দক্ষিণ আফ্রিকায় পা রাখার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় এল মৃত্যুসংবাদ। এরপর আরও ১১ দিন অপেক্ষা। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টার দিকে কার্গো ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় ১৮ বছরের মো. ফাহাদের মরদেহ। প্রায় ৯ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে পাঠানো ছেলেকে সেদিন কফিনে বুঝে নেন বাবা নুর মোহাম্মদ। স্বপ্নের যাত্রা শেষ হয় শোকের মিছিলে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা ইউনিয়নের উত্তর জোয়ারা গ্রামের নগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ একটি বেসরকারি বিমা কোম্পানিতে কর্মরত। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে মেজ ছিলেন ফাহাদ। স্থানীয় কাঞ্চনাবাদ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দ্রুত আয় করে ভাগ্য বদলের আশাই তাকে বইখাতা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।
দালালচক্রের পথ, জঙ্গলের দুর্ভোগ
পরিবার সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা দুই মামার ব্যবসা ও আয় দেখে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা জোরালো হয় ফাহাদের। ছেলের ইচ্ছা পূরণে নুর মোহাম্মদ বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ৯ লাখ টাকা জোগাড় করেন। প্রথমে দুই লাখ, পরে ব্যাংকের মাধ্যমে আরও সাত লাখ টাকা পাঠানো হয়। পৌঁছানোর পর আরও দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল।
গত ৩০ জানুয়ারি ঢাকা থেকে বিমানে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে রওনা হয় ফাহাদ। কথা ছিল ইথিওপিয়া হয়ে জিম্বাবুয়ে, সেখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পৌঁছাবে। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, দালালচক্র তাকে ইথিওপিয়া থেকে দুর্গম জঙ্গলের পথে হাঁটিয়ে একাধিক দেশ ঘুরিয়ে সড়কপথে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেয়। দীর্ঘ পথযাত্রা, অনাহার, অসুস্থতা ও চিকিৎসার অভাবেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা পরিবারের।
যাওয়ার সময় তার ব্যাগে ছিল ২০০ ডলার ও কিছু শুকনা খাবার। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে ছিনতাইকারীরা সব কেড়ে নেয়। শুরু হয় চরম দুর্ভোগ।
ফোনকলের স্বস্তি, রাতেই শোক
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনা শহরে পৌঁছানোর খবর দেন ছোট মামা। এতে কিছুটা স্বস্তি ফেরে পরিবারে। কিন্তু সেদিন রাতেই আসে আরেকটি ফোনকল। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, ‘আপনার ছেলে ফাহাদ আর নেই। ইন্নালিল্লাহ পড়েন।’ পাসপোর্টে থাকা ঠিকানা দেখে এক অচেনা ব্যক্তি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে বিমানবন্দর থেকে মরদেহ গ্রহণ করে অ্যাম্বুল্যান্সে চট্টগ্রামের পথে রওনা দেন নুর মোহাম্মদ। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় পৌঁছায় গ্রামের বাড়িতে। সকাল ১০টায় উত্তর জোয়ারা নগরপাড়া শাহী জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ফাহাদকে।
বাবার কান্না, গ্রামে শোক
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুর মোহাম্মদ। তিনি বলেন, তিনি কখনো ছেলেকে অভাব দেখাননি, পড়ালেখা করতে বলতেন। কিন্তু ফাহাদ দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে চাইত। বাবা হয়ে তিনি না করতে পারেননি। এখন ছেলেকে হারিয়ে তিনি অসহায়।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর পর দালালচক্র টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়েছে। তবে ছেলে হারানোর পর সে আশ্বাসে তার আর ভরসা নেই। শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন, অন্তত নিজ হাতে কবর দিতে পেরেছেন—এই সান্ত্বনাই এখন তার ভরসা।
বৃহস্পতিবার সকালে মরদেহ গ্রামে পৌঁছানোর পর শোক নেমে আসে পুরো এলাকায়। সহপাঠী, প্রতিবেশী ও স্বজনেরা হতবাক। কয়েক দিন আগেও যে ছেলেটি ছিল প্রাণবন্ত, সে-ই ফিরল কফিনে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চন্দনাইশ-পটিয়া অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি দালালচক্র অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর নামে তরুণদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পরিবারগুলোকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।




