সহিংসতার শিকার হলেও অভিযোগ করেন না অধিকাংশ নারী, চট্টগ্রামে উদ্বেগজনক চিত্র
৬৮ শতাংশ ঘটনার বিপরীতে রিপোর্ট মাত্র ৬ শতাংশ
চট্টগ্রামে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার প্রায় ৬৮ শতাংশ ঘটনার বিপরীতে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট হয় মাত্র ৬ শতাংশ। একই সঙ্গে নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানির ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ বাস্তবতায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সেবাপ্রাপ্তি সহজতর করার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চট্টগ্রাম শিশু একাডেমিতে একটি অ্যাডভোকেসি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ব্রাইট বাংলাদেশ ফোরাম ও অ্যাক্টিভিস্তা চট্টগ্রামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সংলাপে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন যুব সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন।
সংলাপে উপস্থাপিত তথ্যে জানানো হয়, দেশে প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতা বা হয়রানির শিকার হলেও মাত্র ১২ শতাংশ ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট করা হয়। চট্টগ্রামে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার প্রায় ৬৮ শতাংশ ঘটনার বিপরীতে রিপোর্ট হয় মাত্র ৬ শতাংশ। একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. রোকসানা আক্তার বলেন, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ভুক্তভোগীদের দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং সহায়তা সেবার আওতায় আসার আহ্বান জানান।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রতিনিধি তাহমিনা তামান্না বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন সেবা ও সহায়তা কার্যক্রম রয়েছে। তবে এসব সেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে সেবা নিশ্চিত করতে সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের ইনচার্জ সুপ্তা দত্ত বলেন, নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী ভুক্তভোগীদের সেবা দেওয়া হয় এবং আইন অনুযায়ী তাঁদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়। তিনি সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের নির্ভয়ে অভিযোগ জানিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা গ্রহণের আহ্বান জানান।
সিটিজেন জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি কমল চক্রবর্তী নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং সাইবার হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং তরুণদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম ইয়ুথ হাবের সভাপতি মৌসুমি আক্তার জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে তরুণদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান। তিনি ভুক্তভোগীদের জন্য সহজলভ্য সেবা, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং নিরাপদে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্সপিরেটর মো. রুকনোজ্জামান। তিনি নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং অনলাইন হয়রানি বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং তরুণদের নেতৃত্বে ইতিবাচক পরিবর্তন সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে বিভিন্ন যুব প্রতিনিধি অনলাইন হয়রানি, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব, সেবা গ্রহণে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ, দ্রুত সেবা প্রদান এবং তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্রাইট বাংলাদেশ ফোরামের প্রধান নির্বাহী উৎপল বড়ুয়া। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং তরুণদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়োপযোগী সেবা এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
ব্রাইট বাংলাদেশ ফোরামের ম্যানেজার রিদুয়ানুল হাকীম রিয়াদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ সংলাপে উপস্থাপনা করেন চট্টগ্রাম ইয়ুথ হাবের অ্যাডভাইজর আবদুল আজিজ এবং ইয়ুথ ভয়েস ফর চেইঞ্জের সদস্য জয়া দাশ।




