সিলেট থেকে ধরা চট্টগ্রামের প্রেমিক ব্যাংকার মোরশেদ, বিয়ের রাতেও যৌতুক চেয়েছিলেন

পটিয়ার কলেজছাত্রী রিমা আত্মহত্যা

চট্টগ্রামের পটিয়ার চাঞ্চল্যকর রিমা আত্মহত্যার মূল প্ররোচনাদাতা ও মামলার প্রধান আসামি প্রেমিক মিজানুর রহমান মোরশেদকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। টানা ৬ দিন পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপনে থাকার পরও তার শেষ রক্ষা হয়নি।

অভিযুক্ত মোরশেদ আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁও মোগড়াপাড়া শাখার ক্যাশ অফিসার।

মঙ্গলবার (২ জুলাই) রাত দুইটার দিকে সিলেট মহানগরীর দক্ষিণ সুরমা থানাধীন কদমতলী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হোটেল সাউথ সিটি থেকে পটিয়া থানা পুলিশের একটি টিম তাকে গ্রেপ্তার করে। বুধবার দুপুরে তাকে পটিয়া থানায় নিয়ে আসা হয়।

জানা গেছে, রিমা আত্মহত্যার ঘটনার পর থেকেই মোরশেদ আত্মগোপনে চলে যান। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। ১ জুলাই পটিয়া থানার উপ-পরিদর্শক আশিকুল ইসলাম ও ওবায়েদ উল্লাহর নেতৃত্বে শরীয়তপুর জেলার জাজিরা থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে মোরশেদ নিজের অবস্থান ঘন ঘন পরিবর্তন করায় তাকে ধরা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে সিলেটে তার খোঁজ মিলল।

গ্রেপ্তারের পর মোরশেদ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানান, তার হবু বউ তথা প্রেমিকা রিমা আক্তার আত্মহত্যার আগে তাকে ফোন দিয়েছিল। ফোনে রিমা আক্তারকে যৌতুকের অবশিষ্ট টাকা ও ফার্নিচার না দিলে সে বিয়ে করবে না বলে হুমকি দিয়েছিল। মোবাইল ফোনে রিমা আক্তার জানিয়েছিল যে, বিয়ে না হলে তার পরিবার সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। কিন্তু যৌতুকের দাবিতে মোরশেদ অনড় থাকায় রিমা আক্তার কান্নাকাটি করতে থাকে। এ সময় মোরশেদকে রিমা বলে, তুমি আমাকে বিয়ে না করলে আমার মরা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। জবাবে মোরশেদ বলেন, তুমি মরে গেলেও কিছু যায় আসে না। এরপর রিমা আক্তার মোবাইল ফোনের সংযোগ কেটে দিয়ে আত্মহত্যা করে।

জানা গেছে, চার বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর উপজেলা হাইদগাঁও ইউনিয়নের ৮ নং ওয়াডের মনির আহমদের কনিষ্ঠ কন্যা কলেজছাত্রী রিমা আকতারের সাথে একই এলাকার মফিজুর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান মোরশেদের সাথে পারিবারিকও বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয়। ২৮ জুন দুপুরে মেয়ে ছিল বিয়ে। কিন্তু গায়েহলুদের দিন গত ২৭ জুন প্রেমিক মোরশেদের যৌতুকের চাপ সহ্য করতে না পেরে কলেজপড়ুয়া তরুণী রিমা আত্মহত্যা করেন।

এ ঘটনায় পটিয়া থানায় সেই হবু স্বামীর বিরুদ্ধে হত্যামামলা দায়ের করা হয়। রিমার বাবা মনির আহমদ বাদী হয়ে বর মোরশেদকে একমাত্র আসামি করে ওই মামলা দায়ের করেন।

জানা গেছে, প্রেমের সেই বিয়েতে যৌতুকের জন্যই অভিমানে প্রাণ দিতে হলো রিমাকে। দুই দিন আগেও রিমার কৃষক বাবা মনির আহমদ নগদ দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন বর মোরশেদের পরিবারের কাছে। ফার্নিচার নিয়ে চলছিল উভয়পক্ষের মধ্যে নানা হিসাবনিকাশ। এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে বর মোরশেদ কনে রিমাকে মোবাইল ফোনে নানা ধরনের হুমকি ধমকি দিয়ে আসছিলেন। গত কয়েকদিন ধরে রিমাকে বিষণ্ন দেখতে পান তার স্বজনরা। তার জের ধরে অপমানে অভিমানে রিমা নিজ ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় রশি ঝুলিয়ে আত্নহত্যা করেছেন বলে তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে।

আত্মহত্যার আগে একটি চিরকুটে ২০ বছর বয়সী রিমা আকতার লিখে গেছেন— ‘প্রিয় শখের পুরুষ, তুমি করো তোমার বিয়ে। অনেক ভালোবেসেছি এবং অতিরিক্ত যন্ত্রণাও দিয়েছো। আমি পারছি না এত যন্ত্রণা নিতে। বাকি জীবনটা সুন্দর করে উপভোগ করতে পারলাম না, ভালো থেকো, আজকের দিনেও তোমার যন্ত্রণা আমি নিতে পারছি না। আমার পরিবার থেকে যে যৌতুকের টাকা তোমাদের দিয়েছে সেগুলো শোধ করে দিও। তুমি আমাকে বাঁচতে দিলে না, আমি বাঁচতে পারতাম যদি আমি বেশি মান-সম্মানওয়ালা পরিবারে জন্মগ্রহণ না করতাম। সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিও। আর আমার পোস্টমর্টেম করে আমার সব যন্ত্রণা ধুয়ে মুছে আমাকে কবরে পাঠিয়ো।’

চিরকুটের শেষে রিমা আরও লিখে গেছেন, ‘আর আমার পরিবারকে বলছি মোরশেদকে তোমরা ছাড়বে না। ওকে ওর প্রাপ্য শাস্তি তোমরা দিবা।’

ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার (২৮ জুন) সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় রিমা আকতারকে। ঘটনার পর থেকেই প্রেমিক মোরশেদ ও তার পরিবারের লোকজন ঘরে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যায়।

রিমার বাবা মনির আহমদ ঘটনার জন্য হবু স্বামী মোরশেদকে দায়ী করে তার শাস্তি চেয়ে বলেন, ‘তার লোভের বলি হয়েছে আমার আদরের মেয়ে। তারা বরযাত্রীর পরিবর্তে টাকা চেয়েছে, তাতেও আমরা রাজি হয়েছি। তারা কোন কিছু (যৌতুক) দাবি নেই বলে আসলেও বিয়ের কয়েকদিন আগ থেকে একের পর এক যৌতুক দাবি করে আসছিল। আমি তার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের কাছে এর উপযুক্ত বিচার দাবি করছি।’

নিহত রিমার ভাই আজগর হোসেন বলেন, ‘বিয়েতে বরযাত্রী খাওয়া দাওয়া বাবদ মোরশেদের পরিবারকে নগদ দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। তারপরও আমার বোনের কাছে যৌতুক হিসেবে ফার্নিচার, টিভি, ফ্রিজ এবং বিয়ের খরচ হিসেবে আরো নগদ টাকা দাবি করে। উভয়ের প্রেমের সম্পর্ক থাকার পর যৌতুক দাবি করার অপমান সইতে না পেরে আমার বোন আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তারা যে এতটা যৌতুকলোভী হবে আমরা জানতাম না। নিজের প্রাণ দিয়ে আমার বোন তাদের মুখোশ উম্মোচন করে দিয়ে গেছে। মৃত্যুর আগে সে সুই সাইড নোটে নানা কথা লিখে রেখে গেছে।’

পটিয়া থানার ওসি জসীম উদ্দীন বলেন, ঘটনার পর থেকেই আসামি মোরশেদ পালিয়ে যায়। সে গত ৬ দিনে সে দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে ছিল। আমাদের বিশেষ টিম দেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে মঙ্গলবার রাতে সিলেট থেকে তাকে আটক করেছে।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!