সাজা শেষেও মুক্তি মিলছে না বাদল ফরাজীর, ৭ দিনের আল্টিমেটাম

বিনা অপরাধে ১৮ বছর ধরে কারাগারে বন্দি মোংলার যুবক বাদল ফরাজীর মুক্তির জন্য এবার মানববন্ধন করেছেন তাঁর স্বজন ও মানবাধিকার কর্মীরা। এর মধ্যে নামের ভুলের কারণে তিনি ভারতের জেলে ছিলেন ১০ বছর এবং বাংলাদেশে আনার পর আরও ৮ বছর ধরে কারাবাস করে যাচ্ছেন।

সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে বাদল ফরাজীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সরকারকে সাতদিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে।

মানববন্ধনে বাদল ফরাজীর বড় বোন আকলিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলের মুক্তির আশায় থাকতে থাকতে আমার বাবা পরপারে চলে গেছেন। মা এখন মৃত্যুশয্যায়। মরার আগে তিনি শুধু একবার তার নির্দোষ ছেলের মুখটা দেখে যেতে চান। ১৮ বছর পার হয়ে গেল, আর কত অমানবিকতা সইব? আমার ভাই তো কোনো অপরাধ করেনি, তবে কেন এই দীর্ঘ কারাবাস?
আকলিমা আরও জানান, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর কাশিমপুর কারাগারে সর্বশেষ ভাইয়ের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বারবার আবেদন করেও শুধু আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই মেলেনি। বর্তমান সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, আমার ভাইকে দ্রুত আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিন।

মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে ‘বাদলের কারাবাস’ গ্রন্থের লেখক রাহিতুল ইসলাম বলেন, ‘শুধুমাত্র নামের আংশিক মিল থাকায় একজন মানুষের জীবন থেকে ১৮টি বছর কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ভারতের আইন অনুযায়ী চার বছর আগেই তার সাজা শেষ হয়েছে। অথচ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তিনি এখনো বন্দি। এর চেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন আর কী হতে পারে? আমরা অবিলম্বে বাদল ফরাজীর মুক্তি চাই।

মানবিক সংগঠন ‘প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা পাভেল বাবু বলেন, বাদল ফরাজি কোনো অপরাধী নন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে তাকে মুক্তি দিতে হবে। আগামী সাতদিনের মধ্যে সরকার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না নিলে আমরা কঠোর কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামব।
সাংবাদিক আর কে জ্যান বলেন, সাজা শেষ হওয়ার পরেও আইনি মারপ্যাঁচে একজন নিরপরাধ মানুষ অপরাধীর মতো জীবন কাটাচ্ছেন। এখানে আইনি জটিলতার চেয়েও বড় সমস্যা হলো সরকারের সদিচ্ছার অভাব। দুইবার সরকার পরিবর্তন হলেও বাদলের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

মানববন্ধন থেকে একগুচ্ছ দাবি উত্থাপন করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে ভুল বিচারের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, এবং অতিরিক্ত কারাবাসের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা। এছাড়াও ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ ও বাদল ফরাজীর জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের দাবি জানানো হয়।

আয়োজকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী সাতদিনের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া গেলে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে অবস্থান ধর্মঘটসহ আরও কঠোর কর্মসূচি পালন করা হবে।

২০০৮ সালে তাজমহল দেখতে ভারতে গিয়ে ‘নাম বিভ্রাটের’ শিকার হন মোংলার যুবক বাদল ফরাজী। দিল্লির অমর কলোনির এক হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ‘বাদল সিং’ ভেবে তাকে আটক করে বিএসএফ। ভারতের আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়ার পর ২০১৮ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ভারতের আইন অনুযায়ী ২০২২ সালের ২০ জুলাই তাঁর ১৪ বছরের সাজা পূর্ণ হলেও, আইনি ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মারপ্যাঁচে আজও গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে বন্দি রয়েছেন এই নিরপরাধ যুবক।

ksrm