সাইয়্যেদুল ইস্তেগফারের অনন্য ফজিলত, যে আমলে দোয়া কবুলের আশা

মানুষ যতই পাপ করুক, আল্লাহতায়ালার রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। বান্দা আন্তরিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং তার জন্য রহমত, মাগফিরাত ও জান্নাতের পথ খুলে দেন। ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার জন্য কোরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফে বহু দোয়া রয়েছে। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দোয়াটিকে বলা হয় সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার, অর্থাৎ প্রধান বা শ্রেষ্ঠ ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেউ সকাল-সন্ধ্যায় বিশ্বাসের সঙ্গে সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার পাঠ করলে ওই দিন বা রাতে তার মৃত্যু হলে সে জান্নাতি হবে। বান্দা যখন আল্লাহর দ্বারস্থ হয়, তখন তিনি ক্ষমা ও দয়ার হাত প্রসারিত করেন। বান্দা ইস্তিগফার করলে আল্লাহ আজাব দেন না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আপনি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না এবং তারা ক্ষমা প্রার্থনা করলে তখনো আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না।’ (সূরা আনফাল, আয়াত ৩৩)

জান্নাতের ওয়াদা

সাইয়্যেদুল ইস্তিগফারের সবচেয়ে বড় ও অনন্য ফজিলত হলো, এটি পাঠকারীর জন্য জান্নাতের ওয়াদার কথা বলা হয়েছে। কোনো বান্দা পূর্ণ বিশ্বাস ও অর্থ অনুধাবন করে দিনে বা রাতে এটি পাঠ করার পর ওই সময়ের মধ্যে মারা গেলে সে জান্নাতবাসী হবে।

হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে দিনের বেলায় এই দোয়া পাঠ করবে এবং ওই দিন সন্ধ্যার আগে মারা যাবে, সে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে রাতের বেলায় এটি পাঠ করবে এবং সকাল হওয়ার আগে মারা যাবে, সেও জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

ক্ষমা প্রার্থনার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। পাপের জন্য অনুতপ্ত হলেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। তবে সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার সকাল ও রাতে পাঠ করা উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, সকালে সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার পাঠ করে কেউ দিনে মারা গেলে সে জান্নাতি এবং রাতে পাঠ করে ওই রাতে মারা গেলেও সে জান্নাতি। এ কারণে সকাল ও রাতে সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার পাঠ করার কথা বলা হয়।

ইস্তিগফার হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। উম্মতকে শেখানোর জন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তিগফার করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি প্রতিদিন ৭০ বারেরও বেশি ইস্তিগফার করি এবং তাওবা করি।’

সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার

সাইয়্যেদুল ইস্তিগফারের বাংলা উচ্চারণ হলো: ‘আল্লাহুম্মা আন্তা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আন্তা খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতাতু, আউজু বিকা মিন শাররি মা সানাতু, আবুউ লাকা বিনি‘মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবুউ লাকা বিজাম্বি ফাগফির লি, ফা ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আন্তা।’

এর অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রভু। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ বা মাবুদ নেই। আপনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনারই বান্দা বা গোলাম। আমি আমার সাধ্যমতো আপনার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের ওপর আছি। আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে পানাহ ও আশ্রয় চাই। আমার প্রতি আপনার সব নেয়ামত আমি স্বীকার করছি এবং আপনার কাছে আমার সব অপরাধও স্বীকার করছি। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।

ইস্তেগফারে দোয়া কবুল

ইস্তেগফার এমন এক ইবাদত, যা মানুষকে আল্লাহর কাছে ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ হিসেবে কবুল হওয়ার পথে নিয়ে যায়। ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যার দোয়া কবুল হতে দেরি হয় না। আর নিজেকে মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ হিসেবে তৈরি করার অন্যতম আমল হলো ইস্তেগফারের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকা। ওঠা-বসা, চলা-ফেরাসহ সব সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার নিয়তে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়তে থাকা।

ইস্তেগফারের কারণে এক রুটিওয়ালার দোয়া যেভাবে আল্লাহতায়ালা কবুল করেছিলেন এবং তাকে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের সঙ্গে দেখা করিয়েছিলেন, সেই ঘটনা মুমিন মুসলমানকে ইস্তেগফারের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে।

যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হজরত আহমাদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবনে এ ঘটনা স্মরণীয় হয়ে আছে। ইস্তেগফারের কারণে আল্লাহতায়ালা এক রুটি বিক্রেতাকে মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ হিসেবে কবুল করেছিলেন বলে এ ঘটনা বর্ণনা করা হয়।

রুটিওয়ালার সেই দোয়া

জগৎবিখ্যাত মুহাদ্দিস হজরত আহমাদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি সারা জীবন হাদিস সংগ্রহে কাটিয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সেও একবার হাদিস সংগ্রহের জন্য সফরে বের হন। সফরের সময় একদিন তিনি একটি মসজিদে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন। সময়টি ছিল শীতকাল। তিনি চিন্তা করলেন, ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বিদায় নেবেন। সে লক্ষ্যে মসজিদে বসে শীতের কাপড় মুড়িয়ে হাদিস পড়তে শুরু করেন।

এ সময় মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণকারী ব্যক্তি এসে বলেন, রাতে মসজিদে থাকা যাবে না। মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল অনেক বিনয়ের সঙ্গে থাকার অনুমতি চাইলেও তিনি রাজি হননি। নিরুপায় হয়ে তিনি মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়েন।

শীতের রাতে তিনি একটি বাজারে পৌঁছে এক যুবক রুটিওয়ালার দোকান খুঁজে পান। মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল যুবক দোকানদারকে সালাম দিয়ে বলেন, শীতের রাত। তিনি কি আগুন পোহাতে পোহাতে রাতটি সেখানে কাটাতে পারবেন?

দোকানদার যুবক তাঁকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তিনি সেখানে আগুন পোহাতে পোহাতে রাত কাটালে তাঁর কোনো সমস্যা নেই। এরপর মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল চুলার পাশে বসে হাদিস পড়া শুরু করেন।

তখন তিনি লক্ষ্য করেন, যুবক রুটি তৈরির জন্য খামির তৈরি করতে গিয়ে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলছেন। রুটি বেলতে গিয়ে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’, ক্রেতার হাতে রুটি তুলে দিতে গিয়ে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ এবং টাকা নেওয়ার সময়ও ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলছেন। অর্থাৎ প্রায় সব কাজের সঙ্গেই তিনি ইস্তেগফার পড়ছেন।

যুবকের এ অভ্যাস দেখে মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বলের কৌতূহল বাড়ে। তিনি হাদিসের কিতাব বন্ধ করে যুবককে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি আসার পর থেকেই দেখছেন যুবক কিছুক্ষণ পরপর ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ছেন। এর কারণ কী, কেন তিনি এত বেশি ইস্তেগফার করেন?

যুবক বলেন, এটি তাঁর চিরাচরিত আমল। তিনি সব সময় ইস্তেগফারের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকেন। এ আমলের ফলে আল্লাহতায়ালা তাঁকে ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ বানিয়ে দিয়েছেন। তিনি দোয়া করলেই তা কবুল হয়ে যায়। জীবনে তিনি আল্লাহর কাছে যত দোয়া করেছেন, আল্লাহ তা কবুল করেছেন।

যুবকের কথা শুনে মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল অবাক হয়ে তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কি সত্যিই মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ, তাঁর দোয়া করলেই কি কবুল হয়?

যুবক বলেন, হ্যাঁ, তিনি দোয়া করলেই তা কবুল হয়। তবে একটি দোয়া এখনো কবুল হয়নি। সেটি ছাড়া আল্লাহ তাঁর সব দোয়া কবুল করেছেন।

এ কথা শুনে মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বলের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তিনি জানতে চান, কোন দোয়াটি এখনো কবুল হয়নি?

রুটিওয়ালা যুবক বলেন, তিনি বহুবার আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমি শুনেছি এ জামানার সবচেয়ে বড় মুহাদ্দিসের নাম ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল। আল্লাহ, আপনার কাছে আমার আকুতি ও মিনতি, আমি যেন এত বড় মুহাদ্দিসের হাতে হাত রেখে মুসাফাহা করতে পারি এবং তাঁর কপালে একটি চুম্বন করতে পারি।’ তাঁর এ দোয়া এখনো পূরণ হয়নি। কেন আল্লাহ এ দোয়া কবুল করছেন না, তা তিনি জানেন না।

দোয়া কবুলের সাক্ষাৎ

রুটিওয়ালার কথা শুনে মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে তাঁর চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। তিনি যুবককে বলেন, ‘হে যুবক! আহমাদ ইবনে হাম্বলের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাঁর দরবারে যাওয়ার দরকার নেই। তোমার এ দোয়াও আল্লাহতায়ালা কবুল করেছেন। আহমাদ ইবনে হাম্বলের সঙ্গে তোমার দেখা করানোর জন্যই আল্লাহ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমিই আহমাদ ইবনে হাম্বল।’

এ কথা শুনে যুবকও নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে তিনি যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসকে জড়িয়ে ধরেন, তাঁর হাত ধরে মুসাফাহা করেন এবং কপালে চুম্বন করে কাঁদতে থাকেন।

এরপর তিনি মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বলের কাছে দোয়া চান। তিনি বলেন, ‘হে ইমাম! রাব্বুল আলামিন আমার কোনো দোয়া বাকি রাখেননি। যে একটি দোয়া বাকি ছিল, সেটিও আল্লাহতায়ালা কবুল করে নিয়েছেন।’

এটাই ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’। কোনো বান্দা যদি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ অর্থাৎ ইস্তেগফারের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকেন, তবে তিনি মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ হতে পারেন। ইস্তেগফারের কারণে আল্লাহতায়ালা বান্দার চাওয়া পূরণ করে দেবেন।

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার ভালোভাবে শেখা এবং সকাল-সন্ধ্যায় বেশি বেশি পাঠ করা। প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ইস্তেগফার পড়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা উচিত। আমিন।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

ksrm