সাফা-মারওয়া পাহাড় : আল্লাহর কুদরতের অনন্য নিদর্শন

মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো হজ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি এই মহান ইবাদত প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ফরজ। হজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আমলের মধ্যে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ওয়াজিব ইবাদত। পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে অবস্থিত এ দুই পাহাড় মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসার এক অবিস্মরণীয় প্রতীক।

সাফা ও মারওয়া মূলত মক্কার আবু কুবাইস ও কাইকান পর্বতমালার অংশবিশেষ। হজ ও ওমরার সময় হাজিদের এ দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথে সাতবার আসা-যাওয়া করতে হয়, যাকে ‘সাঈ’ বলা হয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন—

“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যারা কাবাঘরে হজ বা ওমরা পালন করে, তাদের জন্য এ দুই স্থানে সাঈ করায় কোনো দোষ নেই।”
— (সূরা আল-বাকারা : ১৫৮)

মক্কা মূলত পাহাড়বেষ্টিত একটি নগরী। কাবা শরিফের পূর্বদিকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সাফা ও মারওয়া পাহাড়। যুগ যুগ ধরে এ দুই পাহাড় মুসলিম হৃদয়ে গভীর আবেগ ও পবিত্রতার প্রতীক হয়ে আছে। আল্লাহতায়ালা হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে হজের যে আনুষ্ঠানিকতাগুলো শিক্ষা দিয়েছিলেন, তার অন্যতম ছিল সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করা।

সাফা-মারওয়ার ইতিহাস জড়িয়ে আছে হজরত হাজেরা (আ.) ও তাঁর শিশু পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর স্মৃতির সঙ্গে। আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে জনমানবহীন মরুভূমিতে রেখে চলে গেলে খাদ্য ও পানির সংকটে পড়েন হাজেরা (আ.)। শিশুপুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর তৃষ্ণা ও কষ্ট দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন।

তাঁর এই আকুলতা, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস আল্লাহতায়ালার নিকট এতই প্রিয় হয়েছিল যে, কিয়ামত পর্যন্ত আগত হজ ও ওমরাকারীদের জন্য এ আমলকে ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানেও লাখো মুসল্লি গভীর আবেগ ও বিনয়ের সঙ্গে সেই স্মৃতিময় পথে সাঈ সম্পন্ন করেন।

বর্তমানে সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী পথকে আধুনিকভাবে সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যাতে বিপুলসংখ্যক হাজি সহজে সাঈ করতে পারেন। তিনতলা বিশিষ্ট চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাহাড়দ্বয়ের কিছু অংশ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, যাতে ঐতিহাসিক স্মৃতি অটুট থাকে।

সাঈ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক জীবন্ত শিক্ষা। হাজেরা (আ.) জানতেন, আল্লাহ চাইলে যেকোনো মুহূর্তে সাহায্য করতে পারেন। তাই কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি হতাশ হননি; বরং চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার ফলেই আল্লাহতায়ালা শিশু ইসমাঈল (আ.)-এর পায়ের নিচ থেকে বের করে দেন পবিত্র জমজম কূপের পানি।

বর্ণিত আছে, পানি প্রবাহিত হতে দেখে হাজেরা (আ.) বলছিলেন, “জমজম, জমজম”—অর্থাৎ থামো, থামো। সেই থেকেই এ বরকতময় পানির নাম হয় ‘জমজম’। এই পানি শুধু তৃষ্ণা নিবারণের মাধ্যম নয়; বরং এটি আল্লাহর রহমত, কুদরত ও অশেষ অনুগ্রহের প্রতীক।

সাফা-মারওয়ার সাঈ মুসলমানদের জন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে—

প্রথমত : আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখা।
হাজেরা (আ.) বিশ্বাস করেছিলেন, আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে ধ্বংস হতে দেন না। কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি আল্লাহর রহমতের ওপর আস্থা রেখেছিলেন।

দ্বিতীয়ত : তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি চেষ্টা করা।
শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করেই বসে থাকেননি হাজেরা (আ.)। তিনি নিজে চেষ্টা করেছেন, দৌড়েছেন এবং উপায় অনুসন্ধান করেছেন। ইসলামে তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি প্রচেষ্টার গুরুত্ব এখানেই স্পষ্ট।

তৃতীয়ত : অপ্রত্যাশিত উৎস থেকেও রিজিক আসতে পারে।
আল্লাহতায়ালা এমন স্থান থেকেও সাহায্য করেন, যা মানুষের কল্পনার বাইরে। মরুভূমির বুকে জমজম কূপের সৃষ্টি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সাফা ও মারওয়ার সাঈ আমাদের বিনয়, ধৈর্য, দোয়া ও আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়। তাই এ স্থানে দাঁড়িয়ে মুসলমানরা নিজেদের গুনাহের ক্ষমা, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও মুক্তির জন্য দোয়া করেন।

মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে সাফা-মারওয়ার তাৎপর্য অনুধাবন করে আন্তরিকতার সঙ্গে হজ ও ওমরার আমল সম্পাদনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

ksrm