২৫ লাখে দুই আসামির নাম বাদ দেন চট্টগ্রামের এসআই, তদন্তে মিলেছে সত্যতা

২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে চার্জশিট থেকে দুই আসামির নাম বাদ দেওয়া এক এসআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে চট্টগ্রামের পুলিশ।

আসামির মোবাইল নম্বরের জায়গায় জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যজনের নম্বর দেখিয়ে চার্জশিট থেকে আসামির নাম বাদ দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ডিবি শাখার তৎকালীন এসআই মো. বদরুদ্দোজা। আসামির পিসিপিআর (আগের অপরাধের খতিয়ান) অন্যের নামে চালিয়ে দিয়েছেন তিনি।

অভিযুক্ত এসআই মো. বদরুদ্দোজার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও সুপারিশ করা হয়েছে। ৬ আগস্ট পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে এসআই বদরুদ্দোজার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু ও ফলাফল অবহিতকরণ প্রসঙ্গে সিএমপি কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

অভিযুক্ত এসআই বদরুদ্দোজা বর্তমানে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত আছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে ডবলমুরিং থানাধীন ঈদগাহ কাঁচা রাস্তা এলাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ ইয়াবাসহ মো. আরিফ নামে এক ট্রাক চালককে গ্রেপ্তার করে মহানগর ডিবির (পশ্চিম) এসআই দস্তগীর হোসেন। এ ঘটনায় তিনি বাদি হয়ে ডবলমুরিং থানার মামলা নং ২৭(৭)২০২০ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেন৷

ডবলমুরিং থানার মাদক মামলাটি চট্টগ্রাম দ্বিতীয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারের (যার মামলা নম্বর ৪০৩৩/২০২৩) জন্য গেলে নথি পর্যালোচনায় পদে পদে তার জালিয়াতি ও মনগড়া তদন্ত করে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রমাণ মেলে। এর পরই সিএমপি তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে।

সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (পাঁচলাইশ জোন) মো. বিল্লাল হোসেনের তদন্তে উঠে আসে জালিয়াতির ফিরিস্তি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা ২৫ লাখ টাকা নিয়ে মাদক কারবারি আলাউদ্দিন ও তার ভাগনে মো. ফোরকানকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। অথচ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদলতে জবানবন্দিতে আরেক মাদক কারবারি আরিফ এ দু’জনের নাম বলেছিলেন।

কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেন, ফোরকান এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার সময়, আগে ও পরে চট্টগ্রামে ছিলেন না। বাগেরহাটের শরণখোলায় ছিলেন। এ কথার স্বপক্ষে ফোরকানের মোবাইল কললিস্ট দাখিল করা হয়। কিন্তু ফোরকানের বলে যে মোবাইল নম্বর দাখিল করা হয়, সেটির মালিক ইমরান উদ্দিন শুভ। তিনি শরণখোলার রায়েন্দা এলাকার কামাল উদ্দিন আকনের ছেলে। ইমরান কখনও চট্টগ্রামে আসেননি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ফোরকানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঘটনার আগে ও পরে তিনি ঘটনাস্থল উত্তর কাট্টলীতে ছিলেন। তার এনআইডি ও টাওয়ার লোকেশন ছিল উত্তর পাহাড়তলী কর্নেলহাট আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাসা। এছাড়া ডবলমুরিং থানার মাদক মামলার অভিযোগ দেওয়ার আগে বদরুদ্দোজা আলাউদ্দিনের ভাগনে ও নটসেন্টআপ আসামি ফোরকানের আপন ভাই এমরানের সঙ্গে তদন্তাধীন বিষয়ে মোবাইল ফোনে আলাপ করেন। ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর থেকে তিনি কর্ণফুলী থানায় ইয়াবা মামলার পলাতক আসামি এমরানের সঙ্গে অভিযোগপত্র দাখিলের আগের দিন ২০২১ সালের ২ মে কথা বলেন। আদালত অভিযোগপত্রে ত্রুটি পাওয়ার পর শোকজ করার দিনও এমরানের সঙ্গে কথা হয় বদরুদ্দোজার।

তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া আসামি আলাউদ্দিন ওরফে চটপটি আলাউদ্দিনের নামে আগের দুটি মামলা উল্লেখ না করে অন্য আসামি আবদুল জলিলের পিসিপিআর হিসেবে দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বদরুদ্দোজা।

এছাড়া অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা জালিয়াতি করায় চট্টগ্রামের ২য় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর কৈফিয়ত তলব করেন। আদালতকে মিথ্যা তথ্য সন্নিবেশিত ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কৈফিয়ত নিষ্পত্তি করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায়কে একাধিকবার কল দিলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবদুর রশিদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘মাদকের মামলায় ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ওই দুজনের নাম সরাসরি উঠে এসেছে। চার্জশিট থেকে তাদের নাম বাদ যাবে না। তদন্ত কর্মকর্তা কাজটি ঠিক করেননি।’

জানা গেছে, হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাইসহ ১৩ মামলার আসামি মো. আলাউদ্দিন ওরফে চটপটি আলাউদ্দিন। এর মধ্যে দশটি মামলায় এজাহারে তার নাম আছে। তিনটি মামলায় ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে আসে আলাউদ্দিনের নাম। এছাড়া ২০১৯ সালের জুলাইয়ে সদরঘাট থানায় র্যাবের করা মাদকের একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করতে সাক্ষ্য স্মারকে অনুমোদন দেন র‍্যাবের তৎকালীন ডিজি ও সাবেক আইজিপি ড. বেনজির আহমেদ।

আরএম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!