৬ দিনে ৮ হাজার কোটির ব্যবসা আটকে চট্টগ্রাম বন্দর সচল হচ্ছে শুক্রবার থেকে

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার প্রশ্নে শ্রমিক আন্দোলনের নামে টানা কর্মবিরতিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। রপ্তানি–আমদানি থেমে গিয়ে আটকে পড়ে হাজার হাজার কনটেইনার, ক্ষতির অঙ্ক গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায়। এমন অবস্থায় অর্থনীতিতে ধাক্কার মুখে পড়ে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুই দিনের জন্য লাগাতার কর্মবিরতি স্থগিত করেছে বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বন্দর ভবনে বৈঠকের পর এই ঘোষণা দেন পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর। তবে আশ্বাস অনুযায়ী ব্যবস্থা না হলে রোববার থেকে আবার কর্মবিরতির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। তবে নৌপরিবহন উপদেষ্টা জানান, শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল নাগাদ বন্দর পুরোপুরি সচল না হলে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে।

নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।

দুই দিনে আটকে পড়ল হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

এনসিটি দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনে কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা আসে। এর আগে শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করা হচ্ছিল। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীদের বদলির ব্যবস্থা নেওয়ায় বিএনপিপন্থী শ্রমিকরা আরও মারমুখী হয়ে ওঠে।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দর ছিল কার্যত অচল। এর আগের দিন বুধবারও আন্দোলনকারীদের বাধায় কোনো জাহাজ জেটি ছাড়তে পারেনি। ফলে রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বন্দর চত্বর, জেটিতে থাকা ১০টি জাহাজ ও বেসরকারি ডিপোতে আটকে পড়ে প্রায় ১৩ হাজার একক রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার। এসব কনটেইনারে থাকা পণ্যের আনুমানিক মূল্য ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ, কর্মসূচি স্থগিত

বন্দরের এই অচলাবস্থার মধ্যে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন। বন্দর ভবনের চার নম্বর গেটের বাইরে তিনি আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। পরে বিকেলে বন্দর ভবনে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকের পর সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন সাংবাদিকদের জানান, তারা চারটি দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে না দেওয়া, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের পদত্যাগ। তিনি বলেন, নিউমুরিং টার্মিনাল বিষয়ে উপদেষ্টা উচ্চপর্যায়ে কথা বলবেন এবং অন্যান্য দাবির বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। এ কারণে শনিবার পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। শনিবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত না এলে রোববার থেকে আবার কর্মসূচি শুরু হবে।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রামের যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার কামাল খান বলেন, শ্রমিক নেতাদের বদলির বিষয়টি উপদেষ্টা দেখবেন এবং এনসিটি ইজারা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে। আপাতত দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।

‘বন্দর বন্ধ করা অমানবিক’

বৈঠক শেষে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রোজার আগে বন্দর বন্ধ রেখে এমন আন্দোলন অমানবিক। বন্দর বন্ধ রাখার কারও কোনো এখতিয়ার নেই। বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যেতে পারে। তিনি জানান, শুক্রবার ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল নাগাদ বন্দর পুরোপুরি সচল না হলে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে।

এনসিটি চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চুক্তি হয়তো পুরোপুরি ঠেকানো যাবে না, তবে দেশের ক্ষতি করে কোনো চুক্তি হবে না। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নেগোসিয়েশন এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে রমজানের ঠিক আগে আন্দোলনের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এই কর্মসূচির পেছনে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

সকালে ঘেরাও, দুপুরে বৈঠক

লাগাতার কর্মবিরতির তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বন্দরের ফটকে আন্দোলনকারীদের মুখে পড়েন নৌপরিবহন উপদেষ্টা। বন্দরে বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার পথে তাকে ঘিরে স্লোগান দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের বাধায় তিনি গাড়ি থেকে নেমে কথা বলেন। ইব্রাহীম খোকন তখন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কর্মচারীদের হয়রানি করা হচ্ছে এবং বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণ চান তারা।

উপদেষ্টা আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, তিনি সবার সঙ্গে কথা বলবেন এবং বিষয়গুলো দেখবেন। পরে দুপুরে বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে আবারও তিনি বিক্ষোভের মুখে পড়েন।

তিন টার্মিনাল বন্ধ, সরবরাহ চাপে

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে কর্মসূচি শুরু হয়। মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতিতে বন্দরের তিনটি প্রধান টার্মিনাল জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে। পতেঙ্গার আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনাল থেকেও নির্ধারিত জাহাজ ভেড়ানো যায়নি।

ফলে রপ্তানি পণ্য সময়মতো পাঠানো যায়নি, আমদানি কাঁচামাল আটকে পড়ে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বন্দরের এই অচলাবস্থা কয়েক দিন চললে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।

ধীরে সচল হওয়ার কথা

সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই বন্দরের কার্যক্রম ধীরে ধীরে শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে শনিবার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান নেতারা।

৩১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে বন্দর অচল হয়ে পড়ায় সৃষ্ট সংকট কাটাতেই নৌপরিবহন উপদেষ্টা এই বৈঠক ডাকেন। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, শ্রমিক দাবির নামে দেশের প্রধান বাণিজ্যদ্বার অচল করে জাতীয় অর্থনীতিকে জিম্মি করা মেনে নেওয়া হবে না।

সিপি

ksrm