স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গ্রামে রাত নামলেই শুরু পাহাড় কাটা, বনভূমি কেটে বসতঘর নির্মাণ

বিএনপি ও মৎস্যজীবী নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের নিজ গ্রাম। সেই গ্রামেই রাত নামলেই ভারী এস্কেভেটর আর ডাম্পারের গর্জনে কাটা হচ্ছে বন বিভাগের পাহাড়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পেকুয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহমান ও শিলখালী ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য মোহাম্মদ কায়সারের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র নিয়মিত পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে। বন বিভাগের বারবার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলা এই কর্মকাণ্ডে পরিবেশের ক্ষতি বাড়ছে আর বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসীর মনে এখনো তাজা ২০২৪ সালের আগস্টের সেই রাত, যখন শিলখালীতে পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিনজনের প্রাণহানি ঘটে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গ্রামে রাত নামলেই শুরু পাহাড় কাটা, বনভূমি কেটে বসতঘর নির্মাণ 1

স্থানীয় সূত্র জানায়, পেকুয়ার শিলখালী, টইটং ও বারবাকিয়া ইউনিয়নে বন বিভাগের অধীনে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টরেরও বেশি সরকারি পাহাড় রয়েছে। এর বড় অংশই ইতিমধ্যে ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে বারবার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও প্রভাবশালী চক্র পাহাড় কেটে বনভূমির জমি দখল করছে এবং কাটা মাটি স্থানীয়ভাবে বিক্রি করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গ্রামে রাত নামলেই শুরু পাহাড় কাটা, বনভূমি কেটে বসতঘর নির্মাণ 2

রাত নামলেই শুরু হয় পাহাড় কাটা

অভিযোগ অনুযায়ী, শিলখালী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আলীচান মাতব্বর পাড়া সংলগ্ন বনানী ডেইরি ফার্মের পাহাড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত পাহাড় কাটা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন রাত ১০টার পর থেকে ভারী যন্ত্র দিয়ে পাহাড় কাটা শুরু হয়। বনানী পল্লী কর্তৃপক্ষ নাকি মোহাম্মদ কায়সারকে প্রশাসন ও বন বিভাগ ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্ব দিয়েছেন বলেও এলাকাবাসীর মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিলখালী ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য মোহাম্মদ কায়সারের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র নিয়মিত পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিলখালী ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য মোহাম্মদ কায়সারের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র নিয়মিত পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কায়সার ও তার সহযোগীরা নিজেরাই পাহাড় কাটার কাজ পরিচালনা করছেন এবং প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করার কথাও প্রকাশ্যে বলছেন। প্রতি বছর কয়েক দিনের জন্য এই পাহাড় কাটা হয় বলেও স্থানীয়রা জানান।

পেকুয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহমানের তত্ত্বাবধানেও দীর্ঘদিন ধরে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব।
পেকুয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহমানের তত্ত্বাবধানেও দীর্ঘদিন ধরে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব।

এদিকে স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নুরুল আমিন চৌধুরীর মালিকানাধীন বনানী পল্লীর ম্যানেজার ও পেকুয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহমানের তত্ত্বাবধানেও দীর্ঘদিন ধরে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। সেখানে তার মেয়ে জামাই মোহাম্মদ ডালিম, কৃষক দল নেতা সরওয়ার আলম, মোরশেদ আলম, মিয়া, শাহাদত শিকদার, রাশেদ এলাহী, মোহাম্মদ আশেকসহ আরও অনেকে পাহাড়কাটার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ আমলেও তারা পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ছিল।

এদিকে পাহাড়ের ওপরে বসবাসরত বাসিন্দারা চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

সব জেনেও নিশ্চুপ বন বিভাগ

স্থানীয় সাংবাদিকেরা একাধিকবার ঘটনাস্থলে গিয়ে পাহাড় কাটা বন্ধের আহ্বান জানালেও কাজ বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, বন বিভাগের লোকজন ঘটনাস্থলে গেলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং দুই দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার পরামর্শ দিয়ে সংশ্লিষ্টরা চলে গেছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মোহাম্মদ কায়সার চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি এই ধরনের অপকর্মের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নই। আমার একটি ছোট এস্কেভেটর থাকলেও সেটা পাহাড় কাটার উপযুক্ত নয়। আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য একটি মহল এই ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

পেকুয়া উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অতীতে ভূমিধসে প্রাণহানি

শিলখালীতে পাহাড় কাটার কারণে অতীতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট রাতে শিলখালী ইউনিয়নের জারুল বুনিয়া সেগুনবাগিচা এলাকায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের মা ও দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে ওই বছরের আগস্টেই শিলখালীতে আরেকটি পাহাড় ধসে এক পরিবারের তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

পরিবেশবিদেরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, মাটির ক্ষয় বাড়ে এবং বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে কক্সবাজার অঞ্চলে পাহাড় কাটার কারণে অতীতেও একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

সমতল করে বসতঘর নির্মাণ

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি করে সেখানে বসতঘর নির্মাণ করে জমি জবরদখল করা হচ্ছে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে এবং বন বিভাগের অসাধু কিছু কর্মচারীর যোগসাজশে এই পাহাড় কাটা ও দখল প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে শিলখালীর চ্যাপ্টামুড়া, জারুলবুনিয়া, আলীচান মাতব্বর পাড়া ও কাচারি মূড়া এলাকায় ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ কাজে সহযোগিতা করেছেন উপজেলার কয়েকজন কর্মকর্তার গাড়িচালক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।

এলাকাবাসীর প্রশ্ন, কার শক্তিতে প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা চলছে এবং প্রশাসন কেন নীরব? দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সিপি

ksrm