলনায় যথাক্রমে ১৮.২২, ১৯.৩২ এবং ১৬.২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে যেটি ২০১৮-১৯ বাজেটে পূর্ববর্তী সংশোধিত বাজেটের তুলনায় যথাক্রমে ২৫, ৩১ এবং ৩২ শতাংশ প্রাক্কলিত হয়েছিল। যার ফলে বলা যায়, ২০১৯-২০ বাজেট অন্যান্য আর্থিক বছরের বাজেটের তুলনায় বাস্তবায়ণের সম্ভাবনা উজ্জল। কেননা বিগত কয়েক বৎসরের বাজেট ও প্রকৃত অর্জন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রাক্কলিত রাজস্ব আহরণে এবং প্রস্তাবিত ঘাটতি অর্থায়নের ব্যর্থতার কারণে বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরসমূহের বাজেট এবং প্রকৃত ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মোট ব্যয়ে অব্যয়িত অংশ সর্বনিম্ন ২০১০-১১ বাজেটে ৩,৬৯২ কোটি টাকা বা বাজেটের তিন শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ২০১৬-১৭ বাজেটে যেটি ৭১,১০৬ কোটি টাকা বা বাজেটের ২০.৮৭ শতাংশ বাস্তবায়িত হয় নাই। একইভাবে মোট রাজস্ব এর অনাহারিত অংশ সর্বনিম্ন ২০১০-১১ বাজেটে ৩৩১ কোটি টাকা এবং যেটি ২০১৬-১৭ বাজেটে সর্বোচ্চ ৪১,৫৪২ কোটি টাকা বা বাজেটের ১৭.১১ শতাংশ রাজস্ব আহরণে সমর্থ হয় নাই। বিশ্লেষণে আরো দেখা যায় যে, অবাস্তবায়িত ঘাটতি অর্থায়ন সর্বনিম্ন ২০১০-১১ বাজেটে ৪,০২৩ কোটি টাকা যেটি ২০১৬-১৭ বাজেটে সর্বেচ্চ ২৯,৩৬৪ কোটি টাকা।
২০১৬-১৭ বাজেটের ২৯,৩৬৪ কোটি টাকা অবাস্তবায়িত অর্থায়নের মধ্যে ২৪,৭০২ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নে ব্যর্থ হয় এবং অবশিষ্ট ৪,৬৬২ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়ন সম্ভব হয়নি বিধায় বাজেট বাস্তবয়ণে সফল হয়নি। সুতরাং রাজস্ব আহরণ এবং বৈদেশিক উৎস হতে প্রাক্কলিত অর্থ যথাসময়ে সংগ্রহিত না হলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এই জন্য রাজস্ব আহরণে এবং ঘাটতি অর্থায়নে বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নে সাফল্য দেখাতে না পারলে প্রস্তাবিত বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কলাকৌশলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা অতীতের যে কোন সময় থেকে বেশি নিতে হবে।

ড. সেলিম আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট জনকল্যাণ মূলক বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বিধানমূলক কর্মসূচী এবং কর সহনীয়করণসহ প্রবৃদ্ধি সঞ্চারী মেঘা প্রকল্পসমূহ এবং স্থবীর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নানা কলাকৌশল অগ্রাধিকার পেয়েছে। বড় আকারের বাজেটের স্বপক্ষে ড. সেলিম উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের অপার উন্নয়ন সম্ভাবনা, জনগণের প্রত্যাশা, ভোগ ও চাহিদার ক্রমোন্নতি, বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে বলা যায় যে, আকার রক্ষণশীল না হওয়াই ভালো। বড় আকারের বাজেটে অনেকে মনে করেন অর্থের অপচয় ও অপব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই আমি বলব অর্থ বরাদ্দে উদারতা থাকা ভালো এবং অনেক সময় সফলতা আসে তবে অর্থ ব্যবহারে যথেষ্ট সতর্ক থাকা এবং অর্থ অপব্যবহার বা অপচয় রোধকল্পে সচেতনতা-সহ কঠোরতা অবলম্বন করলে নির্বাচন বৎসরের এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে জুলাই/২০১৯ থেকে এর বাস্তবায়নে সকল পক্ষকে আগ্রহ সহকারে অংশগ্রহণ করতে হবে। বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাস্তবায়নে বাজেট বক্তৃতায় সুনির্দিষ্ট অনেকগুলো প্রস্তাবনা এসেছে। প্রস্তাবনাগুলো সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হলে এই বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবে প্রতিফলিত করা সম্ভব। মুদ্রাস্ফীতি ৫.৫ শতাংশে রাখা, মধ্যমেয়াদী নীতি কৌশল কঠোরভাবে পরিপালনসহ কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, রপ্তানিখাত, আবাসনখাত ও সেবা খাতকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নেওয়ার অঙ্গীকার। দারিদ্র নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট এবং আয় বৈষম্য নিয়ন্ত্রণের স্ববিশেষ উদ্যোগের কথা বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে সকল পেশার আপামর জনগণের স্বার্থে এবং সকল পেশার মানুষকে বিবেচনায় নিয়ে এই বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে। তাই মোট ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থ বৎসরের বাজেটে মোট ব্যয় ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকার মধ্যে সামাজিক অবকাঠামো খাতে ১,৪৩,৪২৯ কোটি টাকা (২৭.৪১ শতাংশ), ভৌত অবকাঠামোতে ১,৬৪,৬০৩ কোটি টাকা (২১.৪৬ শতাংশ), সাধারণ সেবা ১,২৩,৬৪১ (২৩.৬৩ শতাংশ) কোটি টাকা এবং সুদ পরিশোধ খাতে ৫৭,০৭০ কোটি টাকা (১০.৯১ শতাংশ) বরাদ্দ হয়েছে। প্রায় সকল খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ চলতি সংশোধিত বাজেটের তুলনায় কোনো প্রবৃদ্ধি নেই।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেটি মানবসম্পদ উন্নয়নে ও গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে এমপিওভুক্তির দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবী পূরণ হবে। এছাড়া পরিবহন ও যোগাযোগ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ণসহ স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ-জ্বালানী, ইত্যাদি খাতগুলোকে বিগত কয়েক বৎসরের ন্যায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শিল্পের সংরক্ষণ এবং রপ্তানি খাতকে প্রণোদনা দেয়ার চেষ্টা ও রাজস্ব আদায়ে বিভিন্ন উদ্যোগসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিকগুলোকে বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিখাত ও সরকারি খাতে অব্যাহত বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে যেটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, পল্লী উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আর্থিক খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

২০১৯-২০ অর্থ বৎসরের বাজেটে আর্থ সামাজিক এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবসহ ব্যাংক ও পুজিবাজারে আর্থিক ব্যবস্থা সংস্কারের অঙ্গীকার এই বাজেটকে গতানুগতিক ধারা থেকে বের করে এনেছে।
নতুন প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে কৃষকদের জন্য শষ্য বীমা, উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে যুবক বেকারদের জন্য ১০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন, প্রবাসীদের জন্য ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ও বীমা সুবিধা, নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য তহবিল গঠন, সামাজিক সুরক্ষায় অতিরিক্ত জনগোষ্ঠীকে অন্তভু্ক্তকণ, নতুন এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষায় গতিশীলতা সৃষ্টির প্রয়াস, অটিস্টিক শিশুসহ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন নাগরিককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য প্রণোদনা,তৈরী, পোষাক রপ্তানীতে ১ শতাংশ হারে প্রণোদনা, গবেষণা উন্নয়ন খাতে অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৭৪,৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ, দারিদ্র বিমোচনে সুদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণসহ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা হাইটেক পার্কে বিনিয়োগে কর প্রণোদনা এবং ভৌত অবকাঠামো খাতে শিল্পায়নের জন্য ১০ বছর কর অবকাশ উল্লেখযোগ্য।

প্রাস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতা, অসঙ্গতি, প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ সমূহের প্রতি আলোকপাত করতে গিয়ে ড. সেলিম বলেন, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বর্তমান বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। সক্ষমতার অভাবে এডিপি বাস্তবায়ন পুরোপুরি না হওয়ায় সরকারী বিনিয়োগ কাঙ্খিত মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। আবার বছর বছর সরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের গুণগতমান বৃদ্ধি এবং অর্থ বৎসর শেষ তিন মাসে বা শেষ প্রান্তিক অত্যধিক ব্যয় প্রবণতার কারণে সরকারী অর্থের অপচয়, কাজে নিন্মমান ও গুণগতমান হ্রাস, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়।

অন্যদিকে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ গত কয়েক বছর ধরে ২১-২২-২৩ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধির জন্য এই হার জিডিপির ২৬-২৭ শতাংশে উন্নীত করা দরকার। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বিশেষ করে ব্যাক্তি খাতে বিনিয়োগ আগামী অর্থ বছরে উচ্চ সুদের হার, বিনিময় হার, চলমান তারল্য সংকট, খেলাপী ঋণ সংকট, মুদ্রাস্ফীতির হার, বর্হিখাতের অসামঞ্জস্যতা, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলসহ পণ্য মূল্য বৃদ্ধি প্রবণতা ইত্যাদি কারণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার সমূহ সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে অন্যান্য চ্যালেঞ্জ সমূহের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আহরণ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, সরকারী ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করা,ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা সমূহ, রপ্তানী বৈচিত্রকরণ, রপ্তানীর প্রবৃদ্ধির তুলনায় আমদানী প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক বৃদ্ধি, কাঙ্খিত মাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সঞ্চয় বিনিয়োগ তারতম্য ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এসব চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষিতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ব্যয়ধিক্য এবং বাস্তবায়ন সময়োর্ত্তীণের সঠিক ঝুঁকি নির্ণয়, মাসিক ভিত্তিতে প্রকল্প, রেজাল্ট ভিত্তিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা দরকার।

ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বৈদেশিক সূত্র থেকে ঝামেলামুক্ত ঋণ প্রবাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার, বিনিময় হার, মুদ্রাস্ফীতির হার,আস্থার উন্নতি,বিদ্যুৎ জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগ ইত্যাদি চলমান কার্যক্রমগুলোর সুষ্ঠভাবে সমাপ্তিসহ ইত্যাদি বিষয়ের উপর জোর নজরদারি,তদারকি এবং স্থিতিশীলতা অন্যতম নিয়ামক হিসাবে কাজ করবে।

এছাড়া বাজেটকে সঠিকভাবে বাস্তবায়নে সক্ষমতা, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের স্বচ্ছ রোডম্যাপ, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত পরিবর্তন ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে বাজেট বাস্তবায়নের অনেক চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা দূর হবে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টকরা, ব্যবসা ব্যয় হ্রাস, বৈশ্বিক প্রতিযোগীতামূলক অবস্থান, অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে এই বাজেটে সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যয়ের গুণগতমান, বাস্তবায়ন সময়, মোট প্রকল্প ব্যয় ইত্যাদির উপর অধিক গুরুত্বারোপ করে সঠিক ব্যয়ে সঠিক সময়ে এবং সঠিক গুণে ও মানে প্রকল্প কার্যসমাপ্তের জন্য সঠিক মানদন্ড নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এক দেশ বা অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত না করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠানসমূহকে সমসুযোগ প্রদান করলে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু ঝুঁকি হ্রাস করা যায়। চলমান বৃহৎ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের হার সময় সময় প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রচারের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

বাংলাদেশ দৈনিক কতটুকু বা কত কিলোমিটার রাস্তা সম এককে তৈরি হচ্ছে, দৈনিক কত কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে (সম এককে) ইত্যাদি প্রকাশ করার জন্য সুপারিশ করছি। সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামোর কারণে সুফলগুলো সুস্পষ্ট করা উচিত বলে মনে করি। এই বাজেটে প্রবৃদ্ধি সঞ্চয়ী বৃহৎ ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোগত প্রকল্পসমূহ এবং স্থবির বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নানা কলাকৌশল অগ্রাধিকার পেয়েছে।

কর ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা, ১০ শতাংশ কর পরিশোধে বিনিয়োগ, ১৬ এফ ধারার অধীনে স্টক ডিভিডেন্টের উপর ১৫ শতাংশ কর ধার্য ইত্যাদি বিষয়গুলো পুনরায় বিবেচনায় নিতে হবে। স্টক ডিভেডেন্টের এবং অবণ্টিত মুনাফা ও রিজার্ভের উপর কর ধার্য বিশেষ করে ব্যাসেল ৩ অনুসারে ব্যাংকের মুলধন উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ভ্যাট আইন ২০১২ প্রবর্তণে যদিও বলা হচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থ বছর থেকে দোকান এবং ব্যবসা প্রতিষ্টানে Electronic Fiscal Device(EFD) এবং Sales Data Controller (SDC) স্থাপনের উদ্দেশ্যে আমাদানি পর্যায়ে আছে। কিন্তু বিগত ৩/৪ বছরে এই Device গুলো সরবরাহ করতে এনবিআর ব্যার্থ হয়েছে যেগুলো রাজস্ব আদায়ে দূর্নীতি অনেকাংশে কমাতে সাহয্য করবে। এব্যপারে কঠোর না হলে VAT Act ২০১২ বাস্তবায়ণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন