৪ বছরে চট্টগ্রামের জেলেপল্লীর ২ হাজার শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে

শিশুরা ঝুঁকছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, মাদক, চোরাকারবার ও কিশোর গ্যাংয়ে

১৩ বছর বয়সী সজল জলদাস। এই বয়সে তার ছুটে যাওয়ার কথা স্কুলে, বিকালে মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর কথা। কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে গেছে অন্য জগতে। সংসারের হাল ধরতে, ইলিশের জাল বুনতে বুনতে সেই ইলিশের জালেই আটকে গেছে তার ছেলেবেলা।

৪ বছরে চট্টগ্রামের জেলেপল্লীর ২ হাজার শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে 1

সজলের মতো এমন বহু শিশুর শৈশব হারিয়ে গেছে অভাব-অনটনের যাতাকলে। এসব শিশুদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকায় এখন তাদের সংসার চলছে। পড়ালেখা বাদ দিয়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা বাবা-দাদাদের পেশাতেই ফিরে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেডের আকমল আলী রোডের জেলেপল্লী গেলে প্রায় পরিবারেই দেখা মিলবে এমন চিত্র।

লেখাপড়া বন্ধ দুই হাজারেরও বেশি শিশুর

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলেপল্লীর শিশুসহ ইপিজেড থানা এলাকার অন্তত ১৪টি কিন্ডারগার্টেন, স্কুল ও মাদ্রাসায় গত চার বছরে দুই হাজারেরও বেশি শিশুর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে এলাকার একমাত্র সরকারি স্কুল ‘ইসমাইল সুকানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে পাশে একটি টিনশেড ঘরে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে ২০ শিক্ষার্থী।

করোনাকাল থেকে এ পর্যন্ত বিএইচ নলেজ ফেয়ার স্কুলের দুটি শাখা থেকে ঝরে গেছে ৪০০ শিক্ষার্থী, দক্ষিণ হালিশহর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৩০০ জন, খালপাড় পাবলিক স্কুল থেকে ২০০ জন, মমতা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১০০ জন, পকেট গেট সংলগ্ন সাউথ সিটি আবাসিক স্কুল থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী ঝরে গেছে।

এছাড়া দু’বছর আগে চালু হওয়া স্বপ্নীল মডেল একাডেমির ১২৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭০ জন ঝরে পড়েছে গত ছয় মাসে। অ্যাম্বিশন আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে করোনা থেকে এ পর্যন্ত ঝরেছে ৫০ জন।

একইসঙ্গে দারুসসুন্নাহ নেছারিয়া আবু বকর মাদ্রাসা থেকে ১৫০ জন, দারুস সুন্নাত রওশনিয়া মহিলা মাদ্রাসার ৬৫ জন, আল মুজতাবা মুনিরুল মোস্তফা দাখিল মাদ্রাসার ৯০ জন, জামিউল কুরআন হযরত ওসমান নূরানী মাদ্রাসার ৭০ জন, মোহাম্মাদিয়া মডেল মাদ্রাসার ৩৫ জন, আল মানার ইসলামিয়া নুরাণী মাদ্রাসায় ২০ জন শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে।

তবে স্থানীয় মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্রাইভেট মাদ্রাসা কল্যাণ ফাউন্ডেশন’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মাওলানা মো. নোমানের দাবি, করোনার পর থেকে এখন পর্যন্ত জেলেপল্লীর শিশুসহ আশপাশে প্রায় এক হাজার মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে।

ইপিজেড এলাকার বাইরে পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় ও পতেঙ্গা সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েও পড়ালেখা করে জেলেপাড়ার ছেলেমেয়েরা। দুটি স্কুল থেকে যথাক্রমে ৫০০ এবং ২০০ জন শিক্ষার্থী ঝরে গেছে।

স্বপ্নীল মডেল একাডেমি’র ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র সৌরভ জলদাসও থাকে জেলেপল্লীতে। সৌরভ বলে, আমাদের স্কুলে অনেক সমস্যা। স্কুল চলাকালীন সময়ে পানির পিপাসা লাগলে বাসায় কিংবা পাশের খাবার হোটেলে যেতে হয়। তারপর টয়লেট আসলেও আমরা বাসায় চলে যায়। গরমের মধ্যে আমাদের অনেক কষ্ট হয়, ফ্যান নেই। বাবা-মা স্কুলের পোশাক কিনে দিতে পারে না। আমার অনেক বন্ধু লেখাপড়া ছেড়ে এখন সাগরে মাছ ধরে। পরিবারে অভাব-অনটন। আমিও মনে হয় বেশি দিন পড়ালেখা করতে পারবো না।’

স্বপ্নীল মডেল একাডেমির প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি যখন এখানে আসি, তখন ১০ থেকে ১৪ বছরের শিশুরাও নিজেদের নাম লিখতে পারতো না। শিশুদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে এখানকার অভিভাবকরা উদাসীন। ঘর থেকে ডেকে এনে স্কুলের খাতায় নাম লিখিয়েছি শিক্ষার্থীদের। বিনাবেতনে লেখাপড়ার সুযোগ থাকার পরও গত ছয় মাসে এই স্কুলের ১২৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৭০ জনের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি শিশুরাও নিয়মিত স্কুলে আসে না। জেলেপল্লীতে বসবাস করা বেশিরভাগ মানুষই জেলে। তারা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না। কিশোর বয়সে শিশুরা পড়াশোনা ছেড়ে বড়দের সঙ্গে নৌকায় নদীতে মাছ ধরতে যায়। পরিবারের অজ্ঞতা ও অভাবের কারণে প্রতি বছর অনেক শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চলতি বছরের ২৭ মে দুপুরে ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে জেলেপল্লীর প্রায় শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়। যেখানে বাদ যায়নি স্বপ্নীল মডেল একাডেমি স্কুলও। এখন খোলা আকাশের নিচে শিশুদের পাঠদান চলছে। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড়ের পর আরও ১০ জন শিক্ষার্থী স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে।’

বিএইচ নলেজ ফেয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ‘করোনা থেকে এ পর্যন্ত আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ৪০০ শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। বর্তমানে স্কুলে জেলেপল্লীর শিশু রয়েছে ২০ জন। ওদের ঝরে পরার পেছনে সংসারের অভাব-অনটন দায়ী।’

মমতা স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষিকা শাহানা বেগম বলেন, ‘করোনার সময় আমাদের স্কুল থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। আউটার রিং রোড পারাপারে কোনো নিরাপত্তা না থাকায় জেলেপল্লীর ৯২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে এখন রয়েছে ৫৭ জন।’

আকমল আলী রোডের বাইরে হাইস্কুলগুলোর মধ্যে একটি দক্ষিণ হালিশহর উচ্চ বিদ্যালয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফজল করিম বলেন, ‘করোনাকালে আমাদের স্কুল থেকে প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। শুনেছি এর মধ্যে অনেক মেয়ের বিয়েও হয়ে গেছে। জেলেপাড়ার শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের আলাদা নজর রয়েছে। বিনা বেতন থেকে শুরু করে ওদের লেখাপড়ায় এগিয়ে নিতে আমরা খুব আন্তরিক। বর্তমানে জেলেপল্লীর ৬০ জন শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে।’

এ বিষয়ে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে ইপিজেড এলাকার আকমল আলী রোডের বেড়িবাঁধের বাইরের রিমোট এরিয়ায় কয়েক হাজার জেলে পরিবারের বসবাস। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জেলা প্রশাসক ও  সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আমরা তৎপর থাকি। এখানে শিশুদের লেখাপড়ার জন্য একটি এনজিও রয়েছে।  আমি বেশ কয়েকবার গিয়ে শিশুদের লেখাপড়ার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছি।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম আব্দুর রহমান বলেন, ‘ছয় মাসের ব্যবধানে একটি স্কুল থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। আমি গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি খোঁজ নেবো। তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে অভিভাবকহীন পথশিশুদের জন্যও শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।’

জাতিসংঘের দুই সংস্থা ‘ইউনিসেফ’ ও ‘ইউনেস্কো’র এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশের ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, এ সময় দেশের প্রায় ২৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এর ফলে বেড়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় বেড়েছে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম।

দারিদ্র্যতার সঙ্গে লড়তে লড়তে জীবন শেষ

ইলিশ মাছ রপ্তানিতে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থানে থাকলেও এর নেপথ্যের কারিগর যারা তাদের জীবনযাত্রার মান এখনও উন্নত হয়নি। এসব জেলে পরিবার বছরের পর বছর ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে, ব্যবসায়িক লোকসান গোণার পরও টিকে আছে জোড়াতালি দিয়ে। চট্টগ্রামের আকমল আলী ঘাট এলাকার জেলেদের জীবনও কাটছে দারিদ্র্যতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে।

এর মধ্যে ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়াণু’, ২০২২ সালে ‘সিত্রাং’, ২০২৩ সালে ‘মোখা’ এবং চলতি বছরে ‘রিমাল’র তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়েছে এখানকার জেলেপল্লীর শতাধিক ঘরবাড়ি।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, আকমল আলী রোডের বেঁড়িবাধের ভেতর ৩৫০ এবং বেড়িবাঁধের বাইরে ২০০ জেলে পরিবারের বসবাস। সব মিলিয়ে  স্থানীয় জেলে ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলার নদীভাঙা মানুষ এখানে বসত গড়েছেন। তারা এক হাজার টাকায় বিনিময়ে ঝুপড়ি ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করে। তাদের নেই বিদ্যুৎ, নেই বিশুদ্ধ পানি। ৪০ টাকায় ৩০ লিটারের ওয়াসার পানি কিনে পান করতে হয় তাদের। এখানকার নারী-শিশুরা সাগর তীরে জ্বালানির লাকড়ি কুড়িয়ে আনেন। দারিদ্র্যতার কারণে অনেক পরিবার একবেলা খেয়ে দিন কাটায়।

এদিকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ঋণের পেছনে ছুটতে হয় জেলেদের। ঋণ নিয়ে ইলিশ মাছ ধরার জাল ও সামগ্রী এবং নৌকা কিনেন তারা। এছাড়া ঘর মেরামত, মেয়ের বিয়ের জন্যও তাদের ভরসা এনজিও অথবা দাদন ব্যবসায়ীরা। জেলেরা মৌসুমের শুরুতে নৌকা মেরামত, জাল কেনার জন্য দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা ধার নেয় আহরিত সব মাছ বিক্রি করার শর্তে। কিন্তু মাছ ধরতে না পারলে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ জেলেরা জিম্মি হয়ে পড়েন ওই দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে। মাছ ধরলে সেগুলোর দামও ঠিক করে দেন দাদন ব্যবসায়ীরা। আর টাকা পরিশোধ করতে না পারলে হামলা-মামলার শিকার হতে হয় জেলেদের।

মূলত পাঁচ মাস সাগরে মাছ ধরার সুযোগ পায় জেলেরা। এর মধ্যে তিন মাস ইলিশের মৌসুম এবং বাকি দুই মাস অন্যান্য মাছ ধরে থাকে। এরপর বাকি সাত মাস তাদের বেকার থাকতে হয়। এই সময়টাতে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে শুধু মাত্র চাল ছাড়া আর কিছু জোটে না তাদের ভাগ্যে। সরকার দেশের ১ কোটি মানুষকে টিসিবির কার্ড দিলেও বঞ্চিত জেলেরা। বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার এখানকার মানুষ। ফলে ছেলেরা একটু বড় হলেই তাদের কর্মজীবনে নামতে বাধ্য করে অভিভাবকরা। লেখাপড়া বাদ দিয়ে এসব ছেলেরা শিশুকাল থেকেই বেছে নেয় বাপ-দাদার পৈত্রিক পেশা।

আকমল আলী ঘাট এলাকা ছাড়াও একই চিত্র নগরীর পতেঙ্গা জেলেপাড়া, ইপিজেড বেড়িবাঁধ জেলেপাড়া এবং বন্দরটিলা, হালিশহর আনন্দবাজার এলাকার জেলেপাড়া, পাহাড়তলী কাট্টলী ও রাসমনিঘাট এলাকার জেলেপল্লীর।

আকমল আলী মৎস্যঘাট সংলগ্ন জেলেপল্লীতে থাকেন চম্পা রাণী জলদাস। এক মাস আগে তার দুই মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করে দেন তিনি। করোনা ও ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে তার সংসার তছনছ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘স্বামীর আয়ের একমাত্র সম্বল জালগুলো ভেসে গেছে পানিতে। এখন একবেলা খেয়ে অন্য বেলা উপোস থাকতে হয়। তাই লেখাপড়া তো দূরের কথা, খেয়ে-পড়ে দিন কাটানোই অনেক কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় মেয়ে ওর বাবার সঙ্গে সাগরে চিংড়ির পোনা ধরে আর ছোট মেয়ে আমার সঙ্গে ঘরের কাজ করে।’

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় রীতিমতো হিমশিম খাওয়ার কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দা কিরণ জলদাস। তিনি বলেন, ‘আমি একজনের উপার্জনে পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে সংসার চলে। কর্মহীন সময়ে পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তারের ফি যোগাড় করতে এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়।’

ইপিজেডের বেড়িবাঁধ জেলেপল্লীতে বসবাসকারী জেলে কার্তিক জলদাস ২০২৪ সালের ১ জুলাই সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জালের সঙ্গে প্যাঁচিয়ে সাগরে পড়ে নিখোঁজ হয়ে যান।  নিখোঁজের ৩ ঘন্টা পর তার মৃতদেহ স্থানীয় জেলেরা খুঁজে পান। হাতিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা কার্তিক জলদাসের স্ত্রী শিউলি দাশ বলেন, ‘আমার স্বামী ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। হাতিয়ায় ঋণের দেনা শোধ করতে না পারায় আমরা গত দুই বছর আগে চট্টগ্রামের আকমল আলী রোডে জেলে পল্লীতে পরিবার নিয়ে পালিয়ে এসেছি জীবিকার সন্ধানে। গত ২ দিন ধরে আমারা অভাব অনটনে মানবেতর দিন কাটাচ্ছি, আমাদের ঘরে কোনো খাবার নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমার স্বামী সাগরে যায়, কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রাণ হারায়।’

শিউলি দাশ বলেন, ‘আমার বড় ছেলে কিশোর চন্দ্র দাশ চতুর্থ শ্রেণীতে এবং মেয়ে প্রিয়া দাশ স্বপ্নীল মডেল একাডেমির প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। স্বামীকে হারিয়ে এখন কী করবো, কিভাবে সংসার চালাবো কিছুই বুঝতে পারছি না। এখন যেখানে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা দায়, সেখানে কিভাবে ঋণের টাকা শোধ করবো? আমার তো সব শেষ।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘করোনায় ঋণগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো আরও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের মাছ-মাংসসহ পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে পারছে না। বর্তমান সরকার দেশের ১ কোটি মানুষকে রেশনিং এর আওতায় আনার চেষ্টা করলেও যাদের এটি পাওয়া দরকার তারা বঞ্চিত হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিচ্ছে। এটা আমাদের আগামী প্রজন্ম ও দেশের জন্য বড় হুমকি।’

মাদক ও চোরাকারবারিতে জড়াচ্ছে শিশুরা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভাবে তাড়নায় এখানকার শিশুরা জড়িয়ে পড়ছেন মাদক ও চোরাকারবারিতে। একইসঙ্গে বিভিন্ন উঠতি বয়সী কিশোরদের সঙ্গে মিশে ‘কিশোর গ্যাং’ গড়ে তুলছে। এমনকি মাদকের টাকা জোগাড় করতে ছিনতাইয়েও জড়াচ্ছে জেলেপল্লীর শিশু-কিশোররা।

শিশু-কিশোরদের এমন অসহায়ত্বের সুযোগে ফায়দা লুটছে এখানকার অপরাধীচক্র। তারা অনৈতিক কাজে ব্যবহার করছে এসব শিশুদের। এসব শিশুদের দিয়ে রাতের আঁধারে জাহাজ থেকে মদ, তেলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য চোরাচালান করছে চক্রটি।

আকমল আলী রোডে ২০২৪ সালের ৯ মে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনাও ঘটেছে। এখানকার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জানান, জেলেপল্লী ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে যাওয়া শিশুরা এখন কিশোর গ্যাং লিডার।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বন্দর জোনের উপ-কমিশনার (ক্রাইম) শাকিলা সোলতানা বলেন, ‘কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে ইতোমধ্যে পুলিশ কাজ করছে। যেসব শিশুর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং জামিনে আছে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং তাদের ডাটাবেজও তৈরি করা হচ্ছে। এসব শিশুদের অভিভাবকদেরও থানায় ডাকা হচ্ছে। এছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের প্রশ্রয়দাতা রাজনৈতিক নেতাদেরও ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে।’

বাড়ছে শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি

আকমল আলী ঘাটসহ আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি খালের পানি সংরক্ষণ করে ফিটকারি মিশিয়ে পান করছে। খোলা পায়খানা ব্যবহার করছে অনেকে।

সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকায় তাদের বসবাসের কারণে বাতাসের লবণের আর্দ্রতা বেশি হবার কারণে তাদের অনেকের চর্মরোগ রয়েছে। শিশুরা সহজেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া নারীদের অনেকে ঠিকমতো স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না। ফলে নীরবে বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নারীরা। এখানকার শিশুরা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠছে। পারিবারিক কলহ, অভাব-অনটন ও মাদকাসক্ত বাবার নির্যাতনের প্রভাব পড়ছে এখানকার শিশুদের মনে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বহির্বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ইসরাত জাহান বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততার কারণে নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। ফলে এসব এলাকার নারীদের মধ্যে জরায়ু সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি বেশি। এছাড়া বাতাসের আর্দ্রতায় লবণাক্ত থাকায় উপকূলীয় এলাকার শিশু-নারী-পুরুষরা এলার্জিসহ চর্ম রোগে আক্রান্ত বেশি হয়। অতিরিক্ত লবণ পানি কিডনির জন্যও ক্ষতিকর।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!