s alam cement
আক্রান্ত
১০২৩১৪
সুস্থ
৮৬৮৫৬
মৃত্যু
১৩২৮

১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যার বিচার ১৮ বছরেও হয়নি, বিচার বিলম্বিত কৌশলে

0

দেশ-বিদেশে আলোচিত বাঁশখালীর সাধনপুর গ্রামের শীলপাড়ায় ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যার ১৮ বছর পূর্ণ হলেও মামলার সাক্ষ্য কাজও সম্পন্ন করা যায়নি। মামলার ৩৯ আসামির ৩৭ জনই জামিনে ও পলাতক থেকে বাদি ও সাক্ষীদের হুমকি দিচ্ছে অবিরত। মামলার বাদি পল্লী চিকিৎসক বিমল শীল পল্লী ছেড়ে ভয়ে ঘটনাস্থল থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম শহরে থাকছেন নানা আর্থিক সংকটে। ২০০৩ সালে ১৮ নভেম্বর ঘটনার পর সাধনপুর শীল পাড়ায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন হলেও চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে ওই পুলিশ ক্যাম্পটিও অজ্ঞাত কারণে কর্তৃপক্ষ উঠিয়ে নিয়েছে। ফলে নারী-পুরুষ সবাই প্রতিনিয়ত আতংকে দিনাতিপাত করছে।

এমনকি ২০১৮ সালের ২৩ জুন হাইকোর্ট এই চাঞ্চল্যকর মামলা দ্রুত নিস্পত্তির জন্য চট্টগ্রাম জজ আদালতকে নির্দেশ দিলেও পলাতক ও জামিনে থাকা আসামিরা কৌশলে মামলার বিচারকাজে বিলম্ব ঘটাচ্ছে। মামলার বাদি বিমল শীল আদালতে ঘুরে ঘুরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার পর পর ওই সময় এলাকাবাসীর মুখে মুখে চাওর হয় এবং বাদিপক্ষের অভিযোগ ওঠে মূল হত্যাকারী কালীপুর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান চৌধুরী। কিন্তু ওই সময় তার চাচাতো ভাই জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বাঁশখালীর এমপি এবং তৎকালীন সরকারের বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এ কারণে বাদি বিমল শীল এজাহারে আমিনুর রহমান চৌধুরীকে আসামি দিলেও পুলিশ চার্জশিটে আমিনুর রহমান র্চৌধুরীর নাম বাদ দেন। এভাবে বাদির চার্জশিটে নারাজি এবং পুলিশের মূলহোতাকে বাদ দিয়ে তৃতীয় বার পর্যন্ত চার্জশিট প্রদানের ঘটনা ঘটে। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে অধিকতর তদন্তে সিআইডি সর্বশেষ চতুর্থ দফায় ২০১১ সালের ৯ জানুয়ারি আমিনুর রহমান চৌধুরীসহ ৩৯ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয়। এর কিছুদিন পর আদালত চার্জশিট গ্রহণ করলে আমিনুর রহমান চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। তিনি জামিনে এসে হাইকোর্টে রিট করে মামলা স্থগিত করে দেন। এভাবে অন্তত ৩ বছর মামলার গতি স্তব্ধ হয়ে যায়।

নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে নিহতদের শ্রদ্ধা জানান বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরীসহ মামলার বাদি বিমল শীল ও তার স্বজনরা।
নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে নিহতদের শ্রদ্ধা জানান বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরীসহ মামলার বাদি বিমল শীল ও তার স্বজনরা।

পরে বাদিপক্ষ হাইকোর্টে নানাভাবে শুনানিতে অংশ নিলে হাইকোর্ট ২০১৮ সালে ২৩ জুন আসামি আমিনুর রহমান চৌধুরীর রিট আদেশ বাতিল করে চট্টগ্রাম জজ আদালতকে মামলাটি দ্রুত নিস্পত্তির আদেশ দেন। এই আদেশও যাতে দ্রুত কার্যকর না হয়, সেজন্য বাদি ও সাক্ষীকে আসামিরা জামিনে ও পলাতক থেকে প্রকাশ্যে হুমকি ধমকি দিচ্ছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ফেরদৌস ওয়াহিদের আদালতে মামলাটির বিচারকাজ চলছে বর্তমানে। বাদি বিমল শীলের মামলায় আলোচিত চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আমিনুর রহমান চৌধুরীসহ ৩৯ জন আসামি। এসব আসামির মধ্যে ১৯ জন আসামি পলাতক, ১৮ জন আসামি জামিনে এবং ২ জন কারাগারে আছেন। মামলার ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আবার সাক্ষীর তারিখ ধার্য করা হয়েছে ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব পালনকারী ভারপ্রাপ্ত জেলা পিপি এডভোকেট লোকমান হোসেন বলেন, মামলাটিতে ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে আদালতে। আগামী বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে। সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ সম্পন্ন না হলে মামলাটি বিচারকার্য শেষ করতে আরও সময় লাগবে।

মামলার সাক্ষী দেলোয়ার হোসেন ও হোসনে আরা বলেন, আসামিদের হুমকি-ধমকিতে নানা আতঙ্কে আছি। ওই মামলায় সাক্ষী হওয়ার পর থেকে আমাদের নানাভাবে যে ক্ষতি হয়েছে তা কাউকে বোঝাতে পারছি না।

২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর মধ্যরাতে বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নের শীলপাড়ায় খুনিরা প্রবেশ করে। বিশাল দোতলা মাটির তৈরি বাড়ির চারিদিকে অন্তত ৮টি দরজার বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে উল্লাস করে। ওই দৃশ্য দেখে মামলার বাদি বিমল শীল দোতলার জানালা ভেঙে কৌশলে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। খুনিরা পালিয়ে গেলে ভোররাতে নিস্তব্ধ বাড়িতে বিমল শীল দেখতে পান তার বাবা তেজেন্দ্র লাল শীল (৭০), মা বকুল শীল (৬০), ভাই অনিল শীল (৪০), অনিলের স্ত্রী স্মৃতি শীল (৩২) এবং অনিলের তিন সন্তান রুমি শীল (১২), সোনিয়া শীল (৭), চার দিন বয়সী কার্তিক শীল,বিমল শীলের চাচাতো বোন বাবুটি শীল (২৫), প্রসাদি শীল (১৭), এনি শীল (৭) এবং কক্সবাজার থেকে বেড়াতে আসা তার মাসি দেবেন্দ্র শীল (৭২) পুড়ে অঙ্গার হয়ে আছেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার (১৮ নভেম্বর) দুপুরে ১৮ বছর পূর্তির দিন নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে নিহতদের শ্রদ্ধা জানান বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুজ্জামান চৌধুরী। ওই সময় সাথে ছিলেন মামলার বাদি বিমল শীল ও তার স্বজনরা।

মামলার বাদি বিমল শীল বলেন, ১১ স্বজনকে পুড়িয়ে হত্যার পর বিচার পাবার আশায় খুনিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলাম। কিন্তু বিচারের কোন পথই পাচ্ছি না। ১৮ বছর শুধুই আদালতে দৌড়লাম। ১৮ বছর ভয়ে বাড়িতেই থাকতে পারছি না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৩ সালে বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকা অবস্থায় হত্যার ঘটনা দেখতে এসেছিলেন এবং তিনি খুনিদের বিচার চেয়েছিলেন নিজেই। আমাদের সান্ত্বনাও দিয়েছিলেন। এখন তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরছে। ওই সময় একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হলেও পুলিশ ক্যাম্পটি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে উঠিয়ে নিয়েছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে খুনিদের বিচার ও আমাদের নিরাপত্তা চাই।

সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) হুমায়ন কবির বলেন, পুলিশ ফাঁড়িটি পুলিশ স্বল্পতায় উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে প্রতি রাতে রামদাস পুলিশ ক্যাম্প থেকে ৫ জন পুলিশ ওখানে পাঠানো হয়।

বিএনপি নেতা ও সাবেক কালীপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমি ১১জন নিহত হওয়া স্বজনদের পরের দিন সহযোগিতা করেছিলাম। ওই ঘটনায় আমি জড়িত নই। রাজনৈতিক কারণে ২০০৩ সালের ঘটনায় ২০১১ সালে আমাকে চতুর্থবার দেওয়া চার্জশিটে আসামি করা হয়েছে। তাই আমি হাইকোর্টে শুধুমাত্র আমার বিচারকার্য স্থগিত করেছিলাম। পুরো মামলা স্থগিত করিনি।

সিপি

ManaratResponsive

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm