সার্জনের প্যাকেজে ‘বন্দি’ অ্যানেস্থেটিস্টের ফি, আগ্রহ হারাচ্ছেন ডাক্তাররা

অ্যানেস্থেসিয়ায় অনাগ্রহ সার্জারির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে

একজন রোগীর অপারেশনে সার্জনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন অ্যানেস্থেটিস্ট বা অবেদনবিদ। কিন্তু চট্টগ্রামে সেই অ্যানেস্থেটিস্টরাই পাচ্ছেন না তাদের নির্ধারিত ফি। শুধুমাত্র সার্জনদের দেওয়া থোক টাকা নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। মূলত সার্জারির ডাক্তারদের ‘টিম চার্জ’ নামে প্যাকেজের মধ্যেই ‘বন্দি’ অ্যানেস্থেটিস্টদের ফি। ফলে অ্যানেস্থেটিস্টের পেশায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে ডাক্তারদের। এমডি, এফসিপিএস কিংবা ডিপ্লোমা ট্রেনিংয়ে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা অংশগ্রহণ করতে চান না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগীর অপারেশনে সার্জনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন অ্যানেস্থেটিস্ট। কিন্তু এ কাজে যদি ডাক্তারদের মধ্যে অনীহা তৈরি হয় তাহলে তা ভবিষ্যতে সার্জারির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

অ্যানেস্থেটিস্টদের দাবি, সার্জনদের বদলে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফি নির্ধারণ করুক। কিন্তু সার্জনরা তাদের এ দাবির সঙ্গে একমত নন।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেলের অ্যানেস্থেসিওলজি বিভাগে কর্মরত আছেন বিভাগীয় প্রধান ১ জন, অধ্যাপক ২ জন, সহযোগী অধ্যাপক ৩ জন। জুনিয়র কনসালট্যান্ট ৫ জন, মেডিকেল অফিসার রয়েছেন ১২ জন। তবে সহকারী অধ্যাপক ৪ জনের জায়গায় কেউ কর্মরত নেই।

আরও জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেলের অ্যানেস্থেসিওলজি বিভাগে এমডি, এফসিপিএস ও ডিপ্লোমা ট্রেনিংয়ের জন্য বর্তমানে ৪৪ জন অ্যানেস্থেটিস্ট প্রেষণে কর্মরত আছেন। এর মধ্যে মাত্র ৫ জন সরকারি হাসপাতালের।

এদিকে গত মে মাসে চট্টগ্রামের প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালের সার্জনদের সঙ্গে বৈঠকে অ্যানেস্থেটিস্টরা ৫০ শতাংশ ফি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। ১৫ মে অ্যানেস্থেটিস্টদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেস্থেসিওলোজি ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড পেইন ফিজিশিয়ানস (বিএসএ-সিসিপিপি)’ চট্টগ্রাম শাখা লিখিতভাবে এই দাবি জানায়।

চট্টগ্রাম মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের এনেস্থেসিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘সার্জন অপারেশনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে, ক্লিনিক কিংবা বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তাদের পছন্দমতো অ্যানেস্থেটিস্টকে ফোন করতে বলেন। সার্জন অপারেশনের সময় টিমচার্জের নামে অ্যানেস্থেটিস্টের টাকাসহ পুরো টাকা নিয়ে নেন। এ পেশায় তাই স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা নেই। কিন্তু ১৫ বছর আগেও এই সিস্টেম ছিল না। এটা মূলত থোক বরাদ্দ।’

তিনি আরও বলেন, ‘অপাশেনের আগে প্রি-অ্যানেস্থেসিয়া চেকআপ করা দরকার। কিন্তু বেশি টাকা দিতে হবে দেখে চেকআপের জন্য অ্যানেস্থেটিস্টদের ডাকেন না সার্জনরা। কিন্তু এটি ম্যান্ডেটরি। আবার অপারেশন পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অ্যানেস্থেটিস্টকে দু’বার আসতে হবে। এর জন্য আলাদা ফি দিতে হবে। কিন্তু সার্জনরা তা করেন না। আর এজন্য কোয়ালিটি সার্জিক্যাল হচ্ছে না। অপারেশনের আগে একজন অ্যানেস্থেটিস্টকে ১ ঘণ্টা আগে আসতে হয়। সার্জনদের চেয়ে অ্যানেস্থেটিস্টের অপারেশনে শ্রম কম থাকে না।’

ডা. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘ক্লিনিকের মাধ্যমে গেলে আমরা আমাদের প্রাপ্যটা পেতাম, সম্মান থাকতো। শতকরা ৮০ ভাগ সার্জন অপারেশন চার্জ প্যাকেজের মাধ্যমে নিয়ে থাকেন। কিন্তু সার্জনরা অপারেশন চার্জ নিজেরাই ডিলিং করে থাকেন।’

তবে অ্যানেস্থেটিস্টদের এই দাবির সঙ্গে একমত নন সার্জনরা। অ্যানেস্থেটিস্টদের ফি বাড়ালে তা রোগীর ওপর চাপ তৈরি করবে।

এ বিষয়ে কথা হয় ‘অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)’ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ডা. কামরুন্নেচ্ছা রুনার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অ্যানেস্থেটিস্টদের দাবির যৌক্তিকতা আছে। কিন্ত সেটা একজন সার্জনের সঙ্গে কম্পারিজম না। একটা অপারেশনে সার্জনকে শেষ থেকে শুরু পর্যন্ত থাকতে হয়, অপারেশন পরবর্তী রোগীর অনেক ধকল সামাল দিতে হয়। তাই অ্যানেস্থেটিস্টরা যে ফি’র কথা বলছেন, সেটি বাস্তবায়ন করতে গেলে রোগীর কাছ থেকেই সেই টাকা আদায় করতে হবে। রোগীর অপারেশন চার্জও তখন বেশি হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বিএমএ সভাপতি ডা. মুজিবুল হককে নিয়ে বিএসএ-সিসিপিপি’র চট্টগ্রাম শাখার সঙ্গে বসেছিলাম। আমাদের সঙ্গে অ্যানেস্থেটিস্টদের একটা সমঝোতা হয়েছে। আমরা বলেছি, একটা স্ট্যান্ডার্ড অ্যামাউন্ট হবে অ্যানেস্থেটিস্টদের। তবে সেটি কত, তা অপারেশনের দিনই নির্ধারণ হবে। মিটিংয়ের পর আাশা করছি অ্যানেস্থেটিস্টদের সঙ্গে সার্জনদের মতবিরোধের ধোঁয়াশা কেটে যাবে।’

অপাশেনের আগে প্রি-অ্যানেস্থেসিয়া চেকআপ প্রসঙ্গে ডা. রুনা বলেন, ‘চট্টগ্রামে অ্যানেস্থেটিস্টের সংখ্যা কম। আমরা সার্জনরা মূলত সরকারি হাসপাতালে কর্মরত অ্যানেস্থেটিস্টদের প্রেফার করে থাকি। কিন্তু অ্যানেস্থেটিস্টদের সংখ্যা কম হওয়ায় প্রি-অ্যানেস্থেসিয়ার সুযোগ থাকে না। আর আমরা বিভিন্ন ইনভেস্টিগেশন-ডায়াগোনেসিস করে শিওর হই, রোগী অপারেশনের জন্য ক্যাপবল কি-না। যদি তা না হয়, আমরা নিজেরাই অ্যানেস্থেটিস্টদের কাছে রোগীদের পাঠাই।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!