১০ হাজার কোটির বাণিজ্য থমকে দিয়ে মধ্যরাতে চট্টগ্রাম বন্দরের ধর্মঘট স্থগিত ঘোষণা

টানা সাত দিন দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত অচল করে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আটকে দেওয়ার পর মধ্যরাতে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিপন্থী চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইস্যু ঘিরে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, কনটেইনার পরিবহন ও ডেলিভারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে আমদানি–রপ্তানির পুরো শৃঙ্খলে।

এর আগে সর্বশেষ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিএনপিপন্থী শ্রমিক–কর্মচারীরা বন্দরের তিনটি টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে পণ্য ওঠানামাসহ প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এতে কার্যত অচল হয়ে যায় বন্দর। সকাল থেকে প্রধান জেটিতে থাকা ১২টি জাহাজ ও বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ ৮০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে খালাস বন্ধ ছিল। কনটেইনার পরিবহন ও ডেলিভারি কার্যক্রম থেমে যায়। বন্দরের ভেতরে কোনো ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনের যানবাহন ঢুকতে দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে অন্তত ৪০ হাজার কনটেইনার ইয়ার্ডে আটকা পড়ে।

মধ্যরাতে বিজ্ঞপ্তি, ধর্মঘট স্থগিত

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ১টার দিকে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে আসে আন্দোলনকারীদের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি। অজ্ঞাত স্থান থেকে বিএনপিপন্থী চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের দুই সমন্বয়ক মো. হুমায়ূন কবীর ও মো. ইব্রাহীম খোকনের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি নিয়ে উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এবং বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সাংবাদিকদের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী বর্তমান সরকারের আমলে এনসিটি চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সন্তোষজনক আলোচনার প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য রিলিজের স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ধর্মঘট কর্মসূচি ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পাঁচ কর্মচারীকে গ্রেপ্তার ও হয়রানিমূলক মামলা, ১৫ কর্মচারীকে বিভিন্ন বন্দরে বদলি, আন্দোলনরত কর্মচারীদের শাস্তি, বাসা বরাদ্দ বাতিল এবং ১৬ কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্তসহ যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব সমস্যার সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

এনসিটি ইস্যুতে আন্দোলন

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলসহ চার দফা দাবিতে এই কর্মসূচি দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কাজ বন্ধ রাখেন শ্রমিকেরা। পরে গত মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হলে বন্দরের কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

বৃহস্পতিবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নৌপরিবহন উপদেষ্টার বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করা হয়। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। এর পরপরই রোববার থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা আসে।

বন্দর সচল রাখতে হার্ডলাইনে সরকার

রমজান সামনে রেখে চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘটকে ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি করার চেষ্টা বলে মন্তব্য করেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পোর্টের কর্মচারীরাই অচলাবস্থা তৈরি করছে এবং নির্বাচনকে লক্ষ্য করেই এটি করা হচ্ছে। মানুষ ভোগান্তিতে পড়লে মানুষই বুঝবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি ফেবারেবল হলে সরকার করবে।

তিনি বলেন, কিছু লোক চট্টগ্রাম বন্দরকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে। তবে বন্দর সচল রাখতে সরকার হার্ডলাইনে আছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নৌপরিবহন উপদেষ্টা আরও বলেন, রমজান উপলক্ষে ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি করতেই এ ধর্মঘট চলছে। আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো মানার মতো নয়। রমজান সামনে রেখে যেকোনো মূল্যে চট্টগ্রাম বন্দর সচল রাখা হবে। চুক্তির বিষয়ে আরও সময় চেয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। নির্বাচনের পরেও এ বিষয়ে আলোচনা চলবে।

‘বন্দর হাইজ্যাক করা হয়েছে’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বন্দর ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিক্ষোভের ব্যানারে একাংশ কর্মচারী বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত করে কার্যত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি ‘হাইজ্যাক’ করেছে এবং জনস্বার্থকে জিম্মি করে রেখেছে।

তিনি বলেন, চলমান আন্দোলন এমন একটি প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা, যা এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যারা এসব করছে তারা রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং রমজানের আগে জনমনে অসন্তোষ তৈরির পরিকল্পনা করছে।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দর পরিচালনার প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনো কোনো চুক্তি সই হয়নি। আইনি ও প্রক্রিয়াগত ধাপ শেষ না হলে কোনো চুক্তি কার্যকর হবে না। আদালতের নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চেয়ারম্যান আরও বলেন, বন্দর সচল আছে। তিনি দুই ঘণ্টা ধরে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সবাই কাজে যাবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।

বন্দর অচলের নেপথ্যে ১৫ জন

সাধারণ শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করার নেপথ্যে মোট ১৫ শ্রমিক নেতা রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের, কেউ বন্দর শ্রমিক দলের সঙ্গে যুক্ত। তালিকায় রয়েছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবীর এবং পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন। দুজনই চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক।

এ ছাড়া রয়েছেন পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মো. শফি উদ্দিন ও রাশেদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনোটাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার মো. হুমায়ুন কবীর, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী ও খালাসি মো. রাব্বানী।

তালিকায় আরও আছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া পরিবহন বিভাগের এফসিএল শাখার উচ্চ বহিঃসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি, প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামশু মিয়া এবং যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার আমিনুর রসুল বুলবুল।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

ধর্মঘটের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে উদ্যোগ নিতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে খোলা চিঠি দিয়েছে চার ব্যবসায়ী সংগঠন। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) পাঠানো ওই চিঠিতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন উদ্বেগ জানায়।

চিঠিতে বলা হয়, বন্দরের বহির্নোঙরে বার্থিং ও পণ্য খালাস বন্ধের ঘোষণায় পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের ৯৯ শতাংশ কনটেইনার ও ৭৮ শতাংশ সমুদ্রপথের বাণিজ্য এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হলে তৈরি পোশাকসহ সব প্রধান খাত অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।

রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল খালাস না হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যা দ্রব্যমূল্য বাড়াবে। জাহাজ জট ও কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আমদানিকারকদের প্রতিদিন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ডেমারেজ চার্জ দিতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

সিপি

ksrm