১৩ অ্যান্টিবায়োটিকেও মিলছে না সাড়া, ১৭ দিনে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ৬০ শিশুর মৃত্যু

হামের পর ভয়ংকর সংক্রমণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। হাম, হাম–পরবর্তী নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় চিকিৎসা জটিল হয়ে উঠছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ও পেডিয়েট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) শুধু মে মাসের প্রথম ১৭ দিনেই মারা গেছে ৬০ শিশু। এর আগে গত এপ্রিল মাসে মৃত্যু হয়েছিল আরও ৯৫ শিশুর।

চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে আসা চট্টগ্রাম মেডিকেলের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন এক শিশুর রক্তের কালচার পরীক্ষার রিপোর্টে ‘Burkholderia cepacia’ নামের অ্যান্টিবায়োটিক–প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকেও জীবাণুটি কার্যকর সাড়া দিচ্ছে না।
চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে আসা চট্টগ্রাম মেডিকেলের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন এক শিশুর রক্তের কালচার পরীক্ষার রিপোর্টে ‘Burkholderia cepacia’ নামের অ্যান্টিবায়োটিক–প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকেও জীবাণুটি কার্যকর সাড়া দিচ্ছে না।

প্রতিদিনই মৃত্যু, বাড়ছে আতঙ্ক

রোববার (১৭ মে) একদিনেই মারা গেছে ছয় শিশু। এর মধ্যে চারজন পিআইসিইউতে এবং দুইজন জেনারেল ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল। হাসপাতাল সূত্র বলছে, মৃত শিশুদের বেশিরভাগই হাম, হামের উপসর্গ, হাম–পরবর্তী নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। প্রতিদিনই পিআইসিইউতে দুই থেকে তিনজন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।

১৩ অ্যান্টিবায়োটিকেও মিলছে না সাড়া, ১৭ দিনে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ৬০ শিশুর মৃত্যু 1

চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অনেক জীবাণু ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর অনেক শিশুর শরীরে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। পিআইসিইউতে থাকা শিশুদের মধ্যে ভেন্টিলেটর বা ক্যানুলার মাধ্যমেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের ভাষ্য, সংক্রমণের একটি অংশ হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে।

১৩ অ্যান্টিবায়োটিকেও মিলছে না সাড়া, ১৭ দিনে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ৬০ শিশুর মৃত্যু 2

হামের পর বাড়ছে জটিলতা

চিকিৎসকদের মতে, হাম থেকে সেরে ওঠা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। এতে নিউমোনিয়া, খিঁচুনি, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট ও কাশি, কর্নিয়া ঝাপসা হয়ে যাওয়া, এমনকি ঘা সৃষ্টি হয়ে অন্ধত্বের ঝুঁকিও তৈরি হয়। পাশাপাশি স্নায়ুবিক জটিলতাসহ অন্যান্য সংক্রমণের আশঙ্কা বেড়ে যায়।

তাঁরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। জীবাণু কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে যেতে পারে, ভুল অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ হতে পারে কিংবা সংক্রমণ অতিরিক্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। রোগীর শরীর দুর্বল বা রোগ জটিল অবস্থায় থাকলেও ওষুধ কাজ নাও করতে পারে। আবার পূর্ণ কোর্স শেষ না করলেও জীবাণু আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ কারণে রোগীর রক্ত, কফ বা প্রসাবের কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্ট করে পরে শক্তিশালী বা ভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে।

একই অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন ব্যবহারে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলে সেপসিস বা রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে বলেও জানান চিকিৎসকেরা। তখন অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন ও অন্যান্য সাপোর্ট চালু রেখে অ্যান্টিবায়োটিক পরিবর্তন বা একাধিক ওষুধ ব্যবহার করতে হয়।

২০ শয্যার পিআইসিইউতে ২০ শিশুই সংকটাপন্ন

চট্টগ্রাম মেডিকেলের পিআইসিইউতে বর্তমানে ২০টি শয্যা রয়েছে। সেখানে চিকিৎসাধীন ২০ শিশুর অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. ধীমান চৌধুরী। তিনি বলেন, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পিআইসিইউতে ‘হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা’র সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। হাম–পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের বেশি অক্সিজেন প্রয়োজন হওয়ায় তাদের হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা দিতে হচ্ছে। কিন্তু ২০ শয্যার পিআইসিইউতে ক্যানুলা রয়েছে মাত্র ১২টি।

১১ হাজার টাকার ক্যানুলা কিনে ফিরে দেখেন মেয়ে নেই

পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল কক্সবাজার সদরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমের নয় মাস বয়সী মেয়ে সুরাইয়া। হামে আক্রান্ত হলে তাকে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে হামের জটিলতা থেকে তার মস্তিষ্কে প্রদাহ দেখা দেয়, যাকে চিকিৎসকেরা ‘মিজেলস এনসেফালাইটিস’ বলেন। এ ধরনের রোগীদের চিকিৎসায় হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে সেটি সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। পরে সুরাইয়ার বাবাকে বাইরে থেকে ক্যানুলা কিনে আনতে বলা হয়। তিনি ১১ হাজার টাকা দিয়ে সেটি কিনে হাসপাতালে ফিরে এসে দেখেন, তাঁর মেয়ে আর বেঁচে নেই।

কালচার রিপোর্টে মিলল ‘রেজিস্ট্যান্ট’ ব্যাকটেরিয়া

এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেলের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন এক শিশুর রক্তের কালচার পরীক্ষার একটি রিপোর্ট হাতে পেয়েছে চট্টগ্রাম প্রতিদিন। ‘এপিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’ করা ওই রিপোর্টে দেখা গেছে, ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পরীক্ষার পর রক্তে ‘Burkholderia cepacia’ নামের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কালচার কন্ডিশনে উল্লেখ করা হয়েছে, অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশে জীবাণুর বৃদ্ধি ঘটেছে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, Piperacillin/Tazobactam, Amikacin, Gentamicin, Ciprofloxacin, Minocycline, Imipenem, Meropenem, Trimethoprim ও Sulfamethoxazoleসহ একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুটি প্রতিরোধী। এছাড়া Ceftazidime, Cefoperazone/Sulbactam, Cefepime ও Aztreonamও কার্যকর নাও হতে পারে। তবে Levofloxacin ওষুধটি আংশিক কাজ করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কখন নিতে হয় পিআইসিইউতে

শিশুকে কখন পিআইসিইউতে নেওয়া হয় জানতে চাইলে ডা. ধীমান চৌধুরী বলেন, গ্লাসকো কোমা স্কেল বা জিসিএসের মাধ্যমে রোগীর চেতনার স্তর পরিমাপ করা হয়। এই স্কেলের মান ৩ থেকে ১৫ পর্যন্ত। একজন মৃত মানুষের জিসিএস ৩ এবং পুরোপুরি সুস্থ মানুষের ১৫। জিসিএস ৮–এর নিচে নেমে গেলে রোগীকে পিআইসিইউতে নিতে হয়।

তিনি আরও বলেন, গুলেন–বারি সিনড্রোম বা জিবিএস একটি বিরল স্নায়বিক রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। এতে পেশি দুর্বলতা, ঝিনঝিন ভাব এবং গুরুতর ক্ষেত্রে পক্ষাঘাত পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত কোনো সংক্রমণের পর এ রোগ শুরু হয়। হাত–পা থেকে দুর্বলতা শুরু হয়ে দ্রুত ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

ডিজে/সিপি

ksrm