অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘চুয়েটিয়ানস ইন অস্ট্রেলিয়া’র বার্ষিক মিলনমেলা ও গালা নাইট অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গত ৮ আগস্ট নিউসাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যের সিডনির স্কাইভিউ ফাংশন সেন্টার, লিভারপুলে বিকেল সাড়ে চারটায় শুরু হওয়া এ আয়োজন গড়ায় গভীর রাত পর্যন্ত।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এবং সিডনি, মেলবোর্ন, পার্থ, অ্যাডিলেড ও ব্রিসবেন থেকে আসা চুয়েট প্রাক্তনরা সপরিবারে যোগ দেন অনুষ্ঠানে। হলজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। শিশু-কিশোরদের ছোটাছুটি, সহপাঠীর সঙ্গে দেখা হওয়ার আবেগ আর প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা ভুলে একটি সন্ধ্যা একসঙ্গে কাটানোর আনন্দ—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে একান্তই পারিবারিক।
বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় গালা নাইট ২০২৬-এর। চুয়েটের উপাচার্যের ধারণকৃত শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রচারিত হয় বড় পর্দায়, যা উপস্থিত সবার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নাড়ির টান নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বছরজুড়ে সংগঠনের কার্যক্রম, সদস্যদের সহযোগিতা ও আগামী দিনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সিডনির বাংলাদেশ কনস্যুলেটের অতিথিদের পাশাপাশি বুয়েট, কুয়েট ও রুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
‘স্মৃতিচারণ পর্বে’ প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ফিরে যান পাহাড়ঘেরা চুয়েট ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে—হলজীবন, ক্লাস ফাঁকি, বন্ধুত্ব আর তারুণ্যের সেই দিনগুলোর গল্পে অনেকের চোখই ছিল ছলছল।
অনুষ্ঠানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সম্মাননা প্রদান পর্ব। পেশাগত অর্জন, একাডেমিক উৎকর্ষ ও কমিউনিটির প্রতি নিবেদিত সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।
এইচএসসিতে উচ্চতম এটিএআর ক্যাটাগরিতে সম্মাননা পায় দুই কৃতী শিক্ষার্থী—৯৯ দশমিক ৮৫ এটিএআর অর্জনকারী আয়ান আজহার (ড. সাবরিনা আলীর সন্তান) এবং ৯৯ দশমিক ২০ এটিএআর অর্জনকারী প্রমিতি সরকার (অধ্যাপক প্রবীর সরকারের সন্তান)।
রিকগনিশন অ্যান্ড অ্যাপ্রিসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড পান অধ্যাপক জিএম শফিউল্লাহ। পার্থের মার্ডক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
কমিউনিটি সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড পান তিনজন—নাজিম ওয়ালিদ (৯৮, যন্ত্রকৌশল); এহতেশামুল হক (৯৪, যন্ত্রকৌশল); এবং মেলবোর্নে ভিক্টোরিয়া অ্যাডমিন প্যানেলের সদস্য ড. মহসিন আহমেদ (৯৪, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল)।
এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড পান চারজন কৃতী প্রকৌশলী ও গবেষক। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক তাফসিরোজ্জামান (০৯, পুরকৌশল); মেলবোর্নের ভিক্টোরিয়া পুলিশ সদর দপ্তরসহ একাধিক আলোচিত প্রকল্পে কাজ এবং মিগলিক ম্যাকলিওডে অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর ও পার্টনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য জয়নাল আবেদীন (০২, পুরকৌশল); সিসকোর মর্যাদাপূর্ণ ‘সিসিআইই অটোমেশন’ সনদ অর্জন করে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ব্যক্তি হওয়ার কৃতিত্বে সুশীল ভট্টাচার্য (৯৭, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল); এবং ২০২৫ সালে ‘উইমেন ইন এইচভিএসিআর—টপ ২০’-এ অস্ট্রেলিয়াজুড়ে নির্বাচিত ২০ জন নারীর একজন হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় তাশফিয়া নুসরাত (০৮, যন্ত্রকৌশল)।
সংগঠনের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির তার বক্তব্যে সম্মাননাপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, প্রবাসের মাটিতে চুয়েটিয়ানদের এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত নয়—এটি পুরো কমিউনিটির গর্ব। তিনি নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
নৈশভোজ ও ফটোসেশনের পর শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক পর্ব। ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি’ সমবেত সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ পর্বে ছিল দলীয় সংগীত, একক পরিবেশনা, নৃত্য ও আবৃত্তি। সন্ধ্যার মূল আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী নকীব খানের পরিবেশনা। তার কণ্ঠে একের পর এক জনপ্রিয় গান শুনে দর্শক-শ্রোতারা কণ্ঠ মেলান, অনেকে নেমে পড়েন নাচে। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মধ্যে দেশের গান, দেশের সুর যেন এক টুকরো বাংলাদেশকেই হাজির করে লিভারপুলের সেই মিলনায়তনে।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে বিশেষ অতিথি নকীব খানকে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন সংগঠনের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম।
আয়োজকেরা জানান, অনুষ্ঠান সফল করতে সহযোগিতার জন্য তারা সব পৃষ্ঠপোষক, স্বেচ্ছাসেবক ও অংশগ্রহণকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ। ২০২৭ সালের মিলনমেলা আরও বড় পরিসরে আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে শেষ হয় দিনব্যাপী এ আয়োজন।




