১০ কোটি চেয়ে দুই মাস ধরে শিল্পপতিকে ফোন দিচ্ছিলেন ‘বড় সাজ্জাদ’, না পেয়ে মুহুর্মুহু গুলি

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ত এক সড়কে ভোরের আলো ফোটার আগেই গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার (২ জানুয়ারি) সকাল সাতটার দিকে চকবাজার থানাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা সড়কের চন্দনপুরা এলাকায় বাঁশখালীর সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় মুখোশধারী আট অস্ত্রধারী। ২০ থেকে ২২ রাউন্ড গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। হামলাকারীরা পিস্তল উঁচিয়ে নির্বিচারে গুলি চালালেও সাবেক সংসদ সদস্য কিংবা তার পরিবারের কোনো সদস্য এতে হতাহত হননি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির পর না পেয়ে এই হামলা।

চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরায় শিল্পপতি মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের এই বাড়িটিকে লক্ষ্য করেই গুলি ছোঁড়া হয়।
চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরায় শিল্পপতি মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের এই বাড়িটিকে লক্ষ্য করেই গুলি ছোঁড়া হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত চন্দনপুরার সেই বাড়িতে পৌঁছায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশসহ দক্ষিণ জোনের একাধিক পুলিশ টিম। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া এবং চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার মো. তারিকুল ইসলাম এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান বিএম কন্টেইনার ডিপোর মালিক এবং স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদকের পদেও রয়েছেন। এছাড়া তিনি স্থানীয় দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদক।

চাঁদাবাজির জেরে হামলা

প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ ধারণা করছে, বড় অঙ্কের চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে সাবেক সংসদ সদস্যের মুঠোফোনে এসএমএসের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। সেই দাবি পূরণ না হওয়াতেই সন্ত্রাসীরা ভয় দেখাতে এই হামলা চালিয়েছে বলে পুলিশের ধারণা।

ভিকটিম মজিবুর রহমানের পরিবারের একজন সদস্য জানান, প্রায় দেড় মাস আগে বড় সাজ্জাদের পরিচয় দিয়ে একটি বিদেশি নম্বর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সেই সময় বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও শুক্রবার ভোরে তারা যখন ঘুমে ছিলেন, তখনই বাড়ির সামনে ও পেছনে বন্দুকধারীরা গুলি চালায়।

মুজিবুর রহমানের পারিবারিক একটি সূত্র চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানায়, সদ্য গত নভেম্বরের শেষ দিকে দুবাইয়ের বিভিন্ন নাম্বার থেকে ‘সাজ্জাদ’ পরিচয় দিয়ে মুজিবের কাছে ফোন করে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হতে থাকে। ডিসেম্বরের শুরুতে অপর একটি বিদেশি নাম্বার থেকে এসএমএস দেওয়া হয় মুজিবকে। ওই এসএমএসে ‘সাজ্জাদ’ হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আপনাকে বারবার বলার পরও টাকা দিচ্ছেন না। আপনি কি মরতে চান?’

পারিবারিক ওই সূত্র জানায়, সাজ্জাদের হুমকির মুখে মুজিব ও তার পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ঢাকা থেকে অন্তত ছয়জন গানম্যান নিয়োগ করা হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল

হামলাকারীদের গতিবিধি ও পোশাকের বর্ণনা সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পাঁচজন সন্ত্রাসী একযোগে গুলি চালাচ্ছে। সকাল ৭টা ২৪ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে তারা বাড়ির সামনে অবস্থান নেয়। এর আগে তারা গলির ভেতর কিছুক্ষণ পায়চারি করে এবং ফোনে কথা বলে। গলির ভেতর থেকে একজন ব্যক্তি মূল সড়কের দিকে বের হওয়ার পরপরই তারা হামলা শুরু করে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গুলির আগে দুজন সন্ত্রাসী ফোনে কথা বলছিল এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেই তারা পিস্তল বের করে হামলা চালায়।

সন্ত্রাসীদের পরনে থাকা পোশাকের বর্ণনায় দেখা গেছে, দুজন কালো লং হাতার জ্যাকেট ও কেডস পরেছিলেন। অন্য দুজনের পরনে ছিল নীল এবং ক্রিম রঙের জ্যাকেট। এই দলের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিটি বারবার ফোনে কথা বলছিলেন এবং তার পরনে ছিল লং হাতার কালো পোশাক, মাথায় টুপি, বুকে সাদা দাগযুক্ত পোশাক এবং পায়ে সাদা কেডস। গুলিবর্ষণের আগে তিনজন সন্ত্রাসী গেটের সামনে মহড়া দেয় এবং ওপরের দিকে তাকিয়ে ফোনে কথা বলতে থাকে। তাদের মধ্যে একজনের মুখে সাদা মাস্ক এবং অন্য একজনের মুখে কালো মাস্ক ছিল। হামলা শেষে সন্ত্রাসীরা একটি সাদা রঙের নোহা গাড়িতে চড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

বড় সাজ্জাদের কাজ

উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া জানিয়েছেন, সন্ত্রাসীরা মূলত ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বাড়ির সামনে ও পেছনে গুলিবর্ষণ করেছে। তাদের তদন্তে উঠে এসেছে যে, হামলায় অন্তত আটজন মুখোশধারী অংশ নিয়েছিল। পুলিশের সন্দেহ, এই হামলার পেছনে কুখ্যাত সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা জড়িত থাকতে পারে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের এক পরিচিত নাম। ২০০০ সালে বহদ্দারহাটে আটজন নিহতের সেই আলোচিত মাল্টিপল শুটিং মামলায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন। ওই মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। এরপর থেকেই তিনি বিদেশে বসে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিশাল সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং তার নাম ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছে।

জনমনে আতঙ্ক

দীর্ঘ দুই দশক ধরে সাজ্জাদ আলীর বাহিনী নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী ও রাউজান এলাকায় চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এই এলাকায় অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। কখনো আধিপত্য বিস্তার, আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবে তারা এসব অপরাধ সংঘটন করছে। মূলত চাঁদা না দিলেই গুলি চালানো এই বাহিনীর পুরনো কৌশল। বর্তমান ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

জেজে/সিপি

ksrm