স্বজনের ভিড়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল যেন ‘ঘরবসতি’, ওয়ার্ডজুড়ে শোরগোলে গলদঘর্ম ডাক্তার-নার্সরা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের জন্য চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ওয়ার্ডের ভেতর একজন রোগীর সঙ্গে একজন এটেন্ডেন্ট বা স্বজন থাকার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সেই নিয়মের বালাই নেই কোথাও, এক রোগীর আশপাশে বসে থাকেন তিন থেকে পাঁচজন এটেন্ডেন্ট। তাদের ভিড়ে রোগীকে ঠিকমতো চিকিৎসা দিতে পারেন না চিকিৎসক-নার্সরা।

এসবের পেছনে ওয়ার্ডের সর্দার ও বয়রা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রোগীর স্বজনরা তাদের ‘খুশি’ করলেই থাকতে পারেন ওয়ার্ডে। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের চিত্রই এমন। রোগীর পাশে যাবতীয় জিনিসপত্র ও স্বজনদের দেখে মনে হয় যেন এটাই তাদের ঘরবাড়ি, তাদের সংসার। ওয়ার্ড থেকে সকালে অনেকে কর্মস্থলে চলে গেলেও রাতে আবার চলে আসেন। সেখানেই চলে খাবার খাওয়া ও গল্প।

৮ বছরের ছেলে রাফিকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে এসেছেন জোবায়ের হোসেন। বরিশালের ভোলা থেকে আসা ডেঙ্গু আক্রান্ত রাফি ভর্তি শিশু ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডের বাইরের বারান্দায় রাফির বাবা, মা, মামা, মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে আছেন খালা-খালু। সোমবার (১৪ আগস্ট) বাইরের বারান্দায় গোল হয়ে বসে থাকতে দেখা গেল তাদের। তাদের বেডের চারপাশে বিছানা, বালিশ, বালতি, কম্বল, পানির মগ, জগ, ফ্ল্যাক্স, চায়ের কাপ, থালা , চামচসহ আছে বেশ কিছু জিনিস।

রাফির বাবা জোবায়ের হোসেন বলেন, ‘এসব জিনিস মেডিকেলে এসে কেনা।’

১৭ নম্বর কিডনি ওয়ার্ডে দেখা গেছে, ওয়ার্ডের ভেতরেও স্বজনদের হট্টগোল। কিডনি ওয়ার্ড ছেড়ে বাইরে রাখা হয়েছে রোগীদের। ওয়ার্ডের ভেতরে যেসব রোগী ফ্লোরে রয়েছেন, তাদের চারপাশ জিনিসেপত্র ঠাসা। এক রোগীর সঙ্গে স্বজন তিনজন থেকে পাঁচজন।

কিডনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন মহররম হোসেন বেডে অচেতন হয়ে পড়ে রয়েছেন। তার বেড ঘিরে রয়েছেন পাঁচজন স্বজন। বেডের নিচে বসে দু’জন ভাত খাচ্ছেন। এদের একজন মহররম হোসেনের স্ত্রী নাজমা আক্তার।

তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানান, তাদের বাড়ি বহদ্দারহাটের রাহাত্তারপুলে। দুপুরের খাবার বাসা থেকে আনা হয়েছে। সকালের ও বিকালের নাস্তা মেডিকেলের নিচের দোকানে থেকে এনে খান।

মহররমের বেড ঘেঁষে নিচে ফ্লোরে যে রোগী শুয়ে রয়েছেন তার নাম বোয়ালখালীর বাসিন্দা মোরশেদ। পাশে বসা তার ছেলে হামিদ।

হামিদ জানান, তার বাবার জন্য গতকাল ১৪০০ টাকা দিয়ে একটা টেবিল ফ্যান কিনেছেন। নতুন করে বালতি, থালা, বেড, চাদর কিনে এনেছেন। কতদিন থাকতে হয় তা জানা নেই। হামিদ চাকরি করেন গার্মেন্টেসে। সকালে তিনি গার্মেন্টেসে চলে গেলে তার ছোটভাই, না হয় বোন এসে থাকেন। মাঝে মাঝে মাও থাকেন।

এমন চিত্র মেডিকেলের প্রায় সব ওয়ার্ডেই। রোগীর স্বজন ও সকাল-সন্ধ্যা দর্শনার্থীদের চাপে হাঁসফাঁস করে রোগী থেকে শুরু করে চিকিৎসক-নার্সও। এতে রোগীদের সঠিক চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হয় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা। এজন্য ওয়ার্ডের সর্দার এবং ওয়ার্ড বয়দের দায়ী করছেন অনেকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হৃদরোগ বিভাগের এক সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন, ‘ওয়ার্ডের সর্দার হচ্ছেন এসব অনিয়মের ডিপো। তাদেরকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে রোগীর স্বজনরা ওয়ার্ডে এসে রোগীর সঙ্গে থাকেন। দেখলে মনে হয় এটাই ঘর-বসতি রোগীর।’

শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘রোগীর স্বজন ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে আমরা চিকিৎসকরা রোগীর কাছে যেতে পারি না। তবে আমার ওয়ার্ডে এই বিষয়ে আমি কড়া নির্দেশ পালন করতে বলেছি স্টাফদের। নিয়মের বাইরে কোনো স্বজন, দর্শনার্থী রোগীর কাছে ভিড় করতে পারবেন না।’

চট্টগ্রাম মেডিকেলের ভেতরে রোগীর স্বজনদের এমন ‘বসতি’ বানানোয় লাভ হচ্ছে আশপাশের সাংসারিক জিনিসপত্র বিক্রির দোকানিদের। তেমনই এক ব্যবসায়ী মো. জিয়া। মেডিকেলের ভেতরে মূল প্রবেশ পথের সামনে চতুর্থ শ্রেণি স্টাফ ক্যান্টিনের পাশেই তার দোকান। তার দোকানে বালিশ, বেডশিট, কম্বল, থালা-বাসন, বালতি, পাটি থেকে শুরু করে সাংসারিক প্রায় সব জিনিসই আছে। তিনি চড়া দামে ডাবও বিক্রি করছেন।

মো. জিয়া বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে এই দোকান থেকে আমার ভালো লাভ আসে। প্রতিটি জিনিস যে দামে কিনে আনি, তা ন্যায্য দামে বিক্রি করি। রোগীর মেডিকেলের আর সংসারিক জিনিস সরবরাহ করছি, এটাই তো বড় বিষয়।’

এই রকম দোকান মেডিকেলের ভেতরে-বাইরে ১৫ থেকে ২০টি রয়েছে। রাস্তার পাশে ভ্যান গাড়িতেও বিক্রি হচ্ছে এই ধরনের সাংসারিক জিনিসপত্র। যা কিনছেন মেডিকেলে ভর্তি রোগীর স্বজনরা।

রোগীর স্বজনদের উপস্থিতি নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান বলেন, ‘অনেক তাগাদা দিয়েও এদের আমি উচ্ছেদ করতে পারি না। বাড়তি ভিজিটরও বন্ধ করতে পারি না। তবে আবার আমি সব ওয়ার্ড নজরদারিতে রাখবো। বাড়তি ভিজিটরও বন্ধ করার চেষ্টা করব।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!