চট্টগ্রামে ব্রেন টিউমারের ভুল অপারেশন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও বিল বাবদ প্রতারণার মাধ্যমে ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক নিউরো সার্জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। চিকিৎসক ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে করা এ মামলায় আদালতের নির্দেশে তদন্তে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), যা দীর্ঘদিন চাপা থাকলেও তদন্ত শুরু হওয়ার পর প্রকাশ্যে আসে।
মামলার বাদী কক্সবাজারের চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের এসএম চর কাকারা গ্রামের আবুল কালামের ছেলে আরিফুল ইসলাম। তিনি গত ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিআর নম্বর-১৩৪৮/২০২৫, পাঁচলাইশ) মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক নিউরো সার্জন ডা. মো. ইসমাইল হোসেনকে আসামি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী বিশ্ব মিত্র বড়ুয়া।
মামলায় দণ্ডবিধির ২৬৯, ২৭০, ৪০৬, ৪২০, ৫০৬(২) ধারাসহ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫৩ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভিকটিম মাহাবুবুর রহমান (৫০) চকরিয়ার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের সিকলঘাট এলাকার একজন কৃষক। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা তাকে ডা. ইসমাইল হোসেনের কাছে পাঠান। এমআরআই ও সিটি স্ক্যান করার পর ওই চিকিৎসক ব্রেন টিউমার শনাক্ত করে জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে অপারেশন না করলে মৃত্যু হতে পারে। এতে রোগী ও তার পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হবে বলে জানানো হলে পরিবার জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে ৮ লাখ টাকা জোগাড় করে।
পরবর্তীতে ২৬ জুলাই ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিকে অভিযুক্ত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পরই রোগীকে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ল্যাবএইডে বিল বাবদ ৮৩ হাজার ৭০০ টাকা এবং অপারেশন ফি হিসেবে আরও ২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এরপর ২৭ জুলাই থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৯১৫ টাকা বিল পরিশোধের পর তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
ছাড়পত্রের সময় চিকিৎসক দাবি করেন, অপারেশন সফল হয়েছে এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু বাড়িতে নেওয়ার পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পুনরায় চিকিৎসকের কাছে গেলে তিন মাস পরে আসতে বলা হয়।
এরপর ২১ অক্টোবর রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বোর্ড জানায়, টিউমার আগের জায়গায়ই রয়েছে এবং আরও বড় হয়েছে। দ্রুত অপারেশনের সুপারিশ করা হয়। এ প্রতিবেদন নিয়ে পুনরায় ডা. ইসমাইল হোসেনের কাছে গেলে তিনি বাদীকে অপমান করে বের করে দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের দাবি, ভুল অপারেশন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও বিভিন্ন বিলের মাধ্যমে মোট ১৪ লাখ টাকা প্রতারণা করা হয়েছে। বর্তমানে রোগীর আবার অপারেশনের প্রয়োজন হলেও অর্থাভাবে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন। গত বছরের ৯ নভেম্বর রোগীর কাগজপত্র চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালে ডা. আনিসুর রহমানকে দেখানো হলে তিনিও রোগীকে ভর্তি করে অপারেশনের পরামর্শ দেন। তার মতে, আইসিইউতে চার দিন ও কেবিনে তিন দিন রেখে অপারেশন করতে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।
বাদী আরিফুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক কৌশলে ১৪ লাখ টাকা খরচ করিয়েছেন এবং টিউমার অপসারণের কথা বললেও তা সরানো হয়নি, বরং আগের চেয়ে বড় হয়েছে। তার আশা, তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হবে। ঘটনার শিকার মাহাবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার শারীরিক অবস্থার কারণে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. মো. ইসমাইল হোসেন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি রোগীপক্ষকে একাধিকবার বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা তা গ্রহণ করছে না এবং কোনো পক্ষ তাদের ভুলভাবে প্রভাবিত করছে। তার দাবি, রোগীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে যতটুকু টিউমার অপসারণ করা নিরাপদ, ততটুকুই করা হয়েছে। এর বেশি করলে জীবনঝুঁকি তৈরি হতো। তিনি আরও বলেন, অপসারিত অংশ থেকে বায়োপসির জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে এবং রোগী বর্তমানে জীবিত ও স্থিতিশীল আছেন। এ ধরনের অভিযোগ পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিষয়টি পিবিআই তদন্তাধীন থাকায় বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন নয় বলেও জানান তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চিঠি দিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে অপারেশন ও চিকিৎসা–সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে মতামত চাওয়া হয়েছে। বোর্ডের মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অপচিকিৎসা ও আইনি কাঠামো
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে অপচিকিৎসা বা চিকিৎসা অবহেলা একটি জটিল অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। চরম অবহেলা প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৪ (ক) ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। শারীরিক আঘাত বা যন্ত্রণার ক্ষেত্রে ৩৩৮ ও ৩৩৯ ধারায় শাস্তির বিধান আছে। প্রতারণা ও আস্থাভঙ্গের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ক্ষেত্রে ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড হতে পারে এবং ৫০৬(২) ধারায় ভয়ভীতি প্রদর্শনের শাস্তি নির্ধারিত আছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫৩ ধারায় স্বাস্থ্যসেবাকে ‘সেবা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কোনো চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠান রোগীকে প্রতারিত করলে বা মানহীন সেবা দিলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে ভোক্তা আদালতে ক্ষতিপূরণের জন্য রোগী বা তার উত্তরাধিকারীরা মামলা করতে পারেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের বিধান অনুযায়ী, কোনো চিকিৎসক অসদাচরণ বা চরম অবহেলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তার লাইসেন্স বাতিল বা সাময়িক স্থগিত করা যেতে পারে, যা ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া থেকে পৃথক। তবে ফৌজদারি মামলায় দোষ প্রমাণে মেডিকেল বোর্ডের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রমাণ জটিল হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিচারপ্রক্রিয়া ও প্রমাণের জটিলতার কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অভিযোগ দায়েরের প্রবণতা বেড়েছে।
জেজে/সিপি




