সর্বজনীন পেনশন স্কিমে দুঃখ ঘুচিয়ে জীবন হবে রঙিন

নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাপী পেনশন ব্যবস্থা চালু আছে। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম আর্থিক নিরাপত্তা। দেশভেদে এর ধরনও ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিবেশী দেশ ভারতে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারীদের জন্য এটি শুরু হয় ২০০৪ সালে; পরবর্তীতে ভিন্ন প্রকল্পে বেসরকারি, বিধবা ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের এর আওতায় আনা হয়। চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রেও নানা ধরনের স্কিমের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা চালু আছে। নাগরিক ও সরকারের অংশগ্রহণ, চাঁদার হার স্কিম ও দেশভেদে ভিন্ন। উন্নত দেশ অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে বাজেট থেকে সকল নাগরিককে পেনশন দেওয়া হয়।

‘পেনশন’ শব্দটি শুনলেই আমাদের দেশে সরকারী চাকুরীজীবীদের কথা মাথায় আসতো। বেসরকারি কিংবা সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে স্বপ্নের মতো ছিলো। বিষয়টি নতুন হওয়ায় এখনো অনেকের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে এটি সর্বজনীন। সেই স্বপ্নই এখন বাস্তবতা। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দেশের সর্বস্তরের জনগণকে টেকসই পেনশন কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক কৌশলপত্র তৈরি, সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা-২০২৩(সংশোধিত), জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ এবং ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩’ প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ “Demographic Dividend “এর মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছে। অর্থাৎ বয়স্ক জনগোষ্ঠীর তুলনায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। তবে গড় আয়ু বৃদ্ধিতে ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই সর্বস্তরের জনগণকে টেকসই ও সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতাভুক্ত করা প্রয়োজন। তাই এখনই সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অর্জন অনুকরণীয়। অভীষ্ট ১ এ সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্যের অবসান এবং অভীষ্ট ১০ এ অন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় অসমতা কমিয়ে আনার বিষয়ে বলা হয়েছে। এগুলোর বিভিন্ন উপ- অনুচ্ছেদে সামাজিক নিরাপত্তাসহ নাগরিকদের কল্যাণে সময়ে সময়ে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ঘোষণা দিয়েছে। উন্নত ও সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশে বয়স্ক, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন কিংবা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান কিংবা সামাজিক অবস্থান কেমন হবে; সে অনুধাবন থেকেই সামাজিক বৈষম্য নিরসনে উন্নত দেশগুলো আদোলে সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম ব্যবস্থা চালু করেছেন। যাতে করে কোন নাগরিক ন্যূনতম সামাজিক মর্যাদা থেকে পিছিয়ে না পড়ে।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা—২০২৩ এর ৩নং বিধিতে চারটি স্কিমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী স্বল্প আয়ের নাগরিকগণ যাদের বার্ষিক আয় অনুর্ধ্ব ৬০ হাজার টাকা, তাদের জন্য চালু করেছে সমতা স্কিম। সমতা স্কিমে মাসিক চাঁদার হার ১হাজার টাকা; যার মধ্যে চাঁদা দাতার ৫০০ টাকা এবং বাকি ৫০০ টাকা সরকার প্রদান করবেন। সে জন্য সমতা স্কিমের স্লোগান হচ্ছে ‘সমতা স্কিমের নিশ্চয়তা, সরকার দেবে সহায়তা’। স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিক যেমন— কৃষক, রিকশাচালক, শ্রমিক,কামার,কুমার,জেলে,তাঁতি, ব্যবসায়ী, গৃহিনীসহ সব অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিগণের জন্য ‘কৃষক শ্রমিক জেলে তাঁতী, সবাই মিলে পেনশন মাতি’ স্লোগানে নিয়ে “সুরক্ষা” চালু করেছে। এ শ্রেণির নাগরিক নির্ধারিত হারে চাঁদা প্রদান করে এ স্কিমে যুক্ত হতে পারবেন।

‘চাকরি করি বেসরকারি, পেনশন স্কিমে আমিও আছি’ এ স্লোগানে চালু করেছে “প্রগতি” পেনশন স্কিম। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য এ সুবিধা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অথবা ব্যক্তি উদ্যোগে এ স্কিমে যুক্ত হওয়া যাবে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্কিমে যুক্ত হলে মাসিক জমার ৫০ শতাংশ কর্মকর্তা/কর্মচারী এবং বাকি অংশ প্রতিষ্ঠান দিবে। “প্রবাস স্কিমে অংশগ্রহণ, দেশে ফিরে সুন্দর জীবন” স্লোগানে প্রবাসীদের জন্য চালু হয়েছে ‘প্রবাস’ স্কিম। বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিক চাঁদার অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় অথবা বাংলাদেশে তিনি যে ব্যাংক একাউন্টে রেমিট্যান্স প্রেরণ করেন, সে একাউন্ট হতে জমা প্রদান করে এ স্কিমে অংশ নিতে পারবেন। পেনশন স্কিম শেষে দেশীয় মুদ্রায় পেনশন পাবেন। প্রবাসীদের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে পাসপোর্টের তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করতে পারবেন।

সরকারী চাকুরীজীবীদের জন্যও সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় নতুন যুক্ত করা হয়েছে ‘প্রত্যয়’। এতে বলা হয়েছে, যাঁদের ন্যূনতম ১০ বছর চাকরি অবশিষ্ট আছে, তাঁরা আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রত্যয় স্কিমে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। প্রত্যয় স্কিম চালুর ফলে বিদ্যমান কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে না; বরং তাঁদের বিদ্যমান পেনশন বা আনুতোষিক সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকবে। এ ব্যবস্থার ফলে স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা ও তাদের অধীনস্থ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীরা যারা চাকুরী শেষে শুধুমাত্র আনুতোষিক পেতেন তারা এ স্কিমের মাধ্যমে ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তার অন্তর্ভুক্ত হলেন। আগামী জুলাইয়ের পর স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থার চাকরিতে যাঁরা যোগদান করবেন, তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রত্যয় স্কিমে যুক্ত করা হবে।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা,২০২৩ এর ৪নং বিধি অনুসারে আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, একটি ব্যাংক হিসাব নম্বর, একটি সচল মোবাইল নাম্বার, নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে নিবন্ধন করা যায়। নিকটবর্তী ডিজিটাল সেন্টার কিংবা এড্রয়েড মোবাইলে upension.gov.bd সিস্টেমের মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিজের নিবন্ধন নিজেই করার সুযোগ রযেছে। সবগুলো স্কিমের ক্ষেত্রে নাগরিরদের বয়স ১৮(আঠারো) বৎসর বা তদূর্ধ্ব বয়স হতে ৫০(পঞ্চাশ) হতে হবে। তবে ৫০(পঞ্চাশ) বছরের উর্ধ্বে কেউ অংশগ্রহণ করলে তাকে নিরবিচ্ছিন্ন ১০(দশ) বছর চাঁদা প্রদান শেষে তিনি যে বয়সে উপনীত হবেন সে বয়স হতে আজীবন পেনশন প্রাপ্য হবেন। পেনশনারগণ আজীবন অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পাবেন। পেনশনে থাকাকালীন ৭৫(পঁচাত্তর) বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে মৃত্যবরণ করলে পেনশনারের নমিনি অবশিষ্ট সময়কালের(মূল পেনশনারের বয়স ৭৫ বছর পর্যন্ত) জন্য মাসিক পেনশন প্রাপ্য হবেন।

বিধি ৫ অনুসারে, নিবন্ধনের পর মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, Online banking, credit card বা debit card এর মাধ্যমে বা তফসিলি ব্যাংকের কোন শাখায় OCT(Over the counter) পদ্ধতিতে চাঁদা পরিশোধের করা যাচ্ছে। প্রবাসীরা credit card বা debit card এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদা জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিধি ১৩ অনুসারে প্রয়োজনে স্কিম পরিবর্তনের সুবিধাও রয়েছে। বিধি ১৫ অনুসারে চাঁদা দাতা তার জমাকৃত টাকার ৫০%(শতকরা পঞ্চাশ ভাগ) ঋণ হিসেবে উত্তোলন করার সুযোগ রয়েছে। সর্বোপরি সর্বজনীন পেনশন স্কিম সরকারের একটি যুগান্তকারী এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ। সকল পেশা-শ্রেণীর মানুষ সরকারের এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে আর্থিক নিশ্চয়তা পাবে।

পিআইডি ফিচার

লেখক: তথ্য অফিসার, জেলা তথ্য অফিস, খাগড়াছড়ি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!