১ বছরেই ১৫ শিক্ষককে চিরতরে হারিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জুলাইতেই ছয়

0

প্রাণঘাতী করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত ছিল পুরো দেশ। সেই করোনাভীতিকে অনেকটা পাশ কাটিয়ে শেষ হতে চলেছে আরও একটি বছর, ২০২১ সাল। বিদায়ী এ বছরে করোনা, ক্যান্সার, বার্ধক্যজনিত রোগসহ নানা রোগে ভুগে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্ব না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তেমনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) হারিয়েছে ১৫ জন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষককে। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই মারা গেছেন ছয়জন শিক্ষক।

অধ্যাপক আবদুল মুক্তাদির

গত ১২ মার্চ সকালে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা মারা গেছেন ফাইন্যান্স বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আ ন ম আবদুল মুক্তাদির।

অধ্যাপক মুক্তাদির বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করেন। করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন ছিলেন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়।

অধ্যাপক ড. মঈনুদ্দিন আহমদ

Yakub Group

২৮ মার্চ সকালে নগরীর দেওয়ান বাজার এলাকায় নিজ বাসায় মারা যান ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. মঈনুদ্দিন আহমদ খান।

অধ্যাপক ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে নবগঠিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন। সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চট্টগ্রামের প্রথম উপাচার্য ছিলেন গুণি এই অধ্যাপক।

অধ্যাপক ড. হাসান মোহাম্মদ

১১ এপ্রিল বিকেলে নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. হাসান মোহাম্মদ।

সাগরকন্যা সন্দ্বীপে জন্ম নেওয়া ড. হাসান মোহাম্মদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সহসভাপতি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালকসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাজীবি সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বহু গ্রন্থের প্রণেতা এবং বিভিন্ন জার্নাল ও বই সম্পাদনা করেন।

অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হক

২৫ মে সন্ধ্যায় নগরীর মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইতিহাস বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হক।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের একমাত্র ফুলব্রাইট স্কলার ছিলেন এই গুণি অধ্যাপক। তিনি বেশ কিছু বই লিখেছেন। যার অধিকাংশ বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি সম্পর্কিত।

এছাড়া তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে মিরসরাই-সীতাকুন্ড অঞ্চলে সম্মুখ সারিতে থেকে যুদ্ধ করেছেন। একটি ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডারও ছিলেন। যদিও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী

২৪ জুন বিকেলে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী।

ড. মোহাম্মদ আলী ১৯৩৪ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছাড়াও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা এবং সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের উপাচার্য ছিলেন।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রশিদ

২৮ জুন সকালে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরবি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রশিদ।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ড. মুহাম্মদ রশিদ ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষা বিভাগে আরবি ও ফার্সি ভাষার প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন বছর আরবি ও ফার্সি বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

অধ্যাপক ড. খালেদা হানুম

৪ জুলাই ভোরে নগরীর একটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাংলা বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. খালেদা হানুম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলীর সহধর্মিণী ছিলেন। এর আগে গত ২৪ জুন অধ্যাপক মুহাম্মদ আলী মারা যান।

ড. খালেদা খানমের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর স্বামী ড. মুহাম্মদ আলী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা এবং সাউদার্ণ বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এর উপাচার্য ছিলেন।

অধ্যাপক ড. মো. নুরুল মোস্তফা

১৮ জুলাই সন্ধ্যায় নগরীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নুরুল মোস্তফা। তিনি বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও সাদার্ন ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য ছিলেন।

ড. নুরুল মোস্তফার বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগেরও সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ছিলেন।

বাসবী বড়ুয়া

২২ জুলাই দিবাগত রাত তিনটার দিকে দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সাথে লড়ে পরপারে পাড়ি জমান আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের প্রভাষক বাসবী বড়ুয়া।
বাসবী বড়ুয়া চট্টগ্রামের পটিয়া থানার তেকোটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরে ভারতের দিল্লীর জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় হতে দ্বিতীয় মাস্টার্স ও এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি নারী শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের উপর বিভিন্ন গবেষণাপত্র রচনা করেছেন।

অধ্যাপক ড. ইমরান হোসেন

২৫ জুলাই সন্ধ্যায় সাতটার দিকে ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমরান হোসেন। দীর্ঘদিন বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন তিনি।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অধ্যাপক ড. ইমরান হোসেন ১৯৫২ সালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে যোগ দেন। পরে তিনি ইতিহাস বিভাগে যোগদান করেন। ২০১৮ সালে তিনি ইতিহাস বিভাগ থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি এই বিভাগে সুপারনিউমারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

অধ্যাপক ড. ভূঁইয়া ইকবাল

২২ জুলাই ভোর ৬ টায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে করোনা থেকে সুস্থ হয়ে অন্যান্য জটিলতায় মারা যান বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ভূঁইয়া ইকবাল।

কর্মজীবনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের পরিচালক ছিলেন। একই সাথে চালিয়ে যান গবেষণা, সম্পাদনা। তিনি বেশ কয়েকটি গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য ২০১৪ সালে অধ্যাপক ভূঁইয়া ইকবাল বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

অধ্যাপক এ আহাদ এম ওসমান গণি

১৬ জুলাই মালেশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের একটি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এ আহাদ এম ওসমান গণি। তিনি মালয়েশিয়াস্থ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি অব ইসলামিক ফিন্যান্সের ফ্যাকাল্টি মেম্বার, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ায় ডিন ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন।

অধ্যাপক ড. গাজী সালেহ উদ্দিন

৬ আগস্ট রাত আটটার দিকে ঢাকার গুলশানের শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সমাজতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. গাজী সালেহ উদ্দিন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. গাজী সালেহ উদ্দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের প্রগতিশীল বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ক্ষেত্রে তার লেখা বইয়ের তথ্যকে দালিলিক সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।

অধ্যাপক ড. আসমা সিরাজুদ্দীন

২১ ডিসেম্বর ভোরে নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত রোগে মারা গেছেন ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আসমা সিরাজুদ্দীন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বর্তমান চবি প্রফেসর ইমেরিটাস, একুশে পদকপ্রাপ্ত ও জাতীয় অধ্যাপক ড. আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনের সহধর্মিনী।

অধ্যাপক আসমা সিরাজুদ্দীন ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যোগদান করেন। ২০০২ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। তিনি অধ্যাপনার পাশাপাশি ইতিহাস বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি পাকিস্তানের পাঞ্জাবে।

অধ্যাপক ড. বিনয় কৃষ্ণ শর্মা

সম্প্রতি মারা গেছেন একাউন্টিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বিনয় কৃষ্ণ শর্মা। তবে তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

এছাড়া বিদায়ী বছরে সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাকসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। সবমিলিয়ে এক বছরে এতজনের মৃত্যু আগে কখনও দেখেনি চবি পরিবার।

এদিকে এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এতজন শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, শিক্ষক সমিতি, অফিসার সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন শোক জানিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান বলেন, ‘এক বছরে আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যাদের হারিয়েছি, তাদের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণে রাখবে।’

এমআইটি/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm