সূরা মুলক: সুপারিশ, ক্ষমা ও আখিরাতের প্রস্তুতির বার্তা

রাতের নীরবতায় ঘুমানোর আগে কোরআনের একটি সূরা তিলাওয়াতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন মহানবী (সা.)। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ৩০ আয়াতের এই সূরা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে, কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবে এবং আখিরাতের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেই সূরাটিই হলো ‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক’ বা সূরা মুলক।

হজরত উসমান (রা.) কবরের পাশ দিয়ে গেলে এত বেশি কান্না করতেন যে তাঁর দাড়ি ও বুক অশ্রুতে ভিজে যেত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছে শুনেছেন, কবর আখিরাতের প্রথম ঘাঁটি। কেউ যদি সেখানে মুক্তি পায়, তাহলে পরবর্তী সব ধাপ তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আর যদি সেখানে মুক্তি না পায়, তাহলে পরবর্তী অবস্থাগুলো আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.)-এর একটি বাণী উল্লেখ করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি প্রতিদিন এশার নামাজের পর ঘুমানোর আগে সূরা মুলক তিলাওয়াত করবে, তার মৃত্যুর পর কবরের আজাব মাফ করে দেওয়া হবে।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরআনে ৩০ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা রয়েছে, যা তার তিলাওয়াতকারীকে ক্ষমা করে না দেওয়া পর্যন্ত তার জন্য সুপারিশ করতে থাকবে। সেই সূরাটি হলো ‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক’ অর্থাৎ সূরা মুলক।

হাদিসে আরও এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো রাতে সূরা মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না। অন্যদিকে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, কবরে শাস্তির ফেরেশতারা যখন এক ব্যক্তির কাছে আসতে চাইবে, তখন তার পা, বুক, পেট ও মাথা একে একে সাক্ষ্য দেবে যে সে দুনিয়ায় সূরা মুলক তিলাওয়াত করত। ফলে তার জন্য কবরের আজাব থেকে সুরক্ষা সৃষ্টি হবে। বর্ণনায় সূরা মুলককে কবরের আজাবের প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি বলা হয়েছে, তাওরাতেও এ সূরার উল্লেখ ছিল এবং যে ব্যক্তি রাতে এটি পাঠ করে, সে অত্যন্ত উত্তম আমল সম্পাদন করে।

কবরের আজাব থেকে মুক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কবরের আযাব থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আরো আশ্রয় প্রার্থনা করছি জীবন-মৃত্যু ও দাজ্জালের ফিতনা থেকে।’

রাতের আমলে সূরা মুলকের গুরুত্ব

কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার পাশাপাশি সূরা মুলকের আমলও একজন মুমিনকে উপকৃত করতে পারে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এ সূরা তার আমলকারীর জন্য কবরের আজাবের সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। প্রতি রাতে, রাতের যেকোনো সময়ে, সূরা মুলক তিলাওয়াত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘আলিফ লাম মিম তানজিলুল কিতাব’ অর্থাৎ সূরা আস-সাজদা এবং ‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক’ অর্থাৎ সূরা মুলক তিলাওয়াত না করে ঘুমাতেন না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সূরা মুলক শুধু রাতেই পড়তে হবে। এটি দিন-রাতের যেকোনো সময় তিলাওয়াত করা যায়। তবে রাতের বিশেষ জিকির হিসেবে এর গুরুত্ব বেশি। নামাজের মধ্যে এ সূরা পড়াও উত্তম। মুখস্থ না থাকলে দেখে দেখে অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করলেও বিশেষ সওয়াবের আশা করা যায়।

সূরার মূল বিষয়বস্তু

সূরাটির নামের মধ্যেই এর মূল বিষয়বস্তু স্পষ্ট হয়েছে। ‘মুলক’ শব্দের অর্থ সার্বভৌমত্ব। আসমান ও জমিনে একমাত্র আল্লাহই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, এ সত্য সূরাটির শুরুতেই ঘোষণা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানুষকে পরীক্ষা করা যায়—কে আমলের দিক থেকে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মৃত্যুও আলাদা একটি সৃষ্টি; এটি শুধু জীবনের অনুপস্থিতি নয়। যিনি মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, তিনি অবশ্যই মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। অর্থাৎ মৃত্যু তাঁর ওপর কার্যকর হতে পারে না।

জন্ম ও মৃত্যুর উদ্দেশ্য বর্ণনার মাধ্যমে মানুষের জীবনের লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহকে ভয় করে যে ব্যক্তি সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর অটল থাকবে এবং জীবনের পরীক্ষায় সফল হবে, তার জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার। অন্যদিকে যারা আল্লাহর অবাধ্যতার পথ বেছে নেবে, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াবহ পরিণাম। সূরাটিতে আখিরাতে পথভ্রষ্ট মানুষের আফসোস, দুনিয়ায় পাওয়া সুযোগ এবং আল্লাহর বিভিন্ন নিয়ামতের কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের আল্লাহমুখাপেক্ষিতা ও অসহায়ত্বের বিষয়টি তুলে ধরে শোকর আদায় ও আখিরাতের প্রস্তুতির প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

সুপারিশ ও মুক্তির আশা

সূরা মুলকের বহু ফজিলতের মধ্যে অন্যতম হলো কিয়ামতের দিন এর সুপারিশ। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি নিয়মিত সূরা মুলক তিলাওয়াত করবে, এ সূরা তার জন্য সুপারিশ করবে এবং কবরের আজাব থেকে তাকে রক্ষা করবে। অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা মুলক তিলাওয়াত করে, সে অত্যন্ত উত্তম আমল করে এবং অসংখ্য নেকি লাভ করে।

একাধিক বর্ণনায় হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষকে নিজে সূরা মুলক পড়ার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদেরও তা শিক্ষা দিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। সেখানে সূরাটিকে মুক্তিদানকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে এবং জাহান্নাম ও কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি আকাঙ্ক্ষার কথাও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, তাঁর ইচ্ছা যে সূরাটি তাঁর প্রত্যেক উম্মতের অন্তরে গেঁথে থাকুক।

কোরআন তিলাওয়াতের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। পাক-পবিত্র অবস্থায় যেকোনো সময় কোরআন তিলাওয়াত করা যায়। তবে আল্লাহ তাআলা কিছু সময়কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, যখন আমলের গুরুত্ব আরও বেশি হয়ে ওঠে। তাই যেসব কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) সন্তুষ্ট হন, সেসব আমলে বেশি বেশি আত্মনিয়োগ করা উচিত।

মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিদিন এশার নামাজের পর ঘুমানোর আগে সূরা মুলক তিলাওয়াত ও তা বোঝার তাওফিক দান করুন। যে ব্যক্তি এ সূরা তিলাওয়াত করবে এবং এর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করবে, তার জন্য এ সূরার সুপারিশ, ক্ষমা ও জান্নাত লাভের আশা করা যায়। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর কবরের আজাব থেকেও সে মুক্তি পেতে পারে। আমিন।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

ksrm