চট্টগ্রাম মানেই জেমসের কাছে ভালবাসার শহর, হাজার স্মৃতি আজিজ বোর্ডিংয়ে

শনিবার (২ অক্টোবর) ৫৮ বছরে পা রাখলেন দেশের কালজয়ী রকস্টার ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। প্রখ্যাত এই সঙ্গীত তারকার জীবনে চট্টগ্রাম সবসময়ই অন্যরকম এক অনুভূতির নাম।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। গানের টানে, প্রাণের টানে জেমস তখন চট্টগ্রামে। ঠাঁই হল তার চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ পাঠানটুলীর আজিজ বোর্ডিংয়ে। জেমস নিজেই বলেছেন— ‘গান বাঁধি, গান করি আর স্বপ্ন দেখি।’ সেই স্মৃতিময় আজিজ বোর্ডিং স্মরণে জেমস গেয়েছিলেন একটি গান। গানটি লিখেছিলেনও তিনি নিজেই। সেই আজিজ বোর্ডিং নিয়ে এখনও স্মৃতিকাতর হন জেমস। তার ভাষায় ‘গানের টানে, প্রাণের টানেই ঠাঁই হয়েছিল সেখানে। গান, আড্ডা আর যা-ই হোক না কেন সব ওখানেই। আজিজ বোর্ডিংয়ের দিনগুলো কখনও ভুলব না।’

‘প্রিয় আজিজ বোর্ডিং, প্রিয় আজিজ বোর্ডিং
প্রিয় আজিজ বোর্ডিং, প্রিয় আজিজ বোর্ডিং
ছোট্ট একটি খাট, ছোট্ট একটি খাট,
ছোট্ট একটি টেবিল, একটি পানির জগ
ছিল এক চিলতে আকাশ আমার,
আর সেই প্রিয় গিটার…’

সেই জেমসের জন্মদিন আজ শুক্রবার (২ অক্টোবর)। নগর বাউল খ্যাত মাহফুজ আনাম জেমস পা রাখলেন ৫৭ বছরে। ১৯৬৪ সালের এই দিনে নওগাঁ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামেই।

বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। বাবার চাকরির সুবাদে চলে এলেন চট্টগ্রামে। বাবা মোজাম্মেল হক তখন কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা। ছেলেকে নিয়ে অনেক আশা তার। ছেলে পড়াশোনা করবে, নাম করবে। কিন্তু ছেলের মন তখন অন্যদিকে। পড়ার বই ছেড়ে গান বাজনায় মজে থাকত সারাদিন। ছেলে গান বাজনা করবে— এটা ছিল পরিবারের ঘোর অপছন্দ। ফলাফল পরিবারের সাথে মনোমালিন্য। তার জের ধরে নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে।

চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে বেড়ে ওঠা জেমস গানেও লিখেছেন— ‘রুম নাম্বার ৩৬-এ ছিল আমার বসবাস’
চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে বেড়ে ওঠা জেমস গানেও লিখেছেন— ‘রুম নাম্বার ৩৬-এ ছিল আমার বসবাস’

শুরু করেন সংগ্রামী জীবনে টিকে থাকার লড়াই। ঠাঁই হয় চট্টগ্রামের পাঠানটুলীর আজিজ বোর্ডিংয়ের বারো বাই বারো ফুটের ছোট এক রুমে। সারাদিন বন্ধুদের সাথে ক্যাসেট প্লেয়ারে চলে একের পর এক গানের রেকর্ডিং। বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন গানের দল। আজিজ বোর্ডিংয়ের সামনের এক সস্তা হোটেলে সারতেন খাওয়াদাওয়া। আর রাতে চলে যেতেন আগ্রাবাদ হোটেলে। সারারাত বাজাতেন নাইট ক্লাবে। এভাবেই কেটে গেল বেশ কটি দিন। ততোদিনে পেয়েছেন কিছু নামডাক।

১৯৮০ সালের দিকে চট্টগ্রামে বসেই নিজের হাতে গড়লেন স্বপ্নের ব্যান্ড। নাম দিলেন ফিলিংস। ফিলিংসের প্রথম দিককার সদস্যরা ছিলেন ফান্টি (ড্রামস), স্বপন (বেস গিটার), প্যাবলো( ভোকাল ও পিয়ানো বাদক)। প্রথম দিকে জিম মরিসন, মার্ক নাফলার, এরিক ক্ল্যাপটনের গাওয়া বিখ্যাত গানগুলোর কাভার করতেন। বাংলা ভাষায় জেমসই প্রথম সাইকিডেলিক রক গানের সূচনা করেন।

চট্টগ্রামে সংগীত জীবন শুরু করলেও ভালো কিছু করার তাড়নায় একসময় ছাড়েন প্রিয় চট্টগ্রামকে। স্বপন ও পাবলো ফিলিংস থেকে বিদায় নেওয়ার পর একমাত্র ফান্টিকে নিয়ে জেমস ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে চলে আসেন ঢাকায়। নতুন ভাবে ফিলিংসের সাথে যুক্ত হন বেসবাদক আওরঙ্গজেব বাবু ও কীবোর্ড বাদক তানভীর। তাদেরকে নিয়ে শুরু হয় ফিলিংসের নতুন পথচলা। ফিলিংসের সাথে পরবর্তীতে যুক্ত হন অর্থহীন ব্যান্ডের বেসবাবা সুমন। নতুন ব্যান্ড, নতুন ধারার গান নিয়ে ১৯৮৭ সালে ফিলিংস বাজারে আনে তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। বাণিজ্যিকভাবে খুব একটা সফল না হলেও ওই অ্যালবামের গান ‘ঝরনা থেকে নদী’, ‘স্টেশন রোড’, ‘আমায় যেতে দাও’, ‘রূপ সাগরে ঝলক’ মানুষের মনে দাগ কেটে দেয়।

১৯৮৮ সালে ‘অনন্যা’ নামের অ্যালবাম প্রকাশ করে সুপারহিট হয়ে যান তিনি। এরপর ১৯৯০ সালে ‘জেল থেকে বলছি’, ১৯৯৬ সালে ‘নগর বাউল’, ১৯৯৮ সালে ‘লেইস ফিতা লেইস’ এবং ১৯৯৯ সালে ‘কালেকশন অফ ফিলিংস’ অ্যালবামগুলো ‘ফিলিংস’ থেকে বের করা হয়।

‘নগর বাউল’ ব্যান্ডের অ্যালবামগুলো হলো— ‘দুষ্টু ছেলের দল’ ও ‘বিজলি’। জেমসের একক অ্যালবামগুলো হলো- ‘অনন্যা’, ‘পালাবি কোথায়’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’, ‘ঠিক আছে বন্ধু’, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’, ‘তুফান’ ও ‘কাল যমুনা’।

চলচ্চিত্র প্লেব্যাকেও সফল হয়েছেন জেমস। ২০১৪ সালে ‘দেশা-দ্য লিডার’ ও ২০১৭ সালে ‘সত্ত্বা’ ছবির ‘তোর প্রেমেতে অন্ধ আমি’ গানের জন্য দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ের ৩৬ নম্বর কক্ষে জেমসের ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন এক ‘পাগল’ ভক্ত।
চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ের ৩৬ নম্বর কক্ষে জেমসের ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন এক ‘পাগল’ ভক্ত।

শুধু দেশ নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক জনপ্রিয় এই তারকা শিল্পী। বাংলা গানের পাশাপাশি ‘গ্যাংস্টার’ ছবির ‘ভিগি ভিগি’ গানটির মাধ্যমে বলিউডে যাত্রা শুরু হয় তার। এরপর ‘ও লামহে’ ছবিতে ‘চল চলে’ এবং ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ ছবির ‘আলবিদা’ ও ‘রিশ্তে’ শিরোনামের গানগুলো গেয়ে আলোচিত হয়েছেন তিনি।

জন্মদিনে দেশব্যাপী ভক্তদের নানা কর্মসূচি
ভক্তদের কাছে ‘গুরু’ হিসেবে পরিচিত জেমসের জন্মদিনে বরাবরের মতোই দেশব্যাপি নানা কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে ভক্তরা। বিভিন্ন জেলার দুষ্টু ছেলের দল এবার সারা দিনব্যাপী বিভিন্ন আয়োজন রেখেছে। এরমধ্যে ঢাকা, খুলনা, যশোর, নরসিংদী, রংপুর, মেহেরপুর, কুড়িগ্রাম, ভোলা পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জেমসের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ কামনায় মসজিদ/মাদ্রাসা সহ বিভিন্ন মিলনমেলায় দোয়ার আয়োজন রখেছে। কেক কেটে সুবিধাবঞ্চিতদের সাথে নিয়ে রেখেছে গান ও আড্ডার আয়োজন। দেশের বেশ কিছু জায়গায় বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে জেমস ভক্তদের গ্রুপ ‘দুষ্টু ছেলের দল’।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!