৫ টাকার টিকিটে ৫ সেকেন্ডের অবাক চিকিৎসা!

চর্মরোগের আমেরিকান হাসপাতালের বেহাল দশা

0

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসী লোকজনদের অনেকে চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে আসলে একসময় চিকিৎসা নিতে ছুটে যেতেন চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার আমেরিকান হাসপাতালে। নগরী ও জেলার রোগীরাও চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য ছুটে আসেন এ হাসপাতালে। আমেরিকান হাসপাতাল নামে পরিচিত হলেও এর মূল নাম ‘কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র’।

১৯৫৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে। প্রাথমিকভাবে এ হাসপাতালে বন্দর সংশ্লিষ্টদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতালটি উন্মুক্ত করা হয়। শুরুতে বিদেশি চিকিৎসকরা সেবা দিত বিধায় এটি আমেরিকান হাসপাতাল নামে পরিচিতি পায়।

এই হাসপাতালের আউটডোরে চর্মরোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। মাত্র ৫ টাকার টিকিটের বিনিময়ে স্বাস্থ্যসেবা মিলে এখানে। তাছাড়া মজুত থাকা সাপেক্ষে ফ্রি ওষুধ ছাড়াও স্বল্পখরচে স্বাস্থ্যপরীক্ষার সুবিধা ও রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখেন ডাক্তাররা। ১টার আগে টিকেট দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকালবেলা গেই খোলার আগেই হাসপাতালের সামনে রোগীদের ভিড়। গেট খোলার সাথে সাথে সবাই হামলে পড়ে টিকিট কাউন্টারের দিকে। টিকিট নেয়ার জন্য কার আগে কে লাইনে দাঁড়াতে পারে, সে প্রতিযোগিতা চলে। নারী-পুরুষদের জন্য রয়েছে আলাদা লাইন। টিকিট দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন ২ জন কর্মচারী। টিকেট নেয়ার পর নারী-পুরুষ আলাদা আলাদা কক্ষে ডাক্তার দেখানোর জন্য অপেক্ষা করে। একসাথে ১০ জন রোগীর নাম ডাকা হয়। এই ১০ জনই ডাক্তারের কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এক একজন করে রোগী ঢুকে আর বের হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে প্রতিদিন ৫ থেকে সাড়ে ৫শ’ রোগী আসে। তবে রবিবারে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকে। হাসপাতালে রোগীর তুলনায় ডাক্তার কম। হাসপাতালে ডাক্তার আছেন মাত্র ৫ জন। তারা হলেন মেডিকেল অফিসার ডা. সামিরা জামাল, ডা. অজয় ঘোষ, ডা. সুরজিৎ দত্ত, ডা. দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী ও ডা. তাহমিনা নাজনীন। এর মধ্যে ৪জন চিকিৎসাসেবা দেন। হাসপাতালে মোট ২৩ জন স্টাফ থাকার স্থলে বর্তমানে আছেন ১ জন সিনিয়র স্টাফসহ ১৪জন। বাকি ৯টি পদ খালি রয়েছে ২-৩ বছর ধরে। তবে কয়েক মাসের মধ্যে ২ জনকে নিয়োগ দেয়ার সম্ভাবনা আছে। আছেন ১ জন সিনিয়র নার্স ও একজন জুনিয়র নার্স। একজন সহকারী নার্সের পদ খালি। সিনিয়র কনসালট্যান্ট এর পদটি ২ বছর ধরে খালি। তাছাড়া স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ৩টি মেশিন রয়েছে। সেগুলো হলো এসএসএফ, ইউরিনারি, সিবিসি। এসএসএফ করা হয় ৫০ টাকায়, ইউরিনারি পরীক্ষা ২০ টাকায়, সিবিসি ২০০ টাকায় ও রক্ত ১৫০ টাকায়।

ডাক্তারের কক্ষ থেকে বের হয়ে আসা ৫০ বছর বয়সী আল হাসান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ডাক্তারের রুমে ঢুকেছি আর বের হয়েছি। ঢুকে যে চেয়ারে বসবো, সে সময়টুকুও পেলাম না। সমস্যার কথা পুরোপুরি বলার আগেই ওষুধ লিখে দিয়েছে। ৫ সেকেন্ড সময়ও লাগেনি। এটা কোন ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা বুঝলা না।

তিনি আরোও বললেন, ২৫ বছর আগে এই হাসপাতালে এসেছিলাম চিকিৎসা নিতে। তখন চিকিৎসাসেবা অনেক বেশি উন্নত ছিল। আর বর্তমানে নামে চিকিৎসাসেবা চলছে।

আনোয়ারা থেকে আসা ফারজানা আক্তার ক্ষোভের সাথে বললেন, সবার মুখে এই হাসপাতালের সুনাম শুনেছি। যাকেই জিজ্ঞেস করি সে-ই বলে চিকিৎসা ব্যবস্থা নাকি অনেক ভালো। তাই এত দূর থেকে সকাল সকাল কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিয়ে ডাক্তার দেখালাম। কিন্তু লাভ কি হলো! আসল সমস্যার কথাই খুলে বলতে পারলাম না। ঢোকার সাথে সাথেই ওষুধ লিখে দিলো। কি আর করা! এর আগেও দুইবার এসেছিলাম। তখনও ঠিক এমনটাই দেখেছি।

American-Hospital

তিনি আরো জানালেন, প্রথমবার যখন এসেছিলাম ডাক্তাররা অনেক বাজে ব্যবহার করেছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগী দেখা বন্ধ করে দেয়।

পটিয়া থেকে আসা আসিফুর রহমান অভিযোগ করেন, শুনেছি এখানে নাকি ওষুধ ফ্রি দেয়া হয়। কিন্তু এখন বলছে ওষুধ নাকি বাইরে থেকে কিনতে হবে। পরীক্ষাগুলোও বাইরে থেকে করতে হবে। আসলে শোনা কথায় কান দিতে নেই। এত দূর থেকে এসে কোনো লাভ হলো না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী বলেন, হাসপাতালে সুবিধার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি। এজন্য সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট নন রোগীরা। অন্যদিকে অতিরিক্ত রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। কারণ প্রতিদিন ৫০০ জন রোগী হিসেব করলে দেখা যায় ১ জন চিকিৎসক প্রতিদিন ১২৫ জন রোগী দেখছেন। যা একজন ডাক্তারের জন্য অধিক চাপ।

তিনি আরো জানালেন, যদি আরো কয়েকজন ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া যেতো তাহলে এই সমস্যাটা হতো না। তাছাড়া আমাদের সিনিয়র কনসালট্যান্ট নেই। এই পদটি ২ বছর ধরে খালি পড়ে আছে। আমাদের হাসপাতালের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। হাসপাতালে নানা ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম থাকে।

ওষুধ সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোগীর তুলনায় আমাদের বাজেটটা অনেক কম। বিগত অর্থবছরে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১০ লাখ ২২ হাজার টাকা। আর এ বছরের বাজেটে বরাদ্দ হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। প্রতি ৪ মাস পরপর ওষুধ বরাদ্দ রাখি। তা দিয়েও হয় না। এজন্য যে রোগীদের অবস্থা বেশি খরাপ তাদেরকেই ওষুধ দেয়া হয়। যাদের সাধারণ সমস্যা তাদের বাইর থেকে কিনতে বলা হয়।

তাছাড়া স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নানা ধরনের যন্ত্রপাতি দরকার, যা আমাদের হাসপাতালে নেই। শুধুমাত্র ৩ ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার মেশিন রয়েছে এখানে।

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র কনসাল্যোন্ট ডা. সামিরা জামাল চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ১৯৫৩ সালের অর্গানোগ্রাম ও অবকাঠামোতেই এখনো এখানে সেবা চলছে। ৫০০ রোগীকে মাত্র চারজন চিকিৎসক চিকিৎসা দেন। সেই অর্গানোগ্রাম তো আমরা পরিবর্তন করতে পারব না। আসলে আমাদের জনবলের অভাব, নৈশ প্রহরী নেই। ২ বছর ধরে সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদটিও খালি।

তিনি আরো বলেন, একজন ডাক্তারের পক্ষে এত বেশি রোগী দেখা সম্ভব না। তারপরও দেখতে হচ্ছে। কারণ আমরা তো রোগীদের ফেরত দিতে পারছি না। তাছাড়া রোগীরা এখানে আসে একদম শেষপর্যায়ে। তাছাড়া একজন রোগীকে সময় নিয়ে দেখতে গেলে ২০ জনের বেশিতো রোগী দেখা সম্ভব না। আমরা এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর বলেন, অন্যান্য জেলার তুলনায় চট্টগ্রামে চিকিৎসক সংকট তুলনামূলকভাবে কম। হাসপাতালটিতে আমি এ পর্যন্ত তিনবার গিয়েছি। জনবল সংকটের বিষয়ে অবগত আছি। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

তবে তিনি জানান, চট্টগ্রামে চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য এটি খুব ভালো। কম জনবল দিয়েও এখানে অনেক ভালো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সিআর

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন