৩ বছরের বেআইনি দখল শেষে চার ফ্লাইওভার ছাড়লো সিডিএ

0

আইন লঙঘন করে গত তিন বছর ধরে চট্টগ্রাম নগরীর চারটি ফ্লাইওভার কব্জায় রেখেছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ)। এ জন্য সিডিএ’র নতুন চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ দায় দিচ্ছেন টানা ১০ বছর ধরে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা আবদুচ ছালামকে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) ফ্লাইওভার হস্তান্তর করতে এসে নিজেই একথা জানালেন সিডিএ চেয়ারম্যান দোভাষ।

তবে এ বছরের এপ্রিলে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজে উদ্যোগ নেন অ্যাক্ট অনুযায়ী এই চারটি ফ্লাইওভার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করার। সেই উদ্যোগ অবশেষে সফল হয়েছে রোববার বিকেলে (১ ডিসেম্বর)।

এদিন টাইগারপাসে চসিকের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে চারটি স্থাপনা হস্তান্তর করা হয় সিডিএ’র পক্ষ থেকে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরশেনের (চসিক) পক্ষে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্লাইওভার চারটি বুঝে নেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

ফ্লাইওভারগুলো হচ্ছে মুরাদপুর আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, বহদ্দারহাট এমএ মান্নান ফ্লাইওভার, কদমতলী ও দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার।

সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর নতুন একটি অ্যাক্টে দেখলাম, সিডিএ সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন সংস্থা। নিয়ম হচ্ছে সরকার সিডিএ’র মাধ্যমে সরাসরি উন্নয়ন কাজ করে। কোনও প্রকল্প করার পর স্থানীয় সরকার বিভাগের সংস্থা সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদকে হস্তান্তর করার নিয়ম রয়েছে। আমি দেখলাম ৪টি ফ্লাইওভার নির্মাণের ২-৩ বছর হয়ে গেছে। হস্তান্তর করা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখলাম। মন্ত্রণালয় সভা ডাকলো। মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দিয়েছে চসিককে হস্তান্তর করার। এরপর আমরা চসিককে চিঠি দিই। নানা ধাপ পেরিয়ে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হলো চার ফ্লাইওভার।’

সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘সিডিএ এসব ফ্লাইওভার নির্মাণ করলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও লোকবল নেই। তাই এসব ফ্লাইওভার আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চসিককে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

এ সময় চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘সিডিএ এই নগরীতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ৪টি ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছিল। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিকের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এগুলো আমরা রক্ষণাবেক্ষণ করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘হস্তান্তরের আগে উভয় প্রতিষ্ঠানের টিম আলাদা আলাদাভাবে সার্ভে করেছে। চউকের মেইনটেইন সক্ষমতা নেই। আইনেরও বাধ্যবাধকতা আছে। কদমতলী ও বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে আমাদের কিছু সংস্কার কাজ করতে হবে। উপরেও করতে হবে, নিচেও করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব আমরা কাজগুলো করবো। আমাদেরও (চসিক) আর্থিক সীমাবদ্ধতা আছে। পাশাপাশি জনবলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’

গত ৯ অক্টোবর গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে সংস্থার আওতাধীন সিডিএ’র অধীনে বাস্তবায়িত আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, বহদ্দারহাটের এম এ মান্নান ফ্লাইওভার, কদমতলী জংশনের ফ্লাইওভার ও দেওয়ানহাট ওভারপাসটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিকের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠকে চসিক মেয়র ও সিডিএর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এমএ মান্নান ফ্লাইওভার (বহদ্দারহাট)
যানজট নিরসনের কথা মাথায় রেখে সিডিএ নগরের শুলকবহর থেকে বহদ্দারহাট এক কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত এমএ মান্নান ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এ প্রকল্প ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসের ঘটনায় ১৪ জন নিহত হলে এর নির্মাণ কাজ তদারকির দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নির্মাণ কাজ শেষে ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর ফ্লাইওভারের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের পর আবার আরাকান সড়কমুখী র্যা ম্প নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সিডিএ। ৩২৬ মিটার দীর্ঘ এবং ৬ দশমিক ৭ মিটার চওড়া র্যা ম্পটি নির্মাণের পর দুইদিক থেকে যান চলাচলে গতি আসে। ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করা হয়।

আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার (মুরাদপুর)
২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর নগরীর মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত চার লেনের আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের মার্চে। ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ফ্লাইওভারটির মূল অংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। শুরুতে পাঁচ দশমিক দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এ ফ্লাইওভারের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৪৬২ কোটি টাকা।

পরে ফ্লাইওভারের দুই নম্বর গেইট এলাকায় নতুন একটি লুপ এবং জিইসি মোড় এলাকায় আরও একটি র্যা ম্প যোগ হয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯৮ কোটি টাকা। গত বছরের ১ জুন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় এ ফ্লাইওভারের এক হাজার ৩০০ মিটার দীর্ঘ লুপটিও।

কদমতলী ফ্লাইওভার
নগরীর বটতলী স্টেশন থেকে ডিটি রোডের ধনিয়ালাপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এ ফ্লাইওভার নির্মাণের পর উদ্বোধন করা হয় ২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর। এটি নির্মাণে সিডিএ’র ব্যয় হয় ৫৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। আগ্রাবাদ, কদমতলী ও রিয়াজুদ্দিন বাজার কেন্দ্রিক যান চলাচলে স্বস্তি আনার কথা মাথায় রেখেই এ ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। ২০১২ সালের জুলাইয়ে এ ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তিন বছর পর এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার
এ ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১১ সালে। ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১২ সালে। তবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় ২০১৩ সালে। এটা ওভারপাসের মতো। ধনিয়ালা পাড়ার দিক থেকে মনসুরাবাদ এবং মনসুরাবাদের দিক থেকে ধনিয়ালা পাড়ার দিকে যান চলাচলকে নির্বিঘ্ন রাখার চিন্তা থেকে এটা নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিডিএ কর্তৃপক্ষ।

এডি/এসএ

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন