২২ ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা মেরে এখন বড় খেলাপি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হারুন

স্ত্রী-পুত্রসহ ৫ মাসের সাজা এবার ১৪২ কোটির মামলায়

0

ব্যবসার চেয়েও তিনি সবসময়ই বেশি সময় ও শ্রম দিয়েছেন ব্যাংকের সঙ্গে ভাব জমানোয়। এভাবে ভাব জমানোর ফলও তিনি পেয়েছেন হাতেনাতে। মোক্ষম সব কৌশলে ২২টি ব্যাংক থেকে নিয়েছেন প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ঋণ। সেই টাকা এখন আর ফেরত দিতে চান না। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঋণের বিপরীতে তিনি দিয়েছেন নামমাত্র জামানত— যা ঋণের ভগ্নাংশও নয়।

নাম তার হারুন অর রশিদ। তিনি চট্টগ্রামভিত্তিক এইচ আর গ্রুপের কর্ণধার। এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে— রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল, ন্যাশনাল আয়রন, এইচ স্টিল রি-রোলিং মিলস, চিটাগাং ইস্পাত, রুবাইয়া প্লাস্টিক। অন্যদিকে বেনামি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে তালুকদার ট্রেডিং ও রহমান স্টিল।

খেলাপি ঋণের দায়ে অন্তত ১০ বছর আগে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক পদ হারান হারুন অর রশিদ। তবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের স্পন্সর হিসেবে বর্তমানে তার নাম রয়েছে।

এইচ আর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হারুন অর রশিদ কেবল নিজে নন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন তার স্ত্রী গ্রুপের চেয়ারম্যান আনজুমান আরা বেগম ও ছেলে হাসনাইন হারুনের নামেও। ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের টাকা ঋণ নিয়ে সেটা পরিশোধ না করায় তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে কয়েক ডজন ঋণখেলাপি ও চেক প্রতারণার মামলা।

বুধবার (৮ জুন) সাউথইস্ট ব্যাংকের দায়ের করা প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা ঋণখেলাপি মামলায় পাঁচ মাসের সাজা পেয়েছেন স্ত্রী ও ছেলেসহ হারুন অর রশিদ। রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েলের নামে ওই অংকের টাকা ঋণ হিসেবে নিয়েছিলেন তারা। চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতের বিচারক মুজাহিদুর রহমান শুনানি শেষে সাজার এই আদেশ দেন।

Yakub Group

গত বছরের অক্টোবরে এনসিসি ব্যাংকের ২৫ কোটি ১৮ লাখ ৭৬ হাজার ৪৭৩ টাকা আত্মসাতের একটি জারি মামলায়ও রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের এই তিন পরিচালকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত।

সাউথইস্ট ব্যাংকের আইনজীবী আলী আজগর চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘সাউথইস্ট ব্যাংক পাহাড়তলী শাখার অর্থঋণ মামলায় ডিক্রি পেয়ে জারি মামলা দায়ের করি। এ জারি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তফসিল বিক্রির পর ১৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৩২ হাজার ২১৮ টাকা পাওনা আদায় করতে না পারায় অর্থঋণ আদালতে দেওয়ানি আটকাদেশ চেয়ে আবেদন করি। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত শুনানি শেষে তাদের বিরুদ্ধে ৫ মাসের দেওয়ানী আটকাদেশ জারি করে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করেছেন।’

চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘১৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৩২ হাজার ২১৮ টাকার ঋণ খেলাপি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করে সাউথইষ্ট ব্যাংক লিমিটেড পাহাড়তলী শাখা। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত শুনানি শেষে তাদের বিরুদ্ধে ৫ মাসের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

জানা গেছে, স্ত্রী আনজুমান আরা বেগম ও ছেলে হাসনাইন হারুনসহ এইচ আর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হারুন অর রশিদের প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ইস্পাত-এর নামে সাউথইষ্ট ব্যাংক হালিশহর শাখা থেকে নেওয়া হয়েছে ২৮ কোটি ৪৯ লাখ ৫ হাজার ২৮ টাকা ঋণ। এইচ স্টিল রি-রোলিং মিলসের নামে ব্যাংক এশিয়ার আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ৭৫ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮১৬ টাকা। রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েলের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেওয়া হয়েছে ২৬ কোটি ৭৭ লাখ ২৬ হাজার ৮১ টাকা। এসব ব্যাংকের দায়ের করা মামলায় ডিক্রি দিয়েছেন আদালত।

জানা গেছে, এইচ আর গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল আয়রন এন্ড স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে ব্যাংক আল-ফালাহ আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেওয়া হয়েছে ৮ কোটি ৮৩ লাখ ৮২ হাজার ৭১৫ টাকা। রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েলের নামে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেওয়া হয়েছে ৭ কোটি ৫৩ লাখ ২১ হাজার ৯৬ টাকা। এই দুটি ব্যাংকের দায়ের করা মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হারুন অর রশিদের মালিকানাধীন চট্টগ্রামভিত্তিক এইচআর গ্রুপের অধীনে ১৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েলে। এ প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে ১৩টি ব্যাংক থেকে। ২০২১ সাল পর্যন্ত রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে রয়েছে ৪৪৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ঋণখেলাপের ছয়টি মামলা। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এর ২০১২ সালে দায়ের করা ১০৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার আরও তিনটি মামলা রয়েছে।

একই গ্রুপের চিটাগাং ইস্পাতের বিরুদ্ধে ১২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ঋণখেলাপের তিনটি মামলা রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৭৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং আল-আরাফাহ্ ব্যাংক পাবে ৮৫ কোটি টাকা। গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চিটাগং ইস্পাতের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১২৮ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার ৫২৯ টাকা।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm