s alam cement
আক্রান্ত
৭৬৩২৬
সুস্থ
৫৪১৬১
মৃত্যু
৮৯৭

সাগরিকার হাটে হুঙ্কার ছাড়ছে বিগবস কালোতুফান শাহেনশাহ লালজ্বীন

0

২৮ মণ ওজনের ‘বিগবস’ থেকে মাংস মিলবে ১৯ মণ। সাড়ে পাঁচ ফুট বাই ৭ ফুটের এই গরুর প্রতিদিনের খাবার ও দেখভালের জন্য খরচ যায় দেড় হাজার টাকা। ‘বিগবস’ খায় পাতাভুষি ১০ কেজি, চিকন ঘাস ও খড়। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ব্যাপারি আব্দুল হক ৫ বছর আগে ৪ মাসের বাছুর কিনে পালন করতে শুরু করেন। পালনের শুরু থেকেই ‘বিগবস’ বাকি সব গরু থেকে ছিল আলাদা। আবদুল হকের খামারে আছে আরও ২৮টি গরু।

চট্টগ্রাম নগরীর সাগরিকা হাটে গরুটি বিক্রির জন্য ব্যাপারি আব্দুল হক দাম চাইছেন ২০ লাখ টাকা। এ দামেই তিনি বিক্রি করতে চান। তিনি তার এ সিদ্ধান্তে আর একদিন অনড়ই থাকবেন। তবে একদিন পর ক্রেতাদের আনাগোনা ও বিক্রির গতিবিধি দেখে দাম কমাতেও পারেন। এ গরুই তিনি আরও কমেও বিক্রি করতে পারেন।

বিগবস কিংবা ছোট বসই শুধুই নয়— অন্যান্য ব্যাপারির কালো তুফান, আঁধারমানিক, কালোপাহাড়, শাহেনশাহ, ধলাপাহাড়, বাহাদুর, নবাব, কালাজ্বীন, লালজ্বীনের মত বড় গরুর দাম কমবে কিনা তা জানা যাবে আরও একদিন পর। ছোট ও মাঝারি গরুর দামও কমবে কিনা তাও জানা যাবে একদিন পরেই।

বুধবার (২১ জুলাই) কোরবানির ঈদ। সে হিসেবে মঙ্গলবার (২০ জুলাই) মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে গরু বিক্রি।

এদিকে সাগরিকা হাট ঘুরে ক্রেতাদের ভিড় এখনও তুলনামূলক কমই দেখা গেছে। গরু বিক্রি কমই দেখা গেছে। ক্রেতারাও বাজারের হালচাল বোঝার চেষ্টা করছেন। অনেকে দাম জেনে, হাট ঘুরে চলে যাচ্ছেন।

সাগরিকা মূল হাটের বাইরে আলিফ হোটেল রোডেই বসেছে হাটের বর্ধিত অংশ। সেখানে আব্দুল হকের বিগবসের সাথে রাখা অন্য গরুর নাম জানা গেল ‘ছোট বস’। ছোটবস গরুটির ওজন ২৪ মণ। জবাইয়ের পর মাংস হবে ১৪ থেকে ১৫ মণ। দৈর্ঘ্য ৮ ফুট। উচ্চতা সাড়ে ৩ ফুট। গরুটির দাম হাঁকছেন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা।

Din Mohammed Convention Hall

চট্টগ্রাম নগরীর সিটি গেটের পাশে শাপলা আবাসিক এলাকায় সুফিয়া ডেইরি ফার্ম থেকে দুটো গরু হাটে বিক্রির জন্য এনেছেন ব্যাপারি আমির হোসেন। এর একটি কালো তুফান আর অন্যটি আদরের মানিক। দুটোই ফিজিয়ান ষাঁড়— যাকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘বিরিশ’ বলে থাকে।

কালো কুচকুচে এ গরুর বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। কালো তুফানের পিছনে প্রতিদিন খরচ হয় ৫০০ টাকা। গমের ভুষি, ভুট্টা, সয়াবিন, মসুর ডাল, চালের গুঁড়ো লাগে দিনে ১২ কেজি। এছাড়া রয়েছে কাঁচা ঘাস ও শুকনো খড়।

ব্যাপারি আমির হোসেন জানান, কালো তুফানের ওজন ৩০ মণ। জবাইয়ের পর মাংস হবে ১৮ মণ। দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ও উচ্চতা ৬ ফুট।

কালো তুফানের দাম হাঁকা হচ্ছে ১৩ লাখ টাকা। তবে বিক্রিবাট্টা মন্দা হলে একদিন পর এটি তিনি ৮ লাখ টাকাতেও বিক্রি করতে রাজি হবেন। কমে সেটি ৬ লাখেও আসতে পারে— জানান ব্যাপারি আমির হোসেন। কালো তুফান সম্পর্কে ব্যাপারি জানান, এ গরুকে দিনে ৩ থেকে ৪ বার গোসল করিয়ে দিতে হয়। সারাদিন ফ্যান চালাতে হয়।

কালো মানিকের পাশে যে গরুটি রাখা আছে তার নাম ‘আদরের মানিক’। একই ব্যাপারির এ গরুটিও। সাড়ে চার বছর আগে ফিজিয়ান শাহীওয়াল গরু ক্রসম্যাচিংয়ে এ গরুর জন্ম। ‘আদরের মানিকের’ পিছনে ও দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা খরচ হয়। খাবার খায় কালো তুফানের খাবারের মতোই খাবার। এই গরুর ওজন ২৫ মণ, মাংস হবে ১৬ মণ। উচ্চতা ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি ও লম্বা সাড়ে ৯ ফুট। এই গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ১২ লাখ টাকা।

সাগরিকা গরুর হাট ঘুরে দেশি প্রজাতির গরুর পাশাপাশি ভারতীয় গরুর আধিক্য দেখা গেছে। ভারতীয় গরুর ব্যাপারিরা মূলত এসেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। আবার চট্টগ্রামের ব্যাপারিরাও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ভারতীয় গরু এনেছেন বিক্রির জন্য।

এদেরই একজন মো. মুছা। চট্টগ্রামের পটিয়ার ভাটিখাইনে বাড়ি। হাটে ভারতীয় বড় সাইজের গরু এনেছেন ৩০টি। গরুগুলোর দাম জানালেন ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ। তিনি জানান, গত বছরের কোরবানির ঈদে যে গরু বিক্রি করেছেন, এই ঈদে সেই সাইজের গরু ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি চাইছেন। কেন বেশি— এর কারণ হিসেবে নাজিম উদ্দিন বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার যাতায়াত ভাড়া, গরুর খাবার, ডোগা খরচ প্রায় দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। তিনি হাটে এনেছেন ১৮টি বড় সাইজের গরু। গরুগুলোর দাম ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত।

সাত্তার ব্যাপারি কুমিল্লা থেকে ৩৬টি দেশি মাঝারি সাইজের গরু এনেছেন। গরুভেদে দাম চাইছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে আড়াই লাখ টাকা। গত বছর মাঝারি সাইজের যে গরু ৮০ থেকে ৯০ হাজারের মধ্যে বিক্রি করেছেন তা এখন চাইছেন ১ লাখের ওপরে। তবে একদিন পর সিদ্ধান্ত নেবেন এ দামেই গরু বিক্রি করবেন নাকি এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করবেন গরু।

কুমিল্লার অন্য ব্যাপারি হাবিবুর রহমান বলেন, একটা রিস্ক (ঝুঁকি) নিতে চাচ্ছি। কপালে যা থাকে। তারপর পরিস্থিতি বুঝে দাম বাড়াব, না হয় এ দামেই রাখব। কপাল খারাপ হলে গতবারের দামেই বিক্রি করব।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থেকে আসা ব্যাপারি তালেবসহ ৬ জন গরু বিক্রি করতে এসেছেন সাগরিকা হাটে। তাদেরই একটা গরুর নাম বাহাদুর। ওজন ২৩ থেকে ২৪ মণ। মাংস হবে ১৪ মণ। উচ্চতা ৫ ফুট ও দৈর্ঘ্য ১০ ফুট। বাহাদুরের দাম হাঁকা হচ্ছে ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তবে ৪ লাখ টাকা দামে পেলেই ছেড়ে দেবেন জানান— ব্যাপারি তালেব। জবাইয়ের পর ২ মণ মাংস হবে এমন ছোট সাইজের গরুর দাম হাঁকা হাচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। গত বছর সেটি ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা ব্যাপারি আমিন।

লক্ষীপুর থেকে আসা ব্যাপারি আবুল কাশেম হাটে গরু এনেছেন ৩০টি। এর মধ্যে বড় দুটি গরুর নাম রেখেছেন কালা জ্বীন ও লাল জ্বীন। কালাজ্বীনের মাংস হবে ১৭ মণ, ৬টি দাঁতই উঠেছে। আবুল কাশেম গরুটির দাম হাঁকছেন সাড়ে ৮ লাখ টাকা। তবে আরও একদিন দেখার কথা জানান তিনি।

ব্যাপারি আবুল কাশেম বলেন, দাম ৮ লাখ টাকা বললেও ঈদের আগের দিন ৫০ হাজার কিংবা ১ লাখ টাকা কমে ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিতে পারি। লাল জ্বীন ছয় লাখ টাকা দাম বলছেন ব্যাপারি। তবে ৫ কিংবা সাড়ে ৫ লাখ টাকাতেও ছেড়ে দিতে পারেন বলে জানান আবুল কাশেম।

সাগরিকা বাজারে দেখা গেল ছাগলের বাজারও। ‘বগুড়ার ছল’ নামে এসব ছাগল বিক্রির জন্য সাগরিকা হাটে এনেছেন সোহাগ ও তার ৭ বন্ধু। ছাগলের দাম ২০ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকার মধ্যে।

রাকিব ফকিরহাট থেকে ছাগল এনেছে বিক্রির জন্য। ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার ছাগলের মাংস হবে ২২ থেকে ২৫ কেজি জানান রাকিব।

সাগরিকা হাটে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় কুষ্টিয়া গরুর মার্কেট নামে আরেকটি গরুর বাজার বসানো হয়েছে। এ মার্কেটে কুষ্টিয়া ছাড়াও সিরাজগঞ্জের গরুও মিলছে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে সুমন ব্যাপারি ‘নবাব’ নামের গরুটি এনেছেন। দাম হাঁকছেন ১২ লাখ টাকা। তবে ছেড়ে দিতে পারেন আরও কমেও।

’নবাবের’ খোরাকির ফিরিস্তি জানাতে গিয়ে ব্যাপারি জানান, এই গরু দিনে চারটি মিষ্টি কুমড়া, অর্ধেক কাঁঠাল, কমলা, ভুষ ও খড় খায়।

এদিকে সাগরিকা হাটের মধ্যে এমন এক ব্যাপারিকে চোখে পড়লো যার বেশভূষা আর ১০টি ব্যাপারির মত নয়। বসে আছেন গরুর সামনে। নাম এবিএম খায়রুজ্জামান। পেশায় আইনজীবী। তার সাথে ৪ রাখাল। নাটোর থেকে এসেছেন সবাই। বিক্রির জন্য এনেছেন বিশাল আকৃতির তিনটি গরু। এদের একটি শাহেনশাহ, অপর দুটি ধলাসাগর ও কালোপাহাড়। পশুর ওপর অন্যরকম টান থেকেই ৫ বছর আগে বাড়ির পাশে গড়ে তোলেন গরুর মিনি খামার। শখের বসেই গরু লালন পালন শুরু করেন তিনি। চট্টগ্রামের সাগরিকা হাটে এবারই তার প্রথম আসা। তবে আগে স্থানীয় হাটগুলোতে গরু নিয়ে গেছেন বিক্রি করতে। শাহেনশাহর দাম হাঁকছেন তিনি ২০ লাখ টাকা। ধলাসাগর ২১ লাখ টাকা আর কালো পাহাড়ের দাম রাখছেন ২০ লাখ টাকা। তবে এই দাম নির্ভর করবে হাটের বেচাকেনার গতির ওপর।

আইনজীবী খায়রুজ্জামান জানান, তিন গরুই প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার খাবার খায়। শাহেনশাহের ওজন ২৫ মণ। দৈর্ঘ্য সাড়ে ৭ ফুট, উচ্চতা ৮ ফুট। অত্যন্ত আরামপ্রিয়। দুই বেলা শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করাতে হয়। গোয়ালঘর প্রতিদিন দুই থেকে ৩ বার পরিস্কার করতে হয়। ধলাসাগরের ওজন ২৭ মণ। দৈর্ঘ্য সাড়ে ৮ ইঞ্চি ও উচ্চতা ৫ ফুট। কালোপাহাড়ের ওজন ও মাপও একই।

তিনি আরও জানান, ‘শাহেনশাহ স্বভাবে একটু অহংকারী। ধলাসাগরও কালোপাহাড়ের গায়ে আগে হাত দিলে খুব রাগ দেখায়। এমনিতে চুপচাপ থাকে। আমাকে খুব ভালো চিনে।’

নিজের পরিবারের সদস্যের মতোই এ গরু তিনটিকে তিনি পালন করেছেন। অনেক মায়া। বিক্রি হয়ে গেলে অনেক মন খারাপ লাগবে— জানান খায়রুজ্জামান। তার ছোট মেয়ে জ্যেতি। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। গরু হাটে আনার পর বাবাকে ফোন করে গরুর খবর জানতে চায় প্রতিদিন। গরুগুলো আনার সময় মেয়েটি খুব কান্নাকাটি করেছে বলে জানান নাটোরের এই আইনজীবী।

এদিকে সাগরিকা গরুর হাটে প্রচুর অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। হাটজুড়ে নোংরা পরিবেশ। চলাচলের রাস্তায় কাদা ও পানি জমে আছে। তবে এর জন্য সিটি করপোরেশনকেই দুষলেন হাটের ইজারাদার বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক আবুল কালাম আজাদ বাবুল।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আমার কাছ থেকে ১১ কোটি টাকা নিয়েছে। তারা ঠিক না করলে আমার কী করার আছে? তবে আমরা সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছি। এর মধ্যেই পরিস্কার করা শুরু হয়ে গেছে।

সিপি

ManaratResponsive

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm