৪০ হাজার অনাথ শিশুর ছিন্নভিন্ন শৈশব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা আশ্রিত রোহিঙ্গা শিশুদের প্রতি দুজনের একজন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতায় তাদের মা অথবা বাবাকে হারিয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক শিশুর শৈশব হয়ে গেছে ছিন্নভিন্ন। মিয়ানমারের সেনারা তাদের বাবা-মাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বাঁচার তাগিদে তারা বাংলাদেশে একা এসেছে। পিতৃমাতৃহীন এসব শিশু পাচারের শিকার হচ্ছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে তাদের জীবন কাটছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সর্বশেষ (১ জুলাই ২০১৯) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাম্পে অবস্থান করা ৩৯ হাজার ৮৪১ জন শিশুর মা-বাবার খোঁজ নেই। এর মধ্যে ছেলে ১৯ হাজার ৫৯ জন এবং মেয়ে ২০ হাজার ৭৮২ জন। মোট ৮ হাজার ৩৯১ জন শিশুর মা-বাবা কেউই নেই। এছাড়া শুধু পিতৃহীন ২৯ হাজার ৩১৫, বাবা-মা থেকে পৃথক পরিচিতদের সাথে ৮৬৫, বাবা-মা থেকে পৃথক অপরিচিতদের সাথে ৩৭, বাবা-মা থেকে পৃথক একা রয়েছে ৬৮জন শিশু।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের হিসাব মতে, অনাথ শিশুর সংখ্যা কমপক্ষে ১০ হাজার। ইউনিসেফের উপ-নির্বাহী পরিচালক জাস্টিন ফরসিথ বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারে ৫৮ শতাংশ রোহিঙ্গা শিশু একা এসেছে। ৯ লাখ ৭৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে ১০ হাজার শিশুই অভিভাবকহীন।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের এক গবেষণায় দেখা যায়, অভিভাবকহীন শিশুদের ৭০ শতাংশই তাদের অভিভাবকদের হারিয়েছে মিয়ানমারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। ৬৩ শতাংশ শিশু অভিভাবকদের হারিয়েছে তাদের গ্রামে সরাসরি আক্রমণের সময়। এ ছাড়া ৯ শতাংশ শিশু তাদের পরিবার ও অভিভাবকদের বাংলাদেশে আসার পথে হারিয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের অর্ধেকই (৫০ শতাংশ) বলেছে, তাদের অভিভাবক ও পরিজনদের হত্যা করা হয়েছে। অনেক শিশুই সেসব হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী।

কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ছবি: ইউএনএফপিএ
কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ছবি: ইউএনএফপিএ

শুরুতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া পরিবারবিচ্ছিন্ন ও অনাথ রোহিঙ্গা শিশুদের আলাদা ক্যাম্পে রাখার পরিকল্পনা নেয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। পরে এই শিশুরা যাতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায় এবং মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার সময় আশ্রয় দেওয়া পরিবার যাতে এই শিশুদেরও সঙ্গে নিয়ে ফেরে, সে জন্য শিশুপল্লী করার পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়। পরে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রায় পাঁচ হাজার ফস্টার কেয়ারগিভার (আত্মীয় বা অন্য যে পরিবারের সঙ্গে শিশুকে রাখা হচ্ছে) পরিবারকে প্রতি এতিম শিশুকে প্রতিপালনের জন্য ২ হাজার টাকা করে মাসিকভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে।

৩৪ হাজার ৮৪১ অনাথ শিশু সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মো. নুরুল আলম নিজামী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘মা-বাবা না থাকলেও তাদের আত্মীয়স্বজন আছে। বাচ্চাগুলোকে সরকারিভাবে ভরণপোষণ ও লালন পালন করা হচ্ছে। বাচ্চাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে তাদেরকে।’

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!