চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম লালখান বাজার এলাকা। সন্ধ্যা তখন পাঁচটা পেরিয়েছে। একটি বিকাশ ও লেডিস টেইলার্সের দোকানে তাড়াহুড়ো করে ঢুকলেন মাস্ক পরা এক যুবক। জরুরি প্রয়োজনে ‘নগদ’ অ্যাকাউন্টে পাঠালেন ১৪ হাজার টাকা। কিন্তু টাকা পাঠানোর পর ক্যাশ দেওয়ার বদলে তিনি শোনালেন ভিন্ন গল্প। নিজেকে সেনাবাহিনীর সদস্য দাবি করে পকেট থেকে বের করলেন পরিচয়পত্র। সেই কার্ডটি দোকানে জমা রেখে ‘টাকা নিয়ে এখনই আসছি’ বলে সটকে পড়লেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও আর ফিরে আসেননি সেই যুবক। গত ৩০ নভেম্বর (রোববার) সন্ধ্যায় লালখান বাজারের হাইওয়ে প্লাজায় এই অভিনব প্রতারণার ঘটনা ঘটে।
বিশ্বাস অর্জনে সেনাসদস্যের কার্ড
খুলশী থানার লালখান বাজার এলাকার হাইওয়ে প্লাজায় অবস্থিত ‘বর্ণা লেডিস টেইলার্স অ্যান্ড বিকাশ মোবাইল সার্ভিস’ নামের দোকানটিতে ঘটে যাওয়া এই প্রতারণার দৃশ্য ধরা পড়েছে সিসিটিভি ফুটেজে। ভুক্তভোগী দোকানমালিক প্রদীপ সরকার জানান, গত ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যা ৫টা ৮ মিনিটে অজ্ঞাত এক যুবক দোকানে প্রবেশ করেন। তিনি দোকানদারকে অনুরোধ করে একটি মোবাইল ব্যাংকিং নগদের নম্বরে (০১৯৭৬২১৯৩৫৪) ১৪ হাজার টাকা পাঠাতে বলেন। সরল বিশ্বাসে দোকানদার ওই নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু টাকা পাঠানোর পরপরই যুবকটি কোনো টাকা না দিয়েই দ্রুত চলে যাওয়ার ভঙ্গি করেন। এ সময় দোকানে থাকা মালিকের আত্মীয় মাইন উদ্দিন টাকা চাইলে ওই যুবক নিজেকে সেনাবাহিনীর সদস্য বলে দাবি করেন। তখন মাইন উদ্দিন পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তিনি একটি সেনাসদস্যের আইডি কার্ড প্রদর্শন করেন এবং কার্ডটি দোকানে জমা রেখে পরে এসে টাকা দিয়ে কার্ড নিয়ে যাবেন বলে জানান। এরপর তিনি দ্রুত দোকান ত্যাগ করেন আর ফিরে আসেননি।
পরিচয়পত্রটি আসল না নকল
দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর যুবক ফিরে না আসায় দোকানদার বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ওই যুবকের রেখে যাওয়া পরিচয়পত্র ও সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। মাস্ক পরা থাকায় ফুটেজে যুবকের চেহারা পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও তার দেওয়া পরিচয়পত্রটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবুজ রঙের ওই কার্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় ইংরেজিতে ‘বাংলাদেশ আর্মি’ এবং নাম মো. মিরাজুল ইসলাম ও পদবি সৈনিক লেখা রয়েছে। কার্ডের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় কিউআর কোড ও বারকোড রয়েছে। পরিচয়পত্রের মেশিন রিডেবল জোন বা এমআরজেড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কার্ডধারীর জন্মতারিখ ২০ ডিসেম্বর ১৯৯৭ এবং কার্ডটি ইস্যু করা হয়েছে ২০২১ সালের ২০ মার্চ। কার্ডের গঠন, স্মার্ট চিপ এবং ডেটাবেইস ফরম্যাট দেখে এটি সেনাবাহিনীর আসল কার্ডের মতোই মনে হয়েছে। তবে ছবির মান অস্পষ্ট হওয়ায় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া কঠিন ছিল। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই যুবক টাকা নেওয়ার জন্য যে সিমটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটিও তার নিজের নামেই নিবন্ধিত।
উন্মোচিত হলো ‘সৈনিক’ মিরাজুলের অতীত
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ওই যুবকের আসল পরিচয়। তার নাম মো. মিরাজুল ইসলাম। বাড়ি রংপুর বিভাগের দিনাজপুর সদর উপজেলার চেরাডাঙ্গী এলাকার হাজেরাপুবু গ্রামে। তিনি মৃত মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ছেলে। ঘটনার পর প্রযুক্তির সহায়তায় ওই রাতে প্রতারকের অবস্থান নগরের ওয়াসা মোড় এলাকায় শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে পরিচয়পত্রের সূত্র ধরে দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের সাবেক সচিব এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য শামশু উদ্দিন ও গ্রাম পুলিশ কুমকুম আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মিরাজুলের পরিচয় নিশ্চিত করেন। জানা যায়, মিরাজুল ইসলাম সেনাবাহিনীতে আট বছর সৈনিক হিসেবে চাকরি করেছিলেন। তবে প্রায় দেড় বছর আগে তিনি চাকরিচ্যুত হন।
সন্তান যখন বাবার মৃত্যুর কারণ
মিরাজুল ইসলামের ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার ভাই মিরাজুল নানা ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। পাওনাদারদের চাপে শেষমেশ তার বাবা সেই টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হন এবং এই মানসিক চাপে স্ট্রোক করে মারা যান। মিরাজুল এর আগেও সিলেটে প্রতারণার দায়ে ৯ মাস কারাভোগ করেছেন এবং মাত্র দুই মাস আগে চট্টগ্রাম জেলা কারাগার থেকেও জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বর্তমানে বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক হলেও স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ না হলেও স্ত্রী বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে একই কায়দাতে তিনি আরও প্রতারণা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের তদন্ত ও পদক্ষেপ
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী দোকানমালিক প্রদীপ সরকার গত ১ ডিসেম্বর রাতে খুলশী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর-১৭) করেছেন। জিডিটি তদন্ত করছেন খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. বাবুল মিয়া।
তিনি জানান, পুলিশ অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং প্রতারককে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে নগদ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীকে সর্বোচ্চ আইনি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রাম কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক আফতাব হোসেন জানান, বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে প্রতারণা করা চক্রগুলো এক জেলা থেকে টাকা নিয়ে অন্য জেলায় ক্যাশ আউট করে, যার ফলে তাদের ধরা সময়সাপেক্ষ ও কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী দোকানমালিক নগদ হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে ওই অ্যাকাউন্টে টাকা থাকলে তা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
জেজে




