সাগরে দুই মাস ইলিশ ধরা বন্ধ, নিষেধাজ্ঞায় থাকছে না চট্টগ্রাম

জাটকা রক্ষায় সাগরে দুই মাস ইলিশ ধরা নিষেধ। তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ নিষেধাজ্ঞা থাকবেনা। চট্টগ্রামের জেলেরা সাগরে ইলিশ ধরতে পারবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য কর্মকর্তারা। এ নিষেধাজ্ঞা শুধু পদ্মা ও মেঘনার ইলিশ অভয়ারণ্যের জন্য।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা থেকে চট্টগ্রামমুক্ত। কারণ চট্টগ্রামকে ইলিশের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করেনি সরকার। তাই চট্টগ্রামের জেলেরা সাগরে ইলিশ ধরতে পারবে।

জানা গেছে, ১ মার্চ থেকে ২ মে পর্যন্ত ইলিশ ধরা, বিক্রয় ও পরিবহনে সরকারের এ দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। কিন্তু সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা শুধুই পদ্মা ও মেঘনার অভয়ারণ্যের জন্য।

নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর এখানকার পদ্মা ও মেঘনা নদীর ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ অঞ্চল ইলিশের অভয়ারণ্যে থেকে ইলিশ ধরা যাবেনা। চাঁদপুর সদর উপজেলার চরভৈরবী থেকেও ৯০ কিলোমিটার অভয়ারণ্য হিসাবে বিবেচিত। নিষেধাজ্ঞা বিবেচিত জেলার সকল উপজেলা এই নিষেধাজ্ঞার কঠোর প্রয়োগের জন্য স্বতন্ত্র কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করেছে। এ নিষেধাজ্ঞা ২ মে তোলা হবে।

ইলিশ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম জানান, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বিপুল পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়েছিল যা ইলিশ মাছ ধরার মৌসুম হিসাবে বিবেচিত হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের আশা এই নিষেধাজ্ঞার ফলে উৎপাদন বাড়বে।

একক মাছের প্রজাতি হিসেবে দেশের মাছ উৎপাদনে ইলিশের সর্বাধিক অবদান রয়েছে। দেশের মৎস্য উৎপাদনের ১২.০৯ শতাংশের বেশি আসে ইলিশ থেকে। ২০১৭ ও ১৮ সালে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫.১৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। যার আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা।

এবারও শীর্ষে বাংলাদেশ

পৃথিবীতে ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে। বাংলাদেশ মোট ইলিশ উৎপাদনের ৮০ শতাংশ আহরণ করে। গত বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ তথ্য জানানো হয়।

সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইলিশের বিচরণ এখন শুধু চাঁদপুর, বরিশাল ও ভোলায় সীমাবদ্ধ নয়। রাজশাহী, রংপুর ও বৃহত্তর সিলেটে বিভিন্ন নদ–নদী ও হাওরে এখন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্য নাজমা আকতার, শামীমা আক্তার খানম এবং কানিজ ফাতেমা আহমেদ বৈঠকে অংশ নেন।

সরকারি মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, মা ইলিশ বলতে প্রজননক্ষম পরিপক্ব স্ত্রী ইলিশ মাছ বোঝায়। ইলিশ আহরণে প্রথম বাংলাদেশ। বিশ্বে আহৃত ইলিশের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ আহরণ করা হয় এই দেশে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিরদিনের জন্য স্থান পেল বাংলার ইলিশ।

মা ইলিশ নিধন রোধে এবং ইলিশের অবাধ প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর ৯ অক্টোবর থেকে ২২ দিন অর্থাৎ ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত (২৪ আশ্বিন থেকে ১৪ কার্তিক) ইলিশ প্রজনন এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ সময় ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রের চারটি পয়েন্ট দ্বারা পরিবেষ্টিত সাত হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় সব নদ-নদীতে এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।

চারটি পয়েন্ট হলো—মিরসরাই, চট্টগ্রামের মায়ানী, তজুমদ্দিন ও ভোলার পশ্চিমে সৈয়দ আওলিয়া, কুতুবদিয়া ও কক্সবাজারের উত্তর কুতুবদিয়া এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও লতাচাপালী পয়েন্ট। এ সময় সারা দেশে ইলিশ মাছের আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞার আইন অমান্যকারীকে কমপক্ষে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে।

অন্য অনেক মাছ, কাঁকড়া কিংবা চিংড়ির মতো ইলিশ মাছও প্রজননের ক্ষেত্রে চন্দ্রনির্ভর আবর্তন অনুসরণ করে। প্রতিবছর আশ্বিন মাসের প্রথম উদিত চাঁদের পূর্ণিমার আগের চার দিন, পরের ১৭ দিন এবং পূর্ণিমার দিনসহ মোট ২২ দিন এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১১ দিন, ২০১৫ সালে ১৫ দিন নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও ২০১৭ সালে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়। ইলিশ মূলত সারা বছর কমবেশি ডিম ছাড়লেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ সময়ই প্রায় ৮০ শতাংশ ইলিশ ডিম ছাড়ে।

বৈচিত্র্যময় জীবন ইলিশের। ইলিশ প্রধানত সামুদ্রিক মাছ হলেও প্রজননকালীন এ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য বেছে নেয় স্বাদু পানির উজানকে। এ সময় এরা বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের নদীতে আগমন করে। যেমনটা বাঙালি কোনো সন্তানসম্ভাবনা মেয়ের বাবার বাড়িতে যাওয়ার মতো। এ সময় বর্ষায় এ দেশের নদীগুলো মা ইলিশে ভরে ওঠে। এ সময় ইলিশ দৈনিক প্রায় ৭১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। প্রজননের উদ্দেশ্যে ইলিশ প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার উজানে পাড়ি দিতে সক্ষম। সাগর থেকে ইলিশ যত ভেতরের দিকে আসে ততই শরীর থেকে লবণ কমে যায়। এতে স্বাদ বাড়ে ইলিশের। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৯-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন।

সুত্রমতে, চলতি বছর ইলিশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে ইলিশের উৎপাদন ছিল দুই লাখ ৯৯ হাজার টন, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়ে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ইলিশের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের ২০০২ থেকে ২০১৮ সালে ইলিশের জোগান ৫৬ শতাংশে কমেছে, সেখানে বাংলাদেশে ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জাটকা আজ মেঘনা থেকে পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। গত ৯ বছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। সামনের মৌসুমে বেড়ে ১০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফল বলছে, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে এই মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি ইলিশ একসঙ্গে কমপক্ষে তিন লাখ ও সর্বোচ্চ ২১ লাখ ডিম ছাড়ে। এসব ডিমের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ফুটে রেণু ইলিশ হয়। এর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে ইলিশে রূপান্তরিত হয়।

মৎস্যজীবীদের মতে, ইলিশ শুধু জাতীয় মাছ ও সম্পদ নয়। বহু মানুষের জীবন-জীবিকা ইলিশের ওপর নির্ভর করে। উপকূলীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রায় পাঁচ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইলিশ পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত। ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকালে বর্তমান সরকার নিবন্ধিত জেলেদের ভিজিএফের (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) আওতায় পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চাল দিয়ে থাকে। পাশাপাশি এ সময় জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মৎস্যজীবী জেলে ও ইলিশ আহরণের পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নসহ গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ইলিশের। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি আসে ইলিশ থেকে। মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশই হচ্ছে ইলিশ। এই মাছের চাহিদা রয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই।

জাতীয় মাছ ইলিশের মোট উৎপাদনের ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে হচ্ছে। সম্ভাবনার ইলিশকে তাই রক্ষা করতে হবে যেকোনো মূল্যে। এটা করতে হবে নিজেদের স্বার্থেই। বর্তমানে ২০ মে থেকে ৬৫ দিনের জন্য বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার; যার ফলে সমুদ্রে ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য সামুদ্রিক প্রজাতির উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এসএ

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!