৪:৩০ থেকে ১০:৫৫/ চট্টগ্রাম কারাগারের সিসি ক্যামেরায় অমিত হত্যাকাণ্ডের এ টু জেড

অমিত মুহুরীর খুনি রিপনই, 'সুপারি' দিল কে?

0

দৃশ্যপট ১ : বিকেল ৪:৩০
cc-camera-chittagong-jail২৯ মে ২০১৯, বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট। স্থান চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার। ৩২ নম্বর ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডের সেলের বাইরে বারান্দায় বন্দিরা হাঁটাহাটি করছেন। কেউ কেউ দলগতভাবে আড্ডা দিচ্ছেন। হৈচৈ, হাঁকডাক—প্রতিদিনের চেনা ছবিটাই অবিকল।

দৃশ্যপট ২ : বিকেল ৪:৪৫
cc-camera-chittagong-jailবিকাল ৪টা ৪৫ মিনিট। ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ১ নম্বর সেল থেকে কেউ একজন হাতে দুটি ইট নিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ৬ নম্বর সেলের দিকে হেঁটে গেলেন। ৬ নম্বর সেলে থাকেন অমিত মুহুরী।

দৃশ্যপট ৩ : বিকেল ৪:৫৭
cc-camera-chittagong-jailঝিরঝির শব্দ, কালো স্ক্রিন। চট্টগ্রাম কারাগারের ওয়ার্ডে লাগানো ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা হঠাৎই বন্ধ। বিকেল ৪:৫৭ মিনিট থেকে ৫:০৭ মিনিট। বেশিও নয়, কমও নয়—কাঁটায় কাঁটায় ১০ মিনিট। সিসি ক্যামেরায় সবই আছে, মাঝখান থেকে শুধু উধাও হয়ে গেল রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার ৬০০ সেকেন্ড।

দৃশ্যপট ৪ : বিকেল ৫:০৮
cc-camera-chittagong-jailবিকেল ৫:০৮ মিনিট থেকে আবার সচল সিসি ক্যামেরা। কিন্তু পুরো ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় তখন পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছে। বন্দিরা জানে, সন্ধ্যা ৬টা বাজলেই নিয়ম অনুযায়ী সবাইকে নিজ নিজ সেলের মধ্যে ঢুকে যেতে হয়। কারাগারের ভাষায় একে বলে—লকআপ।

দৃশ্যপট ৫ : সন্ধ্যা ৬:০০
cc-camera-chittagong-jailসন্ধ্যা ৬ টার পর থেকে চট্টগ্রাম কারাগারের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় নিত্যদিনের নিস্তব্ধতা। কিন্তু সচরাচর যা ঘটে না, ঠিক সেটাই দেখা গেল হঠাৎ। রাত ১০টার পর রীতিমতো দৌঁড়ে ঢুকলেন কয়েকজন কারারক্ষী। তারা সরাসরিই চলে গেলেন ৬ নম্বর সেলের ভেতরে।

দৃশ্যপট ৬ : রাত ১০:২০
cc-camera-chittagong-jailরাত ১০:২০ মিনিট। ৬ নম্বর সেলের ছোট্ট ফটকে কারারক্ষীরা প্রাণপণ শক্তিতে আঁকড়ে ধরে আছেন রিপন নাথ নামের এক বন্দিকে। জোর করে তাকে সেল থেকে বের করার চেষ্টা করছেন রক্ষীরা। চলছে লাঠিপেটা। কারারক্ষীদের সঙ্গে তুমুল ধস্তাধস্তি চলছে উন্মত্ত ওই যুবকের সঙ্গে। এর মধ্যেই অবশ্য রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়েছে তাকে। রিপন নাথের গায়ে তখন কিছুই নেই। পরনের লুঙ্গি গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেতে। সন্ধ্যায় ১ নম্বর সেল থেকে ৬ নম্বর সেলে যাওয়া এই যুবক তখন পুরোপুরি উলঙ্গ।

দৃশ্যপট ৭ : রাত ১০:২৫
cc-camera-chittagong-jailরাত ১০:২৫ মিনিটের দিকে মাথায় গুরুতর জখম হওয়া রক্তাক্ত অমিত মুহুরীকে ধরাধরি করে বের করে আনা হল সেল থেকে। হুড়োহুড়ি করে তাকে নিয়ে যাওয়া হল কারাগারের মেডিকেল সেন্টারে। মুহুরীর রক্তাক্ত মাথায় এ সময় পড়ে ২৬টি সেলাই।

দৃশ্যপট ৮ : রাত ১০:৫৫
cc-camera-chittagong-jailরাত ১১টা বাজার পাঁচ মিনিট আগে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেল একটি গাড়ি। রক্তে ভিজে যাওয়া অমিত মুহুরীর সঙ্গে গাড়ির ভেতরে কয়েকজন কারারক্ষীর উপস্থিতি দেখা যায়।

দৃশ্যপট ৯ : রাত ১১:২০
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অমিত মুহুরীর নিঃসাড় দেহটিকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হল নিউরোসার্জারি বিভাগের ২৮ নং ওয়ার্ডে।

দৃশ্যপট ১০ : রাত ১:৪৫
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আনুষ্ঠানিকভাবে অমিত মুহুরীকে মৃত ঘোষণা করেন।

রহস্যে ঘেরা দুই প্রশ্ন
প্রশ্ন উঠেছে, রিপন কোন্ সময়ে ১ নম্বর সেল থেকে ৬ নম্বর সেলে প্রবেশ করলেন? তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, বিকেল ৪টা ৫৭ মিনিট থেকে ৫টা ৭ মিনিট পর্যন্ত যে ১০ মিনিট সিসি ক্যামেরা বন্ধ বা অকার্যকর ছিল সেই সময়েই রিপন নাথ অমিত মুহুরীর সেলে প্রবেশ করেছেন।

সঙ্গতকারণে এই প্রশ্নও উঠেছে, রাত দশটার পর মাত্র মিনিট বিশেকের মধ্যে কী ঘটেছিল ৬ নম্বর সেলে, যে কারণে অমিত মুহুরীকে খুন হতে হলো? জানা যায়, ৬ নম্বর সেলে অমিতের সঙ্গে বেলাল নামে অপর এক বন্দি ছিলেন। আরেকজন যিনি ছিলেন তার জামিন হয়ে যাওয়ায় তিনজনের সেলে থাকছিলেন ওই দুজন। ‘ঘাটতি পূরণের’ জন্য ১ নম্বর সেল থেকে রিপনকে অমিতের সেলে আনা হয়।

চট্টগ্রাম কারাগারে ইট নিয়ে প্রবেশ ও সিসি ক্যামেরা টানা ১০ মিনিট বন্ধ থাকার বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলার নাশির আহমেদ বলেন, ‘ইট নিয়ে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। তবে অমিতের সেলে ইট কিভাবে এসেছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আর সিসি ক্যামেরা সবসময় সচল থাকে। হয়তো, কারিগর ত্রুটির কারণে এমনটি হয়েছে।’

দশটা বাজতেই যমদূতের চেহারায় রিপন
প্রথম দেখাতেই রিপনকে দেখে অমিত আপত্তি জানান। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ তাদের সেলে রিপনকে দেওয়ায় অমিতের কিছুই করার ছিল না। এরপর ইফতার সেরে ও রাত ৮টার দিকে খাওয়াদাওয়া সেরে অমিত ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পর দিন ৩০ মে আদালতে হাজিরা ছিল অমিতের। সেজন্য ওই দিন একটু আগেই ঘুমাতে যাচ্ছিলেন অমিত।

এসময় বেলালকে অমিত বলেছিলেন তার শরীরটা একটু টিপে দিতে। বেলাল যথারীতি অমিতের শরীরটা টিপে দেন। পরে তারা পাশাপাশি শুয়ে পড়েন। এসময় বেলালের ওপাশে নতুন বন্দি রিপনও শুয়ে পড়েন। বেলাল মাঝখানে, আর রিপন ও অমিত বেলালের দুপাশে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত দশটার দিকে বেলাল ও অমিত যখন ঘুমন্ত অবস্থায়, ঠিক তখনই অঅতর্কিতভাবে অমিত মুহুরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রিপন নাথ। সেখানে আগে থেকে থাকা তিন কোণাকৃতির ইট দিয়ে অমিতের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকেন রিপন। বিষয়টি টের পেয়ে বেলাল উঠে রিপনকে জড়িয়ে ধরে নিবৃত্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু রিপনের শক্তির কাছে বেলালও তখন অসহায়। ঘুমন্ত অবস্থায় উপর্যুপরি ইটের আঘাতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে অমিতও। বেলালের চিৎকারে ওয়ার্ডে দায়িত্বরত দুজন কারারক্ষী দৌড়ে এসে সেলে প্রবেশ করেন। এ সময়ও রিপন অমিতের মাথায় ক্রমাগত আঘাত করেই চলছিলেন। কারারক্ষীদের বাধাও তিনি মানছিলেন না। এ সময় মাথার পর অমিতের মুখেও আঘাত করতে থাকেন রিপন। পরে তাকে লাঠিপেটা করে জোর করে সেল থেকে বের করা হয়। এসময় ধস্তাধস্তিতে রিপনের লুঙ্গি খুলে যাওয়ায় তাকে উলঙ্গ অবস্থাতেই বের করা হয়।

কারা হাসপাতালে ২৬টি সেলাই
অমিতকে ৬ নম্বর সেল থেকে উদ্ধার করে প্রথমে কারা মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখান থেকে প্রাথমিকভাবে কারাগারে চিকিৎসা দিয়ে গোপনে অমিতকে সুস্থ করার চেষ্টা চালান কারা হাসপাতালের চিকিৎসকরা। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে কারা হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) নেওয়ার পরামর্শ দেন। কারাগার থেকে অমিতকে রাত ১১টায় বের করা হয়। রাত ১১টা ২০ মিনিটে অমিত মুহুরীকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হলে নিউরোসার্জারি বিভাগের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসকরা ২৯ মে দিবাগত রাত ১টা ৪৫ মিনিটে অমিত মুহুরীকে মৃত ঘোষণা করেন। মেডিকেলে নেওয়ার আগেই কারাগারে অমিতের মাথায় ২৬টি সেলাই দেওয়া হয়।

রিপনই খুনি, কিন্তু ‘সুপারি’ দিল কে?
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘রিপনই যে অমিতের খুনি সেটা অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এখন তিনি কেন কী কারণে কার নির্দেশে এ খুন করেছেন সেটাই বের করা হবে। হঠাৎ করে চার ঘণ্টা আগে সেলে এসে কেন একজন মানুষকে খুন করবে? এতো বাধার পরও রিপন অমিতকে ইট দিয়ে আঘাত করেই যাচ্ছিলেন। এতে বোঝা যায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই রিপন পূর্ব পরিকল্পনামতো অমিতকে খুন করেছে। তবে রিপন এ ঘটনায় মুখ না খুললেও শুধু একটি কথাই বলছেন, তা হচ্ছে রাগের মাথায় অমিতকে মেরেছেন। এটাই যদি হতো অমিতের মৃত্যু নিশ্চিত হয় এমনভাবে কেন উপর্যুপরি আঘাত করছিলেন?’

‘আমাদের ধারণা, বাইরের কারো নির্দেশে “সুপারি” নিয়ে রিপন অমিতকে হত্যা করেছেন। তবে সেটা তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া অন্যভাবে বের করা কষ্টকর। কেননা বাইরের খুন আর কারাগারের খুনের মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত এ মামলার শেকড়ে যাব আমরা।’—যোগ করেন এ কর্মকর্তা।

জিজ্ঞাসাবাদ ঈদের পর
জানতে চাইলে এ মামলার তদারক কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (দক্ষিণ) আসিফ মহিউদ্দীন নিজ কার্যালয়ে সোমবার দুপুরে (২ মে) বলেন, ‘মামলার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে মাত্র। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত কারাবন্দি রিপনকে এ মামলায় গ্রেপ্তারের আদেশ দিয়েছেন। তাকে আমরা এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করিনি। ঈদের ছুটির পর জিজ্ঞাসাবাদ করলে রহস্য উদঘাটন হবে।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক আজিজ আহমেদ বলেন, ‘রিপনকে এখনও রিমান্ডে আনিনি। রিমান্ডে আনলে খুনের মোটিভ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিপন মুখ না খোলায় কিছুুুই বলতে পারছি না। তবে রিপনই অমিতকে খুন করেছে সেটা অনেকটাই নিশ্চিত। এখন কারণ কী আর নির্দেশদাতা আছে কিনা সেটা বের করতে হবে।’

কোটি টাকার চুক্তিতে খুন—পরিবারের দাবি
যদিও খুনের দিন থেকে অমিতের পরিবার থেকে দাবি করা হচ্ছে, রিপন নাথ অমিতকে হত্যা করেছেন চুক্তিভিত্তিতে। এ জন্য অমিতের রাজনৈতিক বলয়ের সহকর্মীদের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলছেন। তাদের দাবি, এ খুনের জন্য কোটি টাকার বিনিময় হয়েছে। শুধু রিপন নয় জেলের অনেকেও জড়িত এ হত্যাকাণ্ডে।

অমিত পরিবারের এই দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন তদন্তকারী দলও। এ সন্দেহটি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মত নয় বলছেন তারা।

ইতিমধ্যে অমিত হত্যায় জেলার নাশির আহমেদের দায়ের করা মামলায় ডিবির আবেদনের প্রেক্ষিতে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আর ৬ নম্বর সেল থেকে রক্তমাখা কম্বল, রক্তমাখা ইট জব্দ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

এডি/সিপি

Loading...
আরও পড়ুন