হাম আর নিউমোনিয়ায় কাঁদছে চট্টগ্রাম মেডিকেলের শিশু ওয়ার্ড, ২ মাসে ১৬০ শিশুর মৃত্যু

মজুদের পরও মিলছে না ওষুধ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মাত্র দুই মাসে হাম, হাম উপসর্গ এবং হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় ১৬০ শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তুলেছে। দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে রোগীর চাপ। ওয়ার্ডের বেডে জায়গা না থাকায় একটি বেডে একজনের পরিবর্তে তিনজন করে শিশু রাখা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেই দেখা দিয়েছে ওষুধ সংকট। হাসপাতালের স্টোরে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার দাবি থাকলেও রোগীর স্বজনদের ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।

হাম আর নিউমোনিয়ায় কাঁদছে চট্টগ্রাম মেডিকেলের শিশু ওয়ার্ড, ২ মাসে ১৬০ শিশুর মৃত্যু 1

চিকিৎসকেরা জানান, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে দ্বিগুণ সময় লাগছে। এসব রোগীর ক্ষেত্রে ৬০ লিটার পর্যন্ত হাইফ্লো ন্যাজেল ক্যানেলা দিতে হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি প্রয়োজন হচ্ছে। নার্সদের ভাষ্য, সীমিত লোকবল নিয়ে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের জেনারেল পেডিয়াট্রিকের তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারিতে ৬৫ জন ও ফেব্রুয়ারিতে ৬০ জন ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় মারা যায়। মার্চে ৭০ জন এবং এপ্রিলে ৯০ জন হাম উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন রোগে ১১৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ৯২০ জনের তুলনায় বেশি।

ভিড়ে ঠাসা ওয়ার্ড

রোববার (৩ এপ্রিল) ভোর ৫টা পর্যন্ত শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ১৯৯ জন রোগী। দুপুর দেড়টার মধ্যে আরও ৫০ জন ভর্তি হয়, যা দিন শেষে প্রায় ৩০০ ছাড়ায় বলে জানান স্টাফ নার্স ইনচার্জ সাহনাজ বেগম। হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের প্রথমে সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি করে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পর নিচতলার আলাদা হাম ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। ওই দিন ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ৭৫ জন হাম রোগী চিকিৎসাধীন ছিল, যাদের মধ্যে ১৪ জনকে বিকেলে অন্য ওয়ার্ডে স্থানান্তরের কথা ছিল।

৮ ও ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া, হাম, ডায়রিয়া ও ব্রেইন ইনফেকশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। আগে ভর্তির দিনে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী আসলেও এখন তা ১০০ ছাড়িয়েছে।

৯ মাস বয়সী মো. সালমান প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়, পরে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে এবং পিআইসিইউতে নেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি হলে ওয়ার্ডে ফেরত আনার পর তার শরীরে হাম দেখা দেয়। ২ মাস ৫ দিনের সাইফাত হোসেন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২২ এপ্রিল ভর্তি হয়েছে, তার নাকে অক্সিজেনের নল লাগানো। ১১ মাস বয়সী তাবাসসুমকে তিন দিন আগে কক্সবাজারের পেকুয়া থেকে আনা হয়েছে নিউমোনিয়া নিয়ে।

অপুষ্টি আর ঝুঁকি

ওয়ার্ডে দেখা গেছে, অধিকাংশ আক্রান্ত শিশুই আন্ডার-ওয়েট এবং অপুষ্টিতে ভুগছে। ৮ মাস ১২ দিনের রুমাইদা প্রথমে হাম, পরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। তার শরীরে অপুষ্টির চিহ্ন স্পষ্ট, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এমন অসংখ্য শিশুর দেখা মিলেছে, যারা হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় ভুগছে।

এক বেডে তিন শিশু

সিট সংকট এতটাই তীব্র যে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে একটি বেডে তিন শিশু ও তাদের মায়েরা মিলিয়ে ৬ থেকে ৭ জন অবস্থান করছে। কুমিল্লা থেকে আসা ৬ মাস বয়সী আরিশা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। একই বেডে থাকা অন্য দুই শিশুও নিউমোনিয়ায় ভুগছে। ১ মাস বয়সী মাহাদীর খিঁচুনি ও জ্বর রয়েছে বলে জানান তার বাবা মাসুদ। ১১ মাস বয়সী ইসরাত জাহানও খিঁচুনি নিয়ে ভর্তি হয়েছে।

একাধিক শিশু পুনরায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছে। ফেনীর ১০ মাস বয়সী জান্নাতুল মাওয়ার মা বিবি ফাতেমা জানান, গত সপ্তাহে বাড়ি নেওয়ার পর আবার অসুস্থ হয়ে শুক্রবার পুনরায় ভর্তি করাতে হয়েছে।

নিচতলার ১ নম্বর ক্যাজুয়ালিটির হাম ওয়ার্ডে ভর্তি আছে ৬৭ জন রোগী। রোববার সেখানে ৩ জন ভর্তি হয়েছে এবং একজনকে পিআইসিইউতে পাঠানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নার্স জানান, এই ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ডাক্তার আসেন না, লোকবলও কম। তিন শিফটে ১২ জন নার্স দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে, যা অপ্রতুল।

মজুদ থাকলেও ওষুধ সংকট

স্টোরে ওষুধ থাকার তালিকা থাকলেও তা রোগীদের দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ। বেবি স্যালাইনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। স্টোরে থাকা তালিকায় বিভিন্ন ধরনের ক্যানোলা, স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক, ইনজেকশনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধের নাম রয়েছে।

স্টাফ নার্স সাহনাজ বেগম জানান, সোমবার চাহিদা অনুযায়ী Meropenem পাওয়া যায়নি। সীমিত পরিমাণে কিছু ওষুধ পাওয়া গেছে, যা রোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (স্টোর) ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘জরুরি মিটিং করে হাম ও নিউমোনিয়ার এই সময়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ আছে, সরবরাহের চেষ্টা চলছে। এটি একটি দুর্যোগকালীন সময়।’

তবে রোগীর স্বজনদের বক্তব্য ভিন্ন। পিআইসিইউতে ভর্তি আহনাফের বাবা আহাদ উদ্দিন বলেন, ছয় দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, যা বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ওষুধ পাচারের অভিযোগ

হাসপাতালের স্টোর থেকে প্রতিদিন হাতব্যাগে করে ওষুধ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। কর্মচারীদের বের হওয়ার সময় কোনো তল্লাশির ব্যবস্থা নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব ওষুধ বাইরে বিক্রি করা হচ্ছে।

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘প্রতিদিন স্রোতের মতো রোগী আসছে। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় কাউকে ফেরানো যাচ্ছে না। সিট, ডাক্তার ও ওষুধ—সবকিছুতেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

পিআইসিইউর দায়িত্বরত ডা. ধীমান চৌধুরী জানান, ২০টি সিটের মধ্যে ১৫টি হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত। বাকি ৫টিতে অন্যান্য রোগী রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘদিন পিআইসিইউতে রাখতে হচ্ছে। ফলে অন্য রোগীরা সিট পাচ্ছে না।’ তিনি আরও জানান, সাধারণ নিউমোনিয়ায় যেখানে ৫ থেকে ৭ দিন লাগে, সেখানে হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় দ্বিগুণ সময় প্রয়োজন হচ্ছে।

ডিজে/সিপি

ksrm