স্মৃতিতে রমা চৌধুরী: পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া

0

১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা আমৃত্যু সংগ্রামী মহিয়সী নারী রমা চৌধুরী ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। বলা হয়ে থাকে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জনকারী নারী রমা চৌধুরী। তাঁর লিখিত ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৩ মে ভোরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তিনি নিজ বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন যাবৎ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানান জটিল রোগে ভোগা রমা চৌধুরী ৭৬ বছর বয়সে ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সোমবার ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

‘রোম যখন পুড়ছিল নিরো নাকি তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল’। আমার স্ত্রী যখন লেবার রুমে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, আমি তখন দিদির (রমা চৌধুরী) জন্য রান্না করছি!

দুই হাজার সাত সালে আমার মেয়ে তিতলি যখন জন্ম নেয়, ওর মা রিমঝিম যখন সন্তান জন্ম দেয়ার ধকল সইতে না পেরে খিঁচুনি দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে লেবার রুমে পড়ে আছে দশ ঘন্টা যাবৎ। তখন আমি দিদির জন্য রান্না করছি, দিদির রুমে। বিড়ালদের খাওয়াচ্ছি। দিদির সেবা যেমন করছি, সাথে দিদির একমাত্র জীবিত ছেলে জহরও তখন অসুস্থ অবস্থায় মায়ের রুমে, তাকেও শুশ্রূষা করছি। আবার দৌড়ে দৌড়ে মেটারনিটি হাসপাতালে যাওয়া আসা করছি।

দিদির রুম চেরাগি পাহাড় আর জেমিসন মেটারনিটি আন্দরকিল্লায়, হাঁটা দূরত্বে। ডাক্তার একদিকে মেয়ে জন্মাবার খুশির খবর দেয়, অন্যদিকে সন্তানের মা রিমঝিমের কন্ডিশন ক্রিটিক্যাল বলে জানায়। নরমাল ডেলিভারি হওয়ার পরপরই রিমঝিমের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমি কিছুক্ষণ এদিকে, কিছুক্ষণ ওইদিকে ছুটছি। আমার মা বাবা কেউ নেই, রিমঝিমেরও একই অবস্থা। আত্মীয়স্বজন দুই একজন যারা আছেন, তারা কেউ এসে তখনও পৌঁছায়নি। ‘রোম যখন পুড়ছিল নিরো নাকি তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল’! আমার স্ত্রী যখন লেবার রুমে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, আমি তখন দিদির জন্য রান্না করছি। আমি এই ঘটনা কখনো ওদের বলিনি। ওরা আজ এটা জেনে আমাকে ক্ষমা করবে তো? ক্ষমা না করাই উচিৎ। এমন সংসারী হয়েও সন্যাসীর কোন ক্ষমা হয় না।

ত্রিশ আগস্ট ভোরের আলো ফুটবে ফুটবে করছে। সেই সময় রিমঝিমের লেবার পেইন শুরু হয়। আমি তখন দিদির ওখানে আবার মোমিন রোড ঝাউতলায় আমার বাসায় পালা করে থাকি। রিমঝিম প্রেগন্যান্ট অবস্থায় অধিকাংশ সময়েই ছিলো অসুস্থ, দুর্বল। খাওয়া দাওয়া একেবারেই করতে পারতো না। দুই তিনবার ডাক্তার ডেকে বাসায় স্যালাইন দিতে হয়েছে। এর মধ্যেও সংসারের টানাপোড়েনে চাকরি করতে হচ্ছে ওর। ও এমনিতেই একহারা গড়নের খুবই কৃশকায় শরীরের ছিলো। ছোটবেলা থেকে দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করায় অনিয়মে অপুষ্ট শরীর।

সেই অবস্থায় সন্তানধারণ করায় ছিলো বিপদ। তবু সেদিন আমি বাসায় ছিলাম, তাই রক্ষা। সেই প্রায় অন্ধকার অবস্থায় আমি রাস্তায় একটা সিএনজি টেক্সি পেয়ে গেলাম। এম্বুলেন্স আনবার সময় ছিলো না। দ্রুত রিমঝিমকে নিয়ে কাছাকাছি জেমিসন মেটারনিটি হাসপাতালে গেলাম। সাথে আমার ভাগ্নি জিমি আর রিমঝিমের ছোটবোন মনি। সেই সকালেই লেবার রুমে নেয়া হয় রিমঝিমকে। আমি ঔষধ পত্র যা যা জরুরী দরকার ব্যবস্থা করে ওই ছোট মেয়ে দুইটাকে রেখে চলে যাই দিদির ওখানে সাড়ে আটটায়। একদিকে মাথার মধ্যে ঝড় বইছে কী হবে না হবে, অন্যদিকে দিদির জন্য সব কাজ শেষ করে কীভাবে দ্রুত ফিরবো হাসপাতালে, সেই তাড়না।

দিদির রুমের দরজা সবসময়ই খোলা থাকে। ছিটকিনি দেন না। দিদি বলেন, আমার যেনো এমন দিন না আসে যে, দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে হয়। আর আমার এমন কোন সম্পদ নাই যে, কেউ চুরি করবে! আমি দরজা ঠেলে ঢুকে দেখলাম ছেলে খাটে, মা নীচে ঘুমাচ্ছে। বিড়ালগুলো রশি দিয়ে বাধা। সেই দশ ফিট বাই বারো ফিট রুমের এককোণে স্টোভ জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়। দরজা ছাড়া ওয়াশ রুমে গিয়ে ধোয়াপাল্লা করে নিতে হয়। সেই অবস্থায় রুমে দুজন ঘুমাচ্ছে, আর আমি রান্না করছি। আমার সন্তান আসছে পৃথিবীতে, আমার স্ত্রী লেবার রুমে যন্ত্রণায় ছটফট করছে; আমি বসে তরকারি কুটছি, চাল ধুচ্ছি, দুধ জ্বাল দিচ্ছি। আমি দিদির চাকরি করছি না যে, ছুটি নেবো। আমি দিদির কাছ থেকে বেতন নিচ্ছি না যে, বেতন না নিয়ে কাজ ছেড়ে যাবো। আমি দিদির সেবা দিচ্ছি মানবিক কারণে। স্নেহ, মমতা, ভালোবাসার জায়গা থেকে।

সকাল এগারোটার দিকে কাজ শেষ করে দিদিকে খাইয়ে বিড়ালদের খাইয়ে আমি ছুটলাম হাসপাতালে। তখনো লেবার রুম থেকে কোন খবর আসে নি। ব্লাড দরকার, দুই বন্ধুকে বলে রাখলাম। একবার এই ঔষধ একবার ওইটা। বারবার ওঠা নামা করে দেখলাম দুইটা বেজে গেছে । সব ফেলে ছুটলাম আবার দিদির ওখানে দুপুরের রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা করতে। চারটার দিকে খবর এলো হাসপাতাল থেকে, আমাকে খুঁজছে। তখনো আমার কাজ শেষ হয়নি। অন্য একটা কাজ আছে দিদিকে এই বলে আধা ঘণ্টার জন্য বের হলাম। আমি বিয়ে করেছি দিদি তো তা-ই জানেন না। সন্তান জন্মাবার কথা বলার সুযোগই নেই। দিদি চাননি আমি সংসারী হই। সেটা মেনে নিতেও কখনোই পারবেন না। দিদি বলেই দিয়েছিলেন আমি সংসারী হলে যেনো তাঁর সাথে আর না থাকি, তাতে তাঁর যত কষ্টই হোক। যাক, সেসব কথা লিখবো একটা পর্বে।

আধ ঘণ্টার সময় নিয়ে দৌড়ে গেলাম। হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম তিতলির জন্ম হয়েছে। আমি যাওয়ায় একজন আয়া আমার মেয়েকে এগিয়ে দিলো আমার কোলে। আর ডাক্তার জানালো, মেয়ের মায়ের কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে বাচ্চা হওয়ার পরে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমার পাঁচ বছর বয়সে আমার মা মারা গেছেন সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। রিমঝিমের আট বছর বয়সে রিমঝিমের মা মারা গেছেন সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। আজ আমার সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কি রিমঝিম-ও চলে যাবে?

ডাক্তার যা বলল, মানে খিঁচুনি এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া; রিমঝিমের মায়েরও মারা যাওয়ার সময় একই অবস্থা হয়েছিলো। আমি ধপ করে বসে গেলাম। আবার উঠে ছুটলাম। ডাক্তার জানালো আপাতত ব্লাড দেবো এবং চিকিৎসা চলবে। আপনাদের প্রস্তুতি রাখতে হবে যেকোনো সময় মেডিকেলে নিয়ে যাবার জন্যে। আমি আজ কথাগুলো লিখছি আর চোখের জলে ভাসছি। আমি কোন পরিস্থিতিতে কী করেছি! আমার কী করার ছিলো? আমি আজ সংসার জীবন করছি কপর্দকহীন একজন আউটসাইডার এর মতো কারণ, জীবন যে অনেক কিছু দেয়ার সাথে সাথে অনেককিছু কেড়েও নেয়!

আমি ওই ভয়ংকর অবস্থায় আমার স্ত্রী সন্তান রেখে আবার ছুটলাম দিদির কাছে। আধঘণ্টা সময় যে শেষ। রক্ত দেবার জন্য বন্ধুদের ফোনে আসতে বললাম। আত্মীয়স্বজন যারা শহরে এবং রিমঝিমদের মামা চাচা ও গ্রামের বড়িতে যারা আছেন তাদের জানালাম অবস্থার কথা। আমি চললাম দিদির সেবায়। দিদির রুমে আর এক কাণ্ড চলছে তখন! মা ছেলে দুজনে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছে কি এক বিষয় নিয়ে। সেটার চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেলাম নীচ থেকেই। গিয়ে মা ছেলের মধ্যে ঝগড়া মিটিয়ে তাঁদের খাইয়ে, বাকী কাজ শেষ করে আবার হাসপাতালে ছুটলাম।

রাত দশটা পর্যন্ত চললো লড়াই। মেয়ে নিয়ে কেবিনে রাখলাম। আমার ছোট বোন নার্গিস, কলি, রিমঝিমের খালা, মামারা এসে পাশে দাঁড়ালো। আমার সংগঠন বন্ধুসভার বন্ধুরা এসে তখন ভিড় করে দাঁড়ালো। রাত দশটায় রিমঝিমের জ্ঞান ফেরে। এগারোটার পরে কেবিনে নেয়া হয় ওকে। এরই মধ্যে আরো একবার গিয়ে দিদির রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে এসেছি।

তিতলি জন্মের সেই দিনটি ছিলো শবেবরাত এর বন্ধের দিন। আগের রাতে সবাই সারারাত নামাজ পড়েছে। তাই, সকালে তেমন কাউকে পাইনি, কিন্তু সন্ধ্যার পরে অনেকেই এসে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

সব কষ্ট ভুলে গেলাম মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। মেয়েকে লেবার রুম থেকে যখন আমার কোলে দেয়া হয়, তখন মেয়ে হাসছিলো। একটুও কান্না করেনি। আমি অবাক হলাম, সব বাচ্চা তো কান্না করে! আসলে আমার মা আমার মেয়ে হয়ে এসেছেন। তাই, হাসিতে ভরিয়ে দিয়েছে আমার বিশ্ব। এর পরদিন, অর্থাৎ একত্রিশ আগস্ট আমার মা-বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। যৌথ সেই কাহিনী অন্যত্র বলবো।

আমার বড় আপা ফোন করে বললেন, তোর মেয়ে একটা প্রজাপতি। ওর নাম রাখলাম ‘তিতলি’।

রমা চৌধুরী
রমা চৌধুরী

২.
দিদির ছাত্রী মনোয়ারার আচরণ
উনিশশো ছিয়ানব্বই সাল। দিদি আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর দীর্ঘ সময়ের ছাত্রী মনোয়ারা বেগমের অফিসে। বোয়ালখালী থানার কধুরখীল স্কুলের পাশে প্রত্যাশীতে। প্রত্যাশী একটি এনজিও। মনোয়ারা বেগম এই প্রত্যাশীর নির্বাহী পরিচালক । দিদিকে দেখে এগিয়ে এলেন তাঁর ছাত্রী। প্রণাম করলেন দিদিকে, বসতে বললেন। আমরা বসলাম। আমাদের বসিয়ে রেখে মনোয়ারা বেগম তার কাজে চলে গেলেন। এভাবে দুই ঘন্টা বসবার পরে তিনি এলেন। ততোক্ষণে দিদি অধৈর্য হয়ে কয়েকবার খোঁজ নিয়েছেন।

মনোয়ারা বেগম এসে এই বসিয়ে রাখার জন্য কোন দুঃখ প্রকাশও করলেন না। কারণ দিদি ওনার কাছে শুধুই একজন গরিব মাস্টার! দিদিকে জিজ্ঞেস করলেন চেঁচিয়ে (এটার জন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না, দিদি কানে খাটো, এটা তার চেয়ে ভালো আর কে জানে?) কি জন্যে এসেছেন? দিদি বই বের করে এগিয়ে দিলেন দুইটা। উল্টে পাল্টে দেখে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। দিদি তৃষ্ণার্ত ছিলেন, বললেন একটু পানি দিতে। বেয়ারা ডেকে মনোয়ারা বেগম একগ্লাস পানিই শুধু দিলেন। একটা বিস্কুট বা অন্য কিছু খাবেন কি না জিজ্ঞেসই করলেন না।

বই রেখে বললেন, আমি বের হবো। দিদি বললেন, বইএর দাম দেবে না? মনোয়ারা বেগম আশ্চর্য হয়ে বললেন, দাম দিতে হবে? আমি তো ভেবেছি আমাকে সৌজন্য দিচ্ছেন! আচ্ছা ঠিক আছে, আর একদিন আসেন। এটা বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। এরপর আরো চারবার ওখানে আমি ও দিদি গিয়েছি বইয়ের দামের জন্য। দুইবার ওনাকে পাইনি। আর দুইবার পেলেও টাকা নাই। শেষ পর্যন্ত পঞ্চম বার গেলাম, সেদিন তিনি আমাদের তার শহরের বাসায় নিয়ে গেলেন। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় তার বিশাল বাড়ি। তখন রোজার দিন। ওনারা রোজাদার। আমরা রোজা থাকিনা জানেন, তবুও আমাদের নিয়ে গেলেন এবং বসিয়ে রাখলেন সন্ধ্যা পর্যন্ত। শেষে আমাদের ইফতার করিয়ে দিদির বইয়ের দাম দিলেন আড়াইশো টাকা। দিদি বড় দুঃখে কষ্টে আমাকে বলতে থাকলেন, মনোয়ারা বেগমের সাথে তাঁর ইতিহাস।

দিদি বলছেন আমি শুনছি, ‘মনোয়ারা চুয়াত্তর সালে মেট্টিক ফেল করে বসলো। ওর বাবা এসে আমাকে ধরলো, আমার মেয়েটাকে একটু পাশ করিয়ে দিতে হবে আপনাকে। মেয়েটা কয়েক সাবজেক্টে ফেল করেছে। আমি তখনো মুক্তিযুদ্ধের শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি । তার মধ্যে দেশে তখন দুর্ভিক্ষ অবস্থা। আমাকে পায়ে পড়ে মিনতি করায় রাজী হলাম। পাঁচ মাইল পথ হেঁটে পড়াতে যেতাম, আবার হেঁটে আসতাম। ঝড়-বৃষ্টি-কাদায় হাঁটতে গিয়ে আমার পায়ে সেপটিক হয়ে গেলো। তা-ও যেতাম। মায়া জন্মেছিলো ওর প্রতি। তাছাড়া আমার রেকর্ড আছে এমন বহু গাধাকে পাশ করাবার। আমার স্টুডেন্ট আবার ফেল করে কীভাবে? মাঝে মাঝে রাত বেশি হলে থাকতাম ওদের ঘরে। খেতে দিতো বাসিভাত, ডাল মরিচ লবন দিয়ে। ওরা খেতো আলাদা মাছ মাংস। ওর বাবা অবস্থাপন্ন। আমাকে থাকতে দিতো মাটিতে চাটাই বিছিয়ে। শেষ পর্যন্ত ও মেট্টিক পাশ করলো। আমি ছয়মাস এভাবে গিয়ে ওকে পড়াতে পেরেছি, শেষে পায়ের অসুখে আর যেতে পারিনি। পরে আবার যখন বি এ পরীক্ষা দিচ্ছে তখন আবার গিয়ে কয়েকমাস পড়িয়ে বি এ পাশ করিয়েছি। এই মনোয়ারা একানব্বই সালে ঘূর্ণিঝড়ে আমার ঘর ভেঙ্গে গেলে সরকার থেকে দেয়া ঘর বানানোর টাকার অংশ মেরে দিয়েছিলো। এই মনোয়ারাই আমার শেষ সম্বল সাত ভরি স্বর্ণ ব্যাংকে যা মর্টগেজ হিসেবে ছিলো, তা হাতিয়ে নিয়েছে। তবুও মনোয়ারাকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। যতই হোক আমার ছাত্রী তো!’ আমি দিদির কথাগুলো শুনছি আর ভাবছি, এমন গুণবতী (!) ছাত্রী লাখে মেলা ভার।’

মনোয়ারা বেগম এখনো প্রত্যাশীর নির্বাহী পরিচালক । প্রত্যাশী এখন জাতীয় পর্যায়ের এনজিও। মনোয়ারা বেগম মানুষের সেবক, মানবতার সেবক হিসেবে দেশে বিদেশে পুরস্কার পান। মনোয়ারা বেগমের ছেলে হত্যা মামলার আসামী হয়ে আমেরিকায় পলাতক। মনোয়ারা বেগম এখন বৃদ্ধ নিবাস করার পরিকল্পনা করছেন!

দিদির এই ছাত্রীকে আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষ মনে হয়েছে! এই মানুষরাই তো আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হন আর মানুষের কাছে হন সেবক!

দিদির জীবনে একজন মনোয়ারা বেগম হতে পারতেন আশীর্বাদ স্বরূপ। অথচ তিনি হলেন দিদির কষ্টের বাহক! দিদি এদের মতো মানুষদের ক্ষমা করে দিয়ে গেছেন। দিদি অমলিন হাসি দিয়ে সব দুঃখ ভুলে থেকেছেন।

Loading...
আরও পড়ুন