১৩ হাজার কর্মী চাকরি হারানোর পর এবার বন্ধ হলো এস আলমের সব কারখানা
‘আবার চালু করতে পারলে ফিরিয়ে আনব’
যে কারখানাগুলোর সাইরেনের শব্দে প্রতিদিন সকাল শুরু হতো হাজারও শ্রমিকের, সেখানে আজ নেমে এলো গভীর নীরবতা। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) নোটিশ বোর্ডে চাকরি হারানো শ্রমিক-কর্মচারীদের তালিকা টাঙানো হয়। দেখে অনেকেই চোখের পানি সামলাতে পারেননি। এর মাত্র এক দিন পর শুক্রবার (৩১ জুলাই) থেকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে এস আলম গ্রুপের সব কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে গত দুই বছরে গ্রুপটির ১৩ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারালেন।

বন্ধ হওয়া ১১টি কারখানার মধ্যে রয়েছে এস আলম স্টিলস, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস (এনওএফ), গ্যালকো স্টিলস, চেমন ইস্পাত, এস আলম সিমেন্ট, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, ইনফিনিটি সি আর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ এবং এস আলম ব্যাগ ম্যানুফ্যাকচারিং মিলস।
দুপুরে হঠাৎ নোটিশ, পরদিনই ছাঁটাই
বৃহস্পতিবার দুপুরে হঠাৎ করেই শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে কারখানার নোটিশ বোর্ডে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের নামের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়। নোটিশে বলা হয়, ‘ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসারে নিম্নলিখিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্ধ হওয়ার আগে এসব কারখানায় প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। সব মিলিয়ে গত দুই বছরে বিভিন্ন ধাপে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা ১৩ হাজারের বেশি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় সহস্রাধিক কর্মচারী রয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে আছেন।
গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক মাসে আরও কিছু কর্মচারী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। কারখানাগুলোর নিরাপত্তা তত্ত্বাবধানের জন্য সীমিতসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী রাখা হবে।
ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের সব ধরনের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যাঁরা গ্র্যাচুইটিসহ অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তাঁদের পাওনাও পরিশোধ করা হচ্ছে।
কান্নার মধ্যেও ফিরে আসার আশ্বাস
হঠাৎ কারখানা বন্ধ ও ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় অনেক শ্রমিক-কর্মচারী কান্নায় ভেঙে পড়েন। এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের এক কর্মচারী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ তাঁদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি যদি আবার কারখানা চালু করতে পারি, তাহলে আবার তোমাদের ফিরিয়ে আনবো।’
এলসি সংকটে উৎপাদন বন্ধ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত দুই বছরে এস আলম গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠান একটি এলসিও (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে পারেনি। কোনো ব্যাংক থেকেও তারা সহযোগিতা পায়নি। ফলে একের পর এক কারখানায় কাঁচামালের সংকট তৈরি হয়। একপর্যায়ে উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকার পরও কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে। বছরে দুই ঈদে সবাইকে বোনাসও দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংকট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোর দখল ও শেয়ার হারায় গ্রুপটি। এরপর তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং শুরু হয় বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক তদন্ত।
এস আলম ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা নামে-বেনামে বিদেশে পাচার এবং ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অন্যান্য সংস্থায় একাধিক মামলা ও অনুসন্ধান শুরু হয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের মূল সদস্যরা দেশ ছেড়ে সিঙ্গাপুর, দুবাই ও কানাডায় অবস্থান নেন। বর্তমানে তাঁরা আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে রয়েছেন।
সিপি




