স্বপ্নযাত্রায় সিংহের ডেরায় বাঘের হুংকার

জয়ে ফিরতে মরিয়া বাংলাদেশ

0

এর আগে ইংল্যান্ডের মাটিতে কখনো লংকানদের মুখোমুখি হয়নি টাইগাররা। বিশ্বকাপে কখনো শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জযের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। তবুও আজ বাংলাদেশের পরিকল্পনায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের কোন বিকল্প চিন্তা নেই। আকাশ কুসুম কল্পনা নয়, নিজেদের শক্তিসামর্থ্য আর গত কয়েক বছরের পারফরমেন্স এবং প্রাপ্তি-অর্জনের আলোকেই এবারের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলার প্রত্যাশায় যুক্তরাজ্য এসেছে মাশরাফির দল।

আজ ব্রিস্টলে আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটায় বৃষ্টির শঙ্কার পাশাপাশি দলের অন্যতম প্রাণভোমরা সাকিব আল হাসানকে না পাওয়ার সম্ভাবনায় সবার মনে জমেছে শঙ্কার কালো মেঘ। সব শঙ্কা মাথায় নিয়ে লংকাবধে প্রস্তুত টাইগার বাহিনী।

সে প্রত্যাশা পূরণের পথে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল দারুণ। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২১ রানে হারানোর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির সংযোগ ঘটানোর পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছিল মাশরাফির দল।

মনে হচ্ছিল এবার বুঝি সেমিফাইনালের স্বপ্নালোকে পৌঁছে যাবে টাইগাররা। কিন্তু পরের দুই ম্যাচে বিশেষ করে নিউজল্যান্ডের সাথে লড়াই করে হার এবং ইংল্যান্ডের কাছে একতরফাভাবে হারে পথচলা দৃশ্যপট পুরোপুরি পাল্টে না গেলেও বদলেছে খানিকটা।

টাইগারদের চলার পথ এখন আর ঠিক তত মসৃণ নেই। একটু কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এখন আর হিসেব তত জটিল নেই। ঘোর প্যাচও নেই তেমন। এখন কথা একটাই- শেষ চারে থাকতে চাইলে হলে যত বেশি সম্ভব, তত বেশি ম্যাচ জিততে হবে।

লিটন দাশ ও রুবেল হোসেন। যাদের একাদশে অন্তর্ভুক্তির জন্য জোরালো দাবি উঠেছে

এখন খেলা আছে ছয়টি, তার অন্তত চারটিতে চাই জয়। সেই ছয় ম্যাচের যে চারটিতে জয়ের টার্গেট করার কথা টাইগারদের, তার মধ্যে শ্রীলঙ্কা আর আফগানিস্তান আছে অবশ্যই। তারপর পাকিস্তান, ওয়েষ্ট ইন্ডিজও নিশ্চয়ই থাকবে হিসেবে।

কাজেই সেই অনেক আশা-প্রত্যাশার আর চাওয়ার চার জয়ের প্রথম জয়টি চাই আজ (মঙ্গলবার) শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। ভক্ত, সমর্থকরাও সেভাবে চিন্তা করছেন। হিসেবটাও তেমনি। আফগানিস্তান আর শ্রীলঙ্কার সাথে জয় ধরেই আগাতে হবে। এই দুই ম্যাচের একটি হেরে গেলে বা এই দুই ম্যাচের কোনটা বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে গেলে সর্বনাশ। তখন সেমিতে খেলার সম্ভাবনা যাবে কমে।

ভক্ত ও সমর্থক এবং সাধারণ ক্রিকেট অনুরাগিদের এই অনুভব-উপলব্ধিটা আছে টাইগারদেরও। তারা জানেন, বোঝেন পরিস্থিতি কি? কি করলে, কি ঘটলে, কী হবে? সব তারাও জানেন শ্রীলঙ্কাকে হারানোটা কত জরুরী।

কোন কারণে মানে বৃষ্টিতে এ ম্যাচ পন্ড হয়ে পয়েন্ট ভাগাভাগি হলেও যে ক্ষতি হবে সেটাও খুব ভালই জানেন টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। তাই প্রেস কনফারেন্সে বাংলাদেশ অধিনায়কের প্রথম কথা, ‘আবহাওয়ার পূর্ভাবাস শুনেছি। তবে আশা করছি যাতে পুরো ম্যচ হয়। বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে না গেলেই ভাল। আর বৃষ্টি বিঘ্নিত কর্তিত ওভারের ম্যাচও চাই না। পুরো ৫০ ওভারের খেলা হোক সেটাই চাই।’

দেশে কোটি বাংলাদেশ ভক্ত এখন উন্মুখ হয়ে আছেন, আজ ব্রিস্টলে শ্রীলঙ্কার সাথে খেলতে নামার আগে আসলে কি ভাবছে বাংলাদেশ? টাইগারদের অনুভব-উপলব্ধি কি? ২৪ ঘন্টা আগে সোমবার দুপুরে প্রেস কনফারেন্সে এসে অধিনায়ক মাশরাফি অনেক কথার ভিড়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আসলে তিনি এবং তার দল কি ভাবছে?

অনেকেই আবার লিটন ও সাব্বির দুজনকেই একাদশে অন্তর্ভুক্তির কথা বলছেন

পরপর দুই ম্যাচে হেরেছে দল। কিছু ছোটখাটো ইনজুরি আছে। শারীরিকভাবে প্র্যাকটিসে উপস্থিত থাকলেও সোমবার সাকিব ব্যাটিং ও বোলিং করেননি। সব মিলে দলের সর্বশেষ অবস্থা কি? ক্রিকেটাররা মানসিক, শারীরিকভাবে কতটা সুস্থ্য ও চাঙা আছেন? তাও জানতে চাওয়া হলো?

মাশরাফির আত্মবিশ্বাসী জবাব, ‘দল ভালই আছে। সবাই সুস্থ্য আছে। কিছু ছোটখাটো ইনজুরি তো থাকেই। আার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটটা এমনই। এখানে ছোটখাটো ইনজুরি থাকেই। তা নিয়ে খেলতেও হয়। আমাদেরও আছে। তা নিয়েই খেলতে হচ্ছে। আশা করি আগামীকালকের (আজকের) ম্যাচের আগে সবাই সুস্থ্য হয়ে মাঠে নামবে।’

আর মনের দিক থেকে কেমন আছে টিম বাংলাদেশ? শ্রীলঙ্কার সাথে জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী? টাইগার অধিনায়কের জবাব, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দূর্দান্ত সূচনার পর নিউজিল্যান্ডের সাথে প্রায় সমানতালে লড়ে হেরে গেছি। আর ইংল্যান্ডের সাথে আসলে ভাল খেলিনি। তাই ছেলেরা আবার ভাল খেলে জয়ের ধারায় ফিরতে মুখিয়ে আছে।’

এখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় খুব জরুরী। হারলে বা বৃষ্টিতে খেলা পন্ড হয়ে পয়েন্ট ভাগাভাগি হলে হিসেব আরও কঠিন হয়ে যাবে। এটা কি কোন বাড়তি চাপ? মাশরাফির জবাব, ‘বিশ্বকাপে প্রেশার থাকবেই। সব ম্যাচেই চাপ আছে। প্রেশার নেই, তা বলবো না। তবে এই চাপ নিয়েই ভাল খেলতে হবে। প্রথম বল থেকেই জয়ের জন্য খেলতে হবে। আমরা জিতবোই এমন নিশ্চয়তা দেয়া ঠিক না। আমরা জিতবোই- এমন কথা নিশ্চিত করে বলতেও পারবো না। তবে সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো- এমনটা বলতে পারি।’

ব্রিস্টলের এই মাঠে পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কা ম্যাচ বৃষ্টির কারণে হয়নি। আজ বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কা ম্যাচও যদি বৃষ্টির বৈরী আচরণে না হয়, তাহলে কেমন হবে? কেমন লাগবে?

বিশ্বকাপের এখনব্দি সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক সাকিবের আজকের ম্যাচে মাঠে নামুক এই আশায় বুক বাঁধছেন সমর্থকরা

মাশরাফি বোঝানোর চেষ্টা করলেন, নিউজিল্যান্ডের সাথে জিতে থাকলে হয়ত পয়েন্ট ভাগাভাগিতেও সমস্যা হতো না। তাই তো মুখে এমন কথা, ‘আসলে আগের দুই ম্যাচের অন্তত একটি জিতে থাকলে উত্তরের ভাষা হতো ভিন্ন। কিন্তু তা তো পারিনি। এখন খেলা না হলে একটু সমস্যাই। আমাদের জয় খুব জরুরী। ক্রিকেটারদের ভাল খেলে জয়ের পথে ফেরার ক্ষুধা আছে।’

পরিসংখ্যান:
আত্মবিশ্বাসী মাশরাফি বাহিনীর সাথে বাংলাদেশের সাবেক কোচ হাতুরেসিংহের শ্রীলঙ্কার মোকাবেলার আগে জেনে নিন দুদলে কিছু পরিসংখ্যা।

এক. এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে এ দুইদল। এর আগে প্রতিবারই (২০০৩, ২০০৭ ও ২০১৫) শ্রীলঙ্কার কাছে হেরেছে বাংলাদেশ।

দুই. এর আগে কখনোই ইংল্যান্ডের মাটিতে মুখোমুখি হয়নি বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। ব্রিস্টলের মাঠে ২ ওয়ানডে খেলে জয়ের দেখা পায়নি লঙ্কানরা। অন্যদিকে এ মাঠে ২০১০ সালে নিজেদের একমাত্র ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ৫ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।

তিন. ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সবশেষ ম্যাচে ১২১ রান করেছেন সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপের মঞ্চে যা বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিতীয় ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ স্কোর। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ব্যাট থেকে এসেছিল ১২৮* রানের ইনিংস।

চার. এ বিশ্বকাপে টানা তিন পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসসহ এখনো পর্যন্ত টানা ৪টি পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের ইনিংস খেলেছেন সাকিব। বাংলাদেশের পক্ষে একটানা ৫ ম্যাচে পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের ইনিংস খেলার রেকর্ড রয়েছে তামিম ইকবালের।

দুদলের প্রাণভোমরা

পাঁচ. শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি মোস্তাফিজুর রহমানের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫০তম ম্যাচ হতে যাচ্ছে। এখনো পর্যন্ত ৪৯ ম্যাচে ২৩.৪০ গড়ে ৮৭ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। এর মধ্যে লঙ্কানদের বিপক্ষে ৭ ম্যাচে ১১ উইকেট রয়েছে মোস্তাফিজের।

ছয়. লঙ্কানদের বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংস খেলার রেকর্ড মুশফিকুর রহীমের দখলে। গত বছরের এশিয়া কাপে তিনি খেলেছিলেন ১৪৪ রানের অনবদ্য ইনিংস। তবে সবমিলিয়ে লঙ্কানদের ২৫ ইনিংসে মাত্র ২ ফিফটি ও ১টি সেঞ্চুরিই রয়েছে তার।

সাত. পায়ের ইনজুরিতে এ ম্যাচে অনিশ্চিত সাকিব। তবে খেলতে নেমে মাত্র ২৩ রান করলেই দ্বিতীয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডে ক্রিকেটে ৬০০০ রানের মালিক হবেন বাংলাদেশ দলের সহ-অধিনায়ক।

Loading...
আরও পড়ুন