৫০ কোটির ‘দেয়াল’ তুলে চট্টগ্রাম বন্দরে দুই কোম্পানির মাপে কাটা সেই টেন্ডার অবশেষে বাতিল

দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্যতার শর্ত, অন্যদের জন্য প্রতিযোগিতার দরজা প্রায় বন্ধ। ৫০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা, ১০৫ কোটি টাকার আর্থিক সক্ষমতা, নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা, সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকায় খালি কনটেইনার স্থানান্তরের পাঁচ বছরের কাজের দরপত্র ঘিরে তৈরি হয়েছিল তীব্র বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছিল, বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস ও ব্যবসায়ী তরফদার রুহুল আমীনের সাইফ পাওয়ারটেককে সুবিধা দিতেই শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে। সমালোচনা, আপত্তি আর বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত সেই দরপত্রই বাতিল করল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) দপ্তর থেকে জারি করা চিঠিতে দরপত্র বাতিলের বিষয়টি জানানো হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম দরপত্র বাতিলের বিষয়টি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে নিশ্চিত করে বলেন, ‘এটা বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি

বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি এলাকায় নিজস্ব ইক্যুইপমেন্ট বা এম্পটি হ্যান্ডলার এবং ট্রাক্টর-ট্রেইলার সরবরাহ করে খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওয়ান স্টেইজ টু এনভেলপ পদ্ধতিতে পাঁচ বছরের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের লক্ষ্যে আহ্বান করা দরপত্রটি অনিবার্য কারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে বাতিল করা হয়েছে। দরপত্রটির নম্বর ছিল DT/Ship/OTM/Tender/Empty Handling/2025 এবং প্রকাশের তারিখ ১৪ জুন ২০২৬।’

যে শর্তে শুরু হয় বিতর্ক

এর আগে গত ২৪ জুন ‘৫০ কোটির দেয়াল তুলে চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডার, দুই কোম্পানির মাপে কাটা শর্তে বাকি সবাই বাদ’ শিরোনামে চট্টগ্রাম প্রতিদিনে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জিসিবি এলাকায় খালি কনটেইনার এক ইয়ার্ড থেকে অন্য ইয়ার্ডে স্থানান্তরের কাজটি সাধারণ একটি সেবামূলক কার্যক্রম মনে হলেও শুধু এই কাজেই একটি প্রতিষ্ঠানের পকেটে বছরে ঢোকে ২০ কোটি টাকা। নতুন দরপত্রকে ঘিরে তখন বন্দর অঙ্গনে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়।

১৪ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছরের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র প্রকাশ করে। অচেনা একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ওই দরপত্রের শর্তে বলা হয়, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে গত ১০ বছরের মধ্যে দেশের কোনো সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে অন্তত ৫০ কোটি টাকার একই ধরনের কাজ সফলভাবে শেষ করার প্রমাণ দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার থাকতে হবে ন্যূনতম ১২ কোটি টাকা এবং সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে ১০৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশে কার্যত সচল সমুদ্রবন্দর দুটি, চট্টগ্রাম ও মোংলা। মোংলায় এই মাত্রার অভ্যন্তরীণ কনটেইনার স্থানান্তরের কাজ নিয়মিত হয় না। ফলে এই একটি শর্তেই অধিকাংশ অভিজ্ঞ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ও আইসিডি বা অফডক অপারেটর শুরুতেই প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। কার্যত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অবস্থানে থাকে বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস ও দীর্ঘদিন ধরে বন্দর-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিতর্কে আলোচিত ব্যবসায়ী তরফদার রুহুল আমীনের সাইফ পাওয়ারটেক।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ছিল, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বদলে এমন কিছু নজিরবিহীন যোগ্যতা ও আর্থিক শর্ত দিয়ে দরপত্র সাজানো হয়েছে, যাতে আগে নির্ধারিত দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।

শর্ত কিছুটা শিথিল, কৌশলে মূল শর্ত বহাল রাখার চেষ্টা

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে সদস্য (অর্থ)-এর সভাপতিত্বে একটি প্রি-বিড সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ওই সভায় আগের দরপত্রের কয়েকটি শর্ত শিথিল করা হয়। ১০ বছরের মধ্যে ৫০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত কমিয়ে বিগত ২৫ বছরের মধ্যে যেকোনো পাঁচ বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা হয়। সরঞ্জামের ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করা হয়। জামানত এক কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রি-বিড সভায় অন্যান্য শর্তে ছাড় দেওয়া হলেও ঠিকাদারের নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার মূল শর্তটি সংশোধন করেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।

সভাটির কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, দরপত্রে অংশ নেওয়া এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের প্রতিনিধি নিজস্ব সরঞ্জাম ব্যবহারের বিধান বহাল রাখার জোর দাবি জানান। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনার দোহাই দেওয়া হয়।

সাধারণ অপারেটরদের অভিযোগ ছিল, আর্থিক জামানত কিংবা অভিজ্ঞতার মেয়াদে কিছুটা ছাড় দেওয়া হলেও নিজস্ব সরঞ্জামের মাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল রাখায় কার্যত সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসকেই একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

তাঁদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছর ধরে বন্দর এলাকায় নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার দিয়ে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ করার সুযোগ ছিল না। ফলে এই শর্ত বহাল থাকার অর্থ দাঁড়ায়, বাকি অপারেটরদের বাদ দিয়ে আবারও ওই দুই প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া।

শেষ পর্যন্ত বাতিল

প্রি-বিড সভার পর দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ১০ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হলেও বিতর্ক ও আপত্তি থামেনি। বিতর্কিত শর্তগুলো বহাল থাকায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।

এরপর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে পুরো দরপত্রটিই বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের যে প্রক্রিয়া ১৪ জুন শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই বাতিল ঘোষণা করল বন্দর কর্তৃপক্ষ।

পিপিআর ভঙ্গের অভিযোগ

বার্থ অপারেটরদের অভিযোগ, দরপত্র দলিল ও প্রাক্কলন প্রণয়ন কমিটি সরকারি ক্রয় বিধিমালা বা পিপিআরের মূলনীতি ভঙ্গ করেছে। বিশেষ করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ সম্পর্কিত বিধি ৪ এবং যৌক্তিক যোগ্যতার মানদণ্ড সম্পর্কিত বিধি ৪৭ লঙ্ঘন করে শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা বাজারে মুক্ত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যত একচেটিয়া সুবিধা দেয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের গঠিত পাঁচ সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বন্দরের সদস্য (অর্থ) মাহবুব আলম তালুকদার। কমিটিতে চুয়েটের একজন অধ্যাপক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধিসহ অন্য কর্মকর্তারাও ছিলেন।

১৭ বছরের মামলা, ডিপিএমে কাজ

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে চার বছরের জন্য কাজটি পায় এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিএনপির বর্তমান সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।

২০১৭ সালে ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন টেন্ডার আহ্বান করা হলেও মামলা জটিলতায় তা আটকে যায়। বাধ্য হয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএমে আবারও এভারেস্টকে কাজ দেয়।

২০২০ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর ২০২৩ সালে নতুন দরপত্রে এভারেস্ট ও তরফদার রুহুল আমীনের সাইফ পাওয়ারটেক অংশ নেয়। ওই দরপত্রে সাইফ পাওয়ারটেক সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও পরবর্তী আইনি জটিলতায় সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

ফলে আবারও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আগের প্রতিষ্ঠান এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কাজ চালিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় বন্দর প্রতি বছর এভারেস্টকে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করছে। প্রতি ছয় মাসে পরিশোধ করা হচ্ছে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ফাঁকফোকর ‘রাখা হয়’, যাতে মামলা করে সহজেই পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করা সম্ভব হয়। আর প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত শাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ ধরে রাখে।

সিপি

ksrm