১ বছরেও খোঁজ মেলেনি সালেহ আহমদের, নিদারুণ কষ্টে পরিবার

চট্টগ্রাম নগরীর চশমা খালে পা পিছলে তলিয়ে যাওয়া সবজি বিক্রেতা সালেহ আহমদের নিখোঁজ হওয়ার এক বছর হয়ে গেল।

গত বছরের ২৫ আগস্ট নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার এক বছর পরও অসহায় পরিবারটির পাশে আজও দাঁড়ায়নি কেউ। সালেহ আহমেদ পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের মনসা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি নগরীর চকবাজারে সবজি বিক্রি করতেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি।

খালের পানিতে হারিয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে সালেহ আহমদ।
খালের পানিতে হারিয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে সালেহ আহমদ।

সালেহ আহমদের ছেলে সাদেকুল্লাহ মাহিন গত বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন। সালেহ আহমদ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাকে হারিয়ে পরিবারটি যেমন অসহায় হয়েছে, তেমনি অভাব অনটনে পড়ে তার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতও ডুবতে বসেছে অন্ধকারে। সালেহ আহমদের বৃদ্ধা মা আজও কেঁদে কেঁদে দিনাতিপাত করছেন। নিখোঁজ ছেলের লাশটি পর্যন্ত না পাওয়ার বেদানা এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।

স্ত্রী ও পুত্র-কন্যার সঙ্গে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সালেহ আহমদ।
স্ত্রী ও পুত্র-কন্যার সঙ্গে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সালেহ আহমদ।
Yakub Group

সালেহ আহমদের খালে পড়ে যাওয়ার একদিন পর তার বাসায় গিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তিন মাস পরে তার ছেলে সাদেকুল্লাহ মাহিনকে সিটি করর্পোরেশনের একটি অস্থায়ী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকে সিটি করপোরেশন পরিচালিত সিএনজি স্টেশনে ‘হেলপার’ পদে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। তখন তাকে বলা হয়েছিল সিএনজি পাম্পের স্লিপ লেখার কাজ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মাহিনকে দেওয়া হয়েছিল গাড়িতে গ্যাস ভরার দায়িত্ব। এটা করা তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। শেষপর্যন্ত এক সপ্তাহ পর মাহিন চাকরি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হন।

সাদেকুল্লাহ মাহিন জানান, শৈশব থেকেই স্বপ্ন দেখতাম এইচএসসি পাশ করে নামকরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। কত কিছুই না ভেবেছিলাম। সে স্বপ্ন পূরণে পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন। এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা সবকিছু ওলটপালট করে দিল। এ শহর কেড়ে নিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে, আমার বাবা সালেহ আহমেদকে।

মাহিন বলেন, নগরীর চকবাজারে একটি ছোট্ট দোকানে বাবা সবজি বিক্রি করতেন। আমরা থাকতাম পটিয়ার গ্রামের বাড়িতে। বাবার যা আয় হতো, তার পুরোটাই প্রায় বাড়িতে পাঠাতেন। কষ্টেসৃষ্টে কেটে যাচ্ছিল আমাদের জীবন। বাবা চকবাজারেরই একটি মেসে থাকতেন। সময় করে বাড়ি আসতেন। আমরা বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকতাম। অভাব থাকলেও নির্ভরতার মানুষ ছিল আমাদের, স্বপ্ন দেখার সাহস ছিল। কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় জীবনের তাল কেটে গেল। গত বছরের ২৫ আগস্ট মুরাদপুরের চশমাখালে তলিয়ে যান বাবা। আমরা তাঁর মুখটুকুও শেষবারের মতো দেখলাম না। কোথায় গেছেন, আজ পর্যন্ত খোঁজও পেলাম না। আমাদের পরিবারের সবার মনে এ যন্ত্রণা এখনো হৃদয়ে নাড়া দিচ্ছে । এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি, কাউকে কখনো বলে কিংবা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।

এর আগে সবজি ব্যবসায়ী সালেহ আহমদের নিখোঁজ হওয়ার দায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

এ ঘটনা তদন্তে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে তা উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে গঠিত সাত সদস্যের ওই তদন্ত কমিটি গত বছরের ১ নভেম্বর একটি প্রতিবেদন জমা দেন। অথচ এই ঘটনাসহ এ রকম ঘটনায় সিডিএ ও চসিক একে অপরের বিরুদ্ধে দোষারোপ করে নিজেদের দায়দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করে। সালেহ আহমদের মৃত্যুর পর এই ঘটনায় দায় নিয়ে একে অন্যের ওপর দোষ দিয়ে পার পেতে চেয়েছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট সকাল দশটার সময় চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুরে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় রাস্তা পার হতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে চশমা খালে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যান সবজি বিক্রেতা সালেহ আহমেদ (৫০)। মাইজভান্ডার দরবার শরিফে যাওয়ার জন্য মুরাদপুরে এসেছিলেন তিনি। সেখান থেকে বাসে করে দরবার শরিফে যাওয়ার কথা ছিল তার। তাকে উদ্ধারে কয়েক দফা চেষ্টা করা হলেও শেষমেশ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm