৬ ওমানপ্রবাসী চট্টগ্রামের রাশেদের খুনি

৪ বছর পর পিবিআইয়ের চার্জশিট

0

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার যুবলীগ সভাপতি রাশেদুল হককে খুন করেন ওমান প্রবাসী ছয় বাংলাদেশি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ৪ প্রত্যক্ষদর্শী প্রবাসীর জবানবন্দিসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন চট্টগ্রাম আদালতে। আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত।

চার্জশিটে ৩৬ লাখ টাকা এবং ওমানের বারকায় নবনির্মিত মার্কেটের অংশীদারিত্ব নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে বিদেশের মাটিতে খুন করা হয়েছে উল্লেখ করা হয়েছে। ওমানে খুন হওয়া রাশেদুল রাঙ্গুনিয়া উপজেলার শিলক ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ছিলেন।

চার্জশিটে অভিযুক্তরা হলেন ওমানের বারকার ব্যবসায়ী রাঙ্গুনিয়ার শিলক ইউনিয়নের মৃত ফজল আহমদ প্রকাশ বুইজ্জার ছেলে ছালে আহামদ প্রকাশ ছুলইয়া, একই এলাকার ওমান প্রবাসী জাগির হোসেন প্রকাশ জাকির হোসেন প্রকাশ জাগিরা, ইকবাল হোসেন, আনোয়ার হোসেন প্রকাশ ডানু, জাহিদুল ইসলাম প্রকাশ জাহিদ হোসেন প্রকাশ জাহেদ ও মো. এরশাদ। নিহত রাশেদুল ও আসামিরা সকলেই শিলক ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চট্টগ্রাম জেলার পিবিআই ইন্সপেক্টর আবু জাফর মো. ওমর ফারুক বলেন, ওমানের বারকা শহরে জাহিদের বাসায় ৬ আসামি পরিকল্পিতভাবে রাশেদুলকে খুন করেন। খুন হওয়ার পর রাশেদুলের রক্তাক্ত অবস্থায় থাকা ছবি, ভিডিও ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তার গলাকাটা এবং সেলাই করা ডিজিটাল প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বেশ কয়েকজন প্রবাসীর সাক্ষ্য এ মামলায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ময়নাতদন্তেও তাকে খুন করা হয়েছে বলে তথ্য উঠে আসে।

পিবিআইয়ের চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, রাশেদুল দেশে কাঠের ব্যবসা করতেন। তার টাকা-পয়সা ছিল। তাই তাকে ওমানে ব্যবসার প্রস্তাব দেন প্রবাসী ছালে। একপর্যায়ে ওমানে জায়গা লিজ নিয়ে মার্কেট নির্মাণে ২০১৩ সালে মামলার প্রধান আসামি ছালে আহামদ প্রকাশ ছুলইয়ার সঙ্গে পার্টনারশিপে ব্যবসাও শুরু করেন রাশেদুল হক। এরপর তিনি ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে ৩৬ লাখ টাকা ওমানে পাচার করেন। কিন্তু মার্কেট নির্মাণের পর কোন লভ্যাংশ না দেওয়ায় ছালের ওপর ক্ষুব্ধ হন রাশেদুল। একপর্যায়ে ২০১৫ সালে রাশেদুল বাংলাদেশ থেকে ওমানে যান লভ্যাংশ আদায়ে। কিন্তু ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর ওমানের বারকা এলাকার একটি ফ্ল্যাট বাসায় রাশেদুল খুন হন।

২০১৫ সালের ২৮ নভেম্বর ভিকটিম রাশেদুলের লাশ বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে দেশে আনা হয়। এর দুই দিন আগে ২৬ নভেম্বর রাশেদুলের ভাই আরিফ হোসেন বাদী হয়ে চট্টগ্রাম আদালতে একটি হত্যামামলা দায়ের করেন। আদালত শুনানি শেষে মামলাটি পিবিআইকে তদন্ত করতে নির্দেশ দেন। তদন্তে নেমে পিবিআই বেশ কয়েকজন ওমান প্রবাসী প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নেয়।

ওমানপ্রবাসী প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী মো. ইয়াছিন জানায়, ‘রাশেদুল বাংলাদেশ থেকে ওমানে গিয়ে আসামি জাহিদ হোসেনের বাসায় উঠে ও সেখানেই থাকতেন। টাকা নেওয়ার পরও মার্কেটের পার্টনার না করায় রাশেদুল ও প্রধান আসামি ছালে আহমদের মধ্যে ওমানে একাধিকবার প্রচন্ড ঝগড়া হয়। তারপরও পার্টনার না করায় ওমানের রয়েল পুলিশের কাছে আসামি ছালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে রাশেদুল। রয়েল পুলিশ ছালেকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে ছালে তার স্ত্রী গর্ভবতী ও অসুস্থ উল্লেখ করে মার্কেটে রাশেদকে পার্টনার করবে মর্মে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান। ছাড়া পাওয়ার ৪/৫ দিন পর খবর পাই রাশেদুল আসামি জাহিদের বাসায় মারা গেছেন। সাথে সাথে সেখানে গিয়ে দেখি একটি রুমের বাথরুমে গলাকাটা অবস্থায় রাশেদুলের লাশ পড়ে আছে। ফ্লোরে প্রচুর রক্ত পড়ে রয়েছে। আসামিরা আমাকে দেখে বলে রাশেদুল গুর্দা ফেটে মারা গেছেন। কেউ বলে আত্মহত্যা করেছে। পরে পুলিশ এসে তার লাশ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তার গলায় একাধিক সেলাই দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ওমান থেকে রাশেদুলের মরহেদের একটি ভিডিও তার ভাইয়ের কাছে বাংলাদেশে পাই আমি।’

সাক্ষী ইয়াছিন ছাড়াও এ মামলায় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী প্রবাসী নেজাম উদ্দিন, মো. শাহাদাত হোসেন সাজু ও গিয়াস উদ্দিন।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ওমানে ‘জালান বোয়ালি’ শহরে জায়গা বরাদ্দ নিয়ে রাশেদুলের টাকায় মার্কেট নির্মাণ করে আসামি ছালে আহামদ। দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে ছালের কাছে ৩৬ লাখ টাকা ওমানে পাঠান রাশেদুল। পার্টনারশিপে ব্যবসার কথা বলে মার্কেট নির্মাণ শেষ হওয়ার পর রাশেদুলের সঙ্গে ছালে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে রাশেদুল তার পরিচিত অন্য একজনের সাথে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ থেকে ওমানে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান মার্কেট নির্মাণের পর দুটি দোকান নিজের নামে রেখে ছালে বাকিগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু তাকে কোন টাকা দেননি। এ নিয়ে মূলত তাদের বিরোধ শুরু হয়।

ওমান প্রবাসী এ মামলার সাক্ষী শাহাদাত হোসেন সাজু জানান, দেশ থেকে ওমানে হুন্ডির মাধ্যমে রাশেদুল তার কাছে প্রথমে ২৪ লাখ টাকা পাঠায়, এরপর ৩ লাখ, তারপর ২ লাখ এভাবে মোট ৩৬ লাখ টাকা আমার মাধ্যমে ছালের কাছে পাঠায় রাশেদুল। এ টাকা না দেওয়ার জন্যই তারা রাশেদুলকে খুন করেছেন।

এ মামলার তদন্তভার হাতে পেয়ে পিবিআই টিম ওমানে গিয়ে তদন্ত করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকার পিবিআইকে ওমান যেতে ১০ লাখ ৭৯ হাজার ৬৫৫ টাকা বরাদ্দও করে। কিন্তু ওমানের রয়েল পুলিশ ও সরকার মামলাটি তদন্তে বাংলাদেশের পুলিশকে সে দেশে যেতে অনুমতি ও ভিসা না দেওয়ায় ওমান যেতে পারেনি পিবিআই।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন